নিজস্ব প্রতিবেদক:
নওগাঁয় সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারে যমজ সন্তানের জন্ম হয়েছে দাবি করে পরিবারের কাছে মাত্র একজনকে হস্তাস্তরের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে বলাকা ক্লিনিক কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) এই চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি ঘটে।
নবজাতকের বাবা শান্ত ইসলামের জোরালো দাবি, অস্ত্রোপচারের আগের দুটি আল্ট্রাসনোগ্রাম প্রতিবেদনেই দুটি জীবিত ভ্রূণের উপস্থিতি সম্পূর্ণ নিশ্চিত করা হয়েছিল। অথচ অস্ত্রোপচারের পর তাদের শুধু একটি কন্যাশিশু দেখানো হলেও অপর সন্তানটির বিষয়ে কোনো ধরনের তথ্যই দেওয়া হয়নি। এ ঘটনায় স্থানীয় বলাকা ক্লিনিক কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে পুরো বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার উদ্দেশ্যে আর্থিক প্রস্তাব দেওয়ারও অভিযোগ তুলেছেন তিনি।
এহেন লোমহর্ষক ঘটনায় নবজাতকের বাবা শান্ত ইসলাম ইতোমধ্যে নওগাঁ সদর থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। তার স্পষ্ট দাবি, অবিলম্বে অপর নবজাতকের সন্ধান বের করতে হবে এবং পুরো ঘটনার নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
শান্ত ইসলামের ভাষ্য অনুযায়ী, তার স্ত্রী অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার পর গত ১২ ও ২১ অক্টোবর দুটি পৃথক ডায়াগনস্টিক সেন্টারে আল্ট্রাসনোগ্রাম করানো হয়েছিল। উভয় চিকিৎসাগত প্রতিবেদনে গর্ভে দুটি জীবিত ভ্রূণ থাকার কথা স্পষ্ট অক্ষরে উল্লেখ করা হয়েছিল।
গত ১২ অক্টোবর জয়পুরহাটের আক্কেলপুরের ডিজিটাল ডায়াগনস্টিক সেন্টারে করা পরীক্ষার প্রতিবেদনে দুটি জীবিত ভ্রূণের উপস্থিতি পাওয়া যায়। সেখানে উভয় ভ্রূণের হৃদস্পন্দন প্রতি মিনিটে ১৪৭ বার উল্লেখ করা হয়। পরবর্তীতে গত ২১ অক্টোবর নওগাঁর রি-লাইফ ডায়াগনস্টিক সেন্টারে করা আল্ট্রাসনোগ্রাম প্রতিবেদনেও দুটি জীবিত ভ্রূণের কথা উল্লেখ করা হয়। ওই প্রতিবেদনে তাদের হৃদস্পন্দন যথাক্রমে প্রতি মিনিটে ১৪৬ ও ১৪০ বার বলে জানানো হয় এবং সম্ভাব্য ওজন দেখানো হয় যথাক্রমে ২ হাজার ৩৩১ ও ২ হাজার ৪৮৬ গ্রাম।
শান্ত ইসলাম আরও জানান, গত বৃহস্পতিবার বিকেলে চিকিৎসক ডা. মাহফুজা খাতুনের পরামর্শেই তার স্ত্রী শান্তনা আক্তারকে বলাকা ক্লিনিকে ভর্তি করানো হয়। পরবর্তীতে ওই চিকিৎসকের সরাসরি তত্ত্বাবধানেই সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়। অস্ত্রোপচার শেষে পরিবারের লোকজনকে একটি মাত্র কন্যাশিশু দেখানো হয়। কিন্তু অপর সন্তানটির বিষয়ে জানতে চাইলে ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ কোনো পরিষ্কার বা সদুত্তর দিতে ব্যর্থ হয়।
ভুক্তভোগী প্রসূতি শান্তনা আক্তার অভিযোগ করে বলেন, অস্ত্রোপচারের আগে চিকিৎসক ও ক্লিনিকের লোকজনের কাছ থেকে তারা নিশ্চিত জেনেছিলেন যে তার গর্ভে একটি ছেলে ও একটি মেয়ে সন্তান রয়েছে। কিন্তু অস্ত্রোপচারের পর তাকে শুধু একটি কন্যাশিশু দেখানো হয়। বিষয়টি পরিবারের সদস্যদের জানানো হলে তারা এর প্রতিবাদ করেন। এই প্রতিবাদের জেরে তার পেটের অস্ত্রোপচারের কাটা অংশ সেলাই না করেই প্রায় ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট ফেলে রাখা হয় বলে তিনি মর্মান্তিক অভিযোগ করেন।
শান্তনা আকুতি জানিয়ে বলেন, ‘পরিবারের সদস্যরা চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করলে তারা আমার পেটের কাটা অংশ সেলাই না করে ফেলে রাখে। এ সময় মোবাইল ফোনে ভিডিও করে এবং বলে, তাদের কথা না শুনলে এ অবস্থায় রেখেই চলে যাবে। পরে আমার শরীরে কাঁপুনি শুরু হলে আমি বলি, আপনাদের সব কথা শুনবো, আগে পেটের সেলাই করেন। এরপর চিকিৎসক আমার সঙ্গে রাগারাগি ও হুমকি-ধমকি দিয়ে ভিডিও ধারণ করেন। পরে পেটের কাটা অংশ সেলাই করা হয়। আমি আমার দুই সন্তানকেই চাই। আমার আরেক সন্তান কোথায়, তা জানতে চাই।’
এ বিষয়ে অভিযুক্ত বলাকা ক্লিনিকের মালিক এনামুল হক সাফাই গেয়ে বলেন, ‘রোগী চিকিৎসক ডা. মাহফুজা খাতুনের পরামর্শেই ক্লিনিকে ভর্তি হয়েছিলেন। তিনিই অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করেছেন। সন্তান একটি না দুটি হয়েছে, তা ওই চিকিৎসকই একমাত্র বলতে পারবেন। এ বিষয়ে আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানি না।’
জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মুহাম্মদ মনিরুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানান, ‘নবজাতকের বাবা নিজে থানায় এসে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। থানা পুলিশ ও জেলা পুলিশ যৌথভাবে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছে। তদন্ত কার্যক্রম শেষ হলেই প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
এদিকে আনীত এই গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে বিস্তারিত জানতে অভিযুক্ত চিকিৎসক ডা. মাহফুজা খাতুনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাংবাদিকদের কাছে এ বিষয়ে কোনো ধরনের মন্তব্য বা বক্তব্য দিতে রাজি হননি।











