নিশ্চয়ই আল্লাহ একমাত্র উপাস্য এবং পূতপবিত্র ও ত্রুটিহীন ,অবশ্যই আমি জলুমুকারীদের অন্তভুক্ত। দুরুদ ও সালাম সরল পথের পথ প্রদর্শক হাবিবে খোদা রাসুল্লাহ (স) এর প্রতি । আল্লাহর রহমত ও মাগফেরাত কামনা করি আলোচ্য বিষয়ের উত্থাপক হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাজ্জালি (র) এর উপর।ইমাম গাজ্জালি তার আলোচ্য বিষয়ে যাওয়ার পূর্বে একটি কথা বলা আবশ্যক যে এখানে যা বক্তব্য উল্লেখিত হচ্ছে তা একান্তই আমার ত্বত্ত বিশ্লেষনাত্তক চিন্তা প্রসূত । যদি ইহা বিভ্রান্তি মলুক বা ভুল হয়ে থাকে তাহলে দয়াবশত অধমকে অবহিত করিবেন।যাই হোক আমরা আলোচ্চ্য বিষয়ে চলে আসি । আমাদের আলোচ্চ্য বিষয়টি হচ্ছে ,ইসলাম এর মলূ আকিদা বা বলা ভাল যে স্তম্ভের উপর মুসলিম বিশ্ব দন্ডায়মান তথা কালেমা তাইয়্যাবা এর প্রথম ভাগ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, যার অর্থ ,আল্লাহ ছাড়া কোন মাবদু নাই, বাক্যটি পরিপূর্ণ না ত্রুটিপূর্ণ।
-
- লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ (لَا إِلٰهَ إِلَّا الله): ইমাম গাজ্জালীর মতে, এটি হলো “তাওহীদুল আওয়াম” বা সাধারণ মানুষের একত্ববাদ। এর বাহ্যিক অর্থ—আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই।
- লা হুওয়া ইল্লা হুওয়া (لَا هُوَ إِلَّا هُوَ): এটিকে তিনি বলেছেন “তাওহীদুল খওরাস” বা আধ্যাত্মিক জগতের বিশেষ সাধকদের একত্ববাদ। এর গভীর অর্থ—”তিনি ছাড়া আর কোনো কিছুরই প্রকৃত অস্তিত্ব নেই”।
তিনি বলেন, আমরা যখন পৃথিবীতে দিনের বেলা আলো দেখি, তখন মনে হয় আলোটি যেন দেওয়াল, মাটি বা চারপাশের বস্তুর নিজস্ব জিনিস। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সেই আলোর নিজস্ব কোনো অস্তিত্ব নেই, তা সম্পূর্ণভাবে সূর্যের আলোর ওপর নির্ভরশীল। সূর্য না থাকলে ওই আলোর অস্তিত্বই থাকত না।
অর্থাৎ ইমামা গাজ্জালি (র) বক্তব্য অনুযায়ী, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু সাধারন মানষু এর বিশ্বাস এবং তাওহিদ এর পরিপূর্ণতা অর্জন এর পর সেই বিশ্বাস লা হুয়া ইল্লা হুয়া তে পরিনত হইয়া যায়। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, বা আল্লাহ ছাড়া উপাস্য নাই, সাধারন মানুষ এর একাত্তবাদের বানী এবং লা হুয়া ইল্লাহুয়া, বা নাই তিনি ব্যতিত তিনি বিশেষ ব্যক্তিদের একাত্তবাদের বানী। আল্লাহ ছাড়া উপাস্য নাই, সাধারন অর্থ প্রকাশ করে এবং লা হুয়া ইল্লাহুয়া বা নাই তিনি ব্যতিত তিনি , বিশেষ অর্থ প্রকাশ করে । দ্বিতীয় বিষয়টা অত্যন্ত সুক্ষ এবং ব্যপক অর্থ বোধক। এই ব্যপারে তিনি বলেছেন,
১ – লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, আল্লাহর কালাম যা অন্য কোন কালাম এর থেকে উত্তম হতে পারে না, তবে অন্য বাক্যকে উত্তম বলা নবী রাসুল অলি আল্লাহদের বেলায় খাটে । অন্য সাধারন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে নয়।
২ – লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ও লা হুয়া ইল্লাহুয়া বলে আল্লাহ অবশ্যই পার্থক্য করেছেন। সাধারন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে যে নির্দেশ, নবী রাসুলগন এর ক্ষেত্রে সেই একই নির্দেশ নয়, কিছু পার্থক্য আছে ।
৩ – লা হুয়া ইল্লাহুয়া শরিয়ত সম্মত।
এই ক্ষেত্রে প্রশ্ন উত্থাপিত হয় যে ,ঈমান বা তাওহিদ এর ক্ষেত্রে এই ধরনের শ্রেনী বিন্যাস সঠিক হয় কি রুপে ? একি সাথে দ্বীন এর বুনিয়াদ কালেমাকে যেমন ছোট করা হয় তেমনি তা অপরিপূর্ণ রুপে প্রতিপন্ন হয়। অপর দিকে লা হুয়া ইল্লাহুয়া, যার অর্থ, নাই তিনি , ব্যাতিত তিনি ,যা একটি অসংলগ্ন কথা এবং এর দ্বারা তাওহিদ এর পরিপূর্ণতা অর্জিত হয় কি ভাবে ?
উক্ত প্রশ্নের উত্তরে ইমামা গাজ্জালি (র) তার মাক্তুবাত নামক গ্রন্থে বলেছেন, লা হুয়া ইল্লাহুয়া শব্দের দ্বারা সতন্ত্র কোন কালেমা বুঝান হয় নাই । এই কথার মধ্যে কালেমা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহুর মর্মার্থ পরিপূর্ণ রুপে প্রকাশ করা হইয়াছে মাত্র। উক্ত শব্দ দ্বারা ব্যাপক অর্থবোধক একটি বিষয় বুঝান হইয়াছে যার ব্যাখ্যা অত্যন্ত গভীর, যার মর্মার্থ অত্যন্ত ব্যাপক।
এখন স্বাভাবিক ভাবে আরও কয়েকটি প্রশ্নের উৎপত্তি হয়। লা হুয়া ইল্লাহুয়া শব্দের দ্বারা কি করে কালেমা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহুর মর্মার্থ পরিপূর্ণ রুপে প্রকাশ পায়? লা হুয়া ইল্লাহুয়া শব্দে উৎপত্তি কোথা হতে ? লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু অপেক্ষা লা হুয়া ইল্লা হুয়া বলা কতখানি যুক্তিসংগত, আর কেনই বা ইহাকে উত্তম বলা হয়েছে যদিও আল্লাহর কালাম অপেক্ষা অন্য কোন কিছুকেই উত্তম বলা নাজায়েজ এবং অযোক্তিক। উক্ত বিষয়ে আলোচনা করার পুরবে আমাদের কয়েকটি বিষয়ে জানা প্রয়োজন আর তা হল ঈমান কি , জ্ঞান কাকে বলে ,যুক্তি বলতে কি বুঝায়, ,চিন্তার স্বরূপ কি, তাওহিদ এর মর্মার্থ কি ?
জ্ঞান- শয়তানের সাথে যুদ্ধ করার হাতিয়ার সরুপ হচ্ছে জ্ঞান। অন্যভাবে বলা যায়, বাস্তব যুক্তি প্রমাণ এর নামই হচ্ছে জ্ঞান। মলূত,স্রষ্টা কর্তৃক সৃষ্ট যাবতীয় সৃষ্ট বস্তুর(দৃশ্য ও অদৃশ্য ) নির্ধারিত সীমা ও পরিসীমা সম্পর্কে জানা ও তা অনুধাবন করার নামই হচ্ছে জ্ঞান।
ঈমান – ঈমান এর পারি ভাষিক অর্থ হচ্ছে বিশ্বাস।,পূর্বপুরুষদের মতামত শুধু মেনে চলা এবং এর গুরু রহস্য এর অধিকারির প্রতি উত্তম মনোভাব প্রদর্শন করাই হচ্ছে ঈমান। সাভাবিক দৃষ্টিতে ঈমান এর সংগা এটাই। সকল ধর্ম ও জাতি বিশেষ ঈমান বা বিশ্বাস এর অধিকারি । কিন্তু সকলের বিশ্বাস যুক্তিসংগত, বা সন্দেহাতীত? না।এমনকি মসুলিম সম্প্রদায় যাদের ধর্মের মুলভিত্তি ঈমান তাদের মধ্যেও বহু বিষয়ে মতৈক্য রয়ছে। যেখানে সমালোচনা করার অবকাশ থেকে যায় তা ঈমান নয়। বরং, দিদ্ধা দন্ধহীন, যুক্তি যুক্ত, তর্কহীন মানবীয় অনুভুুতিকে ঈমান বলে।
যুক্তি -স্রস্টা কর্তৃক প্রকৃতির উপর আরপিত অকাট্য সপ্রমানিত কঠোর রিতি নীতিই হচ্ছে যুক্তি। অন্যভাবে বলা যায় সময়, কাল ও অবস্থান এর বেস্টনী মুক্ত অখণ্ডনীয় ও অপরবর্তনীয় নিয়মনীতি কে যুক্তি বলে ।
চিন্তা -বাস্তবতার আলোকে কি হতে পারে , আর কি হতে পারে না, অন্যভাবে বললে , কোন একটি ঘটনার
পরিপ্রেক্ষিতে নির্ধারিত বা অনির্ধারিত কোন, একটি বা একাধিক যে ঘটনা ঘটতে পারে তা নিয়ে যুক্তিগ্রাহ্য ভাবে কোন সিদ্ধান্ত নেয়া বা কর্ম করার পূর্বে মানুষ আভ্যন্তরিন ভাবে বুদ্ধি বৃত্তিক যে সকল ভাবনা বা হিসাব নিকাশ সম্পাদন করে তাকে চিন্তা বলে ।উল্লেখ্য যে চিন্তা, দুশ্চিন্তা ও কল্পনা এর মধ্যে পার্থক্য বিদ্যমান । চিন্তা পার্থিব, অপার্থিব বা উভয়ই সংশ্লিষ্ট ভাবনা হতে পারে তবে তা বাস্তবতা ভিত্তিক এবং পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া মুক্ত ।কিন্তু দুশ্চিন্তা শুধুই পার্থিব বা দুনিয়াদারি সম্পর্কিত ভাবনা এবং পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া যুক্ত । অপরদিকে কল্পনা হচ্ছে বাস্তবতা বহির্ভূত ভাবনা।
তাওহিদ – ইসলাম ধর্মে এক আল্লাহর ধারণাকে তাওহিদ বোঝায়। তাওহীদের বিপরীত ধারণা হল শিরক, একক না বলে বহুজন বলা। তাওহীদ শব্দের অর্থ একাত্ববাদ ৷ ব্যবহারিক অর্থে আল্লাহর একত্ববাদ স্বীকার করে নেওয়াকে তাওহীদ বলে ৷ শরিয়তের পরিভাষায় আল্লাহতায়ালাকে এক ও অদ্বিতীয় হিসেবে স্বীকার করে নেওয়াকে তাওহিদ বলে ৷ তাওহীদের মলূ কথা হল — আল্লাহতায়ালা এক ও অদ্বিতীয় ৷ তিনিই প্রশংসা ও ইবাদতের একমাত্র মালিক ৷ তাঁর তুলনীয় কেউ নেই ৷ আল্লাহতায়ালা বলেছেন — “”কোন কিছুই তাঁর সদৃশ নয়”। ইসলামের সকল শিক্ষা ও আদর্শ তাওহিদের উপর প্রতিষ্ঠিত ৷ দুনিয়াতে যত নবী রাসূল এসেছেন সকলেই তাওহিদের দাওয়াত দিয়েছেন ৷ সকলের দাওয়াতের মুল কথা ছি ল :— “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহা বা আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নেই”’।মুমিন বা ঈমানদার হতে হলে একজন মানষুকে সর্বপ্রথম আল্লাহ তায়ালার একাত্ববাদে বিশ্বাস করতে হবে বা ঈমান আনতে হবে ৷ তাওহিদে বিশ্বাস ব্যতীত কোন ব্যাক্তিই ইসলামে প্রবেশ করিতে পারেনা বা ঈমানদার হইতে পারে না।
বিভিন্ন হাদিস ও কোরানের আয়াত দ্বারা এটা প্রমানিত যে তাওহিদে বিশ্বাস বা ঈমান সকলের এক না । মোনাফিকরাও ঈমান এর দাবি করে থাকে কিন্তু প্রকৃত পক্ষে কি তারা কি ঈমানদার? অপরদিকে কোরানে মোমিন, ঈমানদার, মুত্তাকি ইত্যাদি শব্দ দ্বারা মুসলিম উম্মার ঈমান এর পরিমান ব্যক্তি বিশেষ এ যে বিভিন্ন হতে পারে তা উল্ল্যেখ করা আছে এবং তা বাস্তব সম্মত। কারন সকল মানষু এর জ্ঞান এর পরিমান এক হয় না। ব্যক্তি বিশেষে তা ভিন্ন হয়ে থাকে । অপরদিকে মানষের ঈমানের প্রকার, পরিমান এবং পরিবর্তন নির্ভর করে তার চিন্তাশক্তির গভীরতার উপর আর চিন্তাশক্তির গভীরতা নির্ভর করে যুক্তির উপর আর যুক্তি নির্ভর করে জ্ঞান এর উপর। এর একটি দৃষ্টান্ত হতে পারেন আবুবকর(র)। রাসুল্লাহ(স) এর লক্ষাধিক সাহাবি ছিল অথচ সিদ্দিক উপাধি তাকে প্রদান করা হয়েছে ।ঠিক তেমনি ওমর(র), ওসমান(র), আলি(র) আবুদারদা(র) প্রমুখ সাহাবি বিশেষ করে বদরি সাহাবি যাদের ঈমান এর কথা রাসুল্লাহ (স) বলে গেছেন এবং অপরাপর সাহাবিদের থেকে উচ্চ মর্যাদা প্রদান করেছেন।
উপরোক্ত আলোচনা হতে এটা প্রতীয়মান হয় যে জ্ঞানের উপর নির্ভর করে মানুষের ঈমানের পরিপূর্ণতা এবং আল্লাহর নিকটবর্তীতা। যদি গভীরভাবে চিন্তা করা হয় তাহলে দেখা যাবে, লা হুয়া ইল্লাহুয়া বাক্যটি, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু বাক্যটির পরিপূরক। মূলত দুটি বাক্য একই অর্থ প্রকাশ করে। কোরআনে রাব্বুল আলামিন বলেছেন, “তোমাদের ইলাহ একমাত্র ইলাহ”, “তোমাদের ইলাহ ব্যতীত আর কোনো ইলাহ নাই”, “আল্লাহ ব্যতীত আর কোনো ইলাহ নাই”। এরূপ আরও অনেক আয়াত বর্ণিত হয়েছে। উক্ত আয়াতগুলো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে প্রতীয়মান হবে যে ইলাহ বলতে আল্লাহকেই বুঝায়। পরিপূর্ণ ঈমানদার ব্যক্তি আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো ইলাহের কথা ভুলেও তার ভাবনাতে আনতে পারে না। কারণ ইলাহ শব্দটি আল্লাহতাআলার একটি সিফাত বা গুণবাচক নাম। অপরদিকে আল্লাহ নামটি রাব্বুল আলামিনের সত্তাগত বা জাতগত নাম। অর্থাৎ আল্লাহ বললে যেমন ইলাহ বা উপাস্য বুঝাবে ঠিক তেমনি ইলাহ বা উপাস্য বললে আল্লাহকে বুঝাবে। উদাহরণস্বরূপ, বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম, অর্থাৎ পরম করুণাময় ও দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি। এখানে রহমান এবং রাহিম আল্লাহতাআলার গুণবাচক নাম প্রকাশ করছে। অপরদিকে আল্লাহ নামটি রাব্বুল আলামিনের সত্তাগত বা জাতগত নাম প্রকাশ করছে। এখন আল্লাহ ডাক হোক বা রহমান বা রাহিম যাই ডাকা হোক সর্বক্ষেত্রে তাকেই বুঝাবে। কোরআনের আয়াত অনুযায়ী “আল্লাহ ডাক বা রহমান যে নামেই ডাক তার অনেক সুন্দর সুন্দর নাম রয়েছে”।
উপরোক্ত আলোচনা অনুযায়ী কালেমাতে, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু-এর ইলাহা শব্দের পরিবর্তে যদি আল্লাহ শব্দটি লেখা হয় তাহলে কালেমাটি নিম্নরূপ ধারণ করবে, লা আল্লাহ ইল্লাল্লাহু যার আক্ষরিক অর্থ দাঁড়ায় নাই আল্লাহ ব্যতীত আল্লাহ। এখন ব্যাকরণ অনুযায়ী যদি উক্ত বাক্যে বিশেষ্যে আল্লাহ এর পরিবর্তে সর্বনাম “তিনি” শব্দটি ব্যবহার করা হয় তাহলে দাঁড়ায়, নাই তিনি ব্যতীত তিনি বা লা হুয়া ইল্লাহুয়া। অতএব লা হুয়া ইল্লাহুয়া কোনো আলাদা কালেমা নয় বরং লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু-এর ভিন্ন রূপ, যদিও স্বাভাবিকভাবে উক্ত বাক্যটি অসংলগ্ন অর্থ প্রকাশ করে বলে মনে হয় কিন্তু বাস্তবে বাক্যটি ব্যাপক অর্থবোধক যা নিম্নোক্ত আলোচনায় প্রকাশ পায়।
আরেকটি বিষয় আলোচ্য যে, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু বলতে যেমন বুঝায় আল্লাহ ব্যতীত ইলাহ নাই। ঠিক তেমনি, আল্লাহু লা ইলাহা ইল্লা (আয়াতুল কুরসি) বাক্যটিও একই অর্থ প্রকাশ করে অর্থাৎ আল্লাহ ব্যতীত ইলাহ নাই। অথচ আল্লাহু লা ইলাহা ইল্লা, বাক্যটি কালেমারূপে গ্রহণ না করে, গ্রহণ করা হয়েছে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু যার আক্ষরিক অর্থ হচ্ছে, নাই উপাস্য ব্যতীত আল্লাহ। এর সম্ভাব্য একটি প্রধান কারণ হল ব্যাকরণ এবং ন্যূনতম আরও কয়েকটি কারণ হতে পারে। আর তা নিম্নক্রমে, ১- সহজ বোধগম্য, ২- এক কথায় প্রকাশ, ৩- যুক্তির অবতারণা, ৪- উৎপত্তি, ৫- বাস্তবতার প্রকাশ।
উল্লিখিত ব্যাখ্যা প্রদান-এর পূর্বে, দুটি বিষয়ে জানা জরুরি। আর তা হলো, সৃষ্টি’র উদ্দেশ্য কী এবং স্রষ্টার সাথে বান্দার সম্পর্ক কী। সৃষ্টি’র উদ্দেশ্য উৎপত্তি অধ্যায়ে আলোচনা করা হবে। এখানে স্রষ্টার সাথে বান্দার সম্পর্ক সম্পর্ক আলোচনা করা হলো।
কুরআনে উল্লেখ করা আয়াতসমূহ ও হাদিসের মাধ্যমে উক্ত সম্পর্কের বিষয়ে জানা যায়। কুরআনে বর্ণিত আয়াতসমূহের মাঝে কয়েকটি আয়াত: ১- “আমি জিন ও ইনসানকে সৃষ্টি করেছি একমাত্র আমার ইবাদত করার জন্য।” ২- “সেদিন কারও সাথে জুলুম করা হবে না, কেউ অণুপরিমাণ সৎকর্ম করলেও তা তার সামনে উপস্থাপিত করা হবে।” ৪- “এ কেমন আমলনামায় যাতে ছোট বড় কোনো গুনাহ বাদ নাই, ৫- সকলকে তার কর্মের পূর্ণ প্রতিফল দেওয়া হবে, ৬- “আজ তোমার হিসাব নেওয়ার জন্য তুমি-ই যথেষ্ট”। অপরদিকে হাদিসে আছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, রাব্বুল আলামিনের প্রতি বান্দার কর্তব্য হচ্ছে, বান্দা কোনো কিছুকে শরিক না করে একমাত্র তার ইবাদত করবে। আর বান্দার প্রতি রাব্বুল আলামিনের কর্তব্য হচ্ছে বান্দা কোনো কিছুকে তার সাথে শরিক না করে তার ইবাদত করলে তিনি বান্দাকে শাস্তি দিবেন না।
উপরে উল্লেখিত আয়াতসমূহ পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বান্দার সাথে রাব্বুল আলামিনের সম্পর্ক হলো ইবাদত ও তার প্রতি দান; কিন্তু তা শর্তযুক্ত। ইবাদত ও তার প্রতিদান যদিও আলোচ্য বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত, তবু তার বিস্তারিত আলোচনা করা হলে বক্তব্য শুধু দীর্ঘায়িত হবে, তাই শুধু এতটুকুই জানা যথেষ্ট যে, রাব্বুল আলামিনের প্রভুত্ব মেনে যে চিন্তা বা কাজ করা হোক না কেন তা ইবাদত রূপে গণ্য হবে এবং এর প্রতিদান প্রদান করা হবে। অপরদিকে তাকে না মেনে বা শিরক করে যত সৎকাজই করা হোক না কেন তা নিষ্ফল হিসেবে প্রতীয়মান হবে এবং এর প্রতিদানও প্রদান করা হবে।
যাই হোক ধারাবাহিকভাবে উক্ত বিষয়গুলোর আলোচনা করার মাধ্যমে সহজেই আশা করি উক্ত বাক্যদ্বয়ের মর্মার্থ প্রকাশিত হবে।
সহজ বোধগম্য— লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু বা আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নাই। প্রত্যক্ষভাবে সকল জাতি, সকল ধর্ম, সব শ্রেণীর ব্যক্তি, বুদ্ধিমান, বোকা, শিক্ষিত, অশিক্ষিত, সকলে তথা সর্বসাধারণের বোঝার জন্য, মনে রাখা এবং একই সাথে সাবলীলভাবে প্রকাশের জন্য আর পরোক্ষভাবে মুসলিম ও অমুসলিমের মধ্যে পার্থক্য করার জন্য লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু-কে কালেমা রূপে গ্রহণ করা হয়েছে।
এক কথায় প্রকাশ— সূরা ফাতিহার ক্ষেত্রে যেমন বলা হয় যে সূরাটি পূর্ণ কুরআন শরীফের সারাংশ, ঠিক তেমনি লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু বাক্যটি কুরআন শরীফসহ সকল আসমানি কিতাবের এক কথায় প্রকাশ। যদিও স্বাভাবিকভাবে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু বা “নাই উপাস্য ব্যতীত আল্লাহ” একটি একক বাক্য হিসেবে পরিলক্ষিত হয়, কিন্তু বাস্তবিকভাবে এর প্রতিটি শব্দ একটি করে বাক্যের প্রতিনিধি রূপ এবং একই সাথে উক্ত শব্দসমূহ ব্যবহার ভেদে বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন অর্থ প্রকাশ করে। নাই এবং তিনি, শব্দ দুটি একটি করে সরল বাক্য (simple sentence) এবং ব্যতীত তিনি, একটি যৌগিক বাক্যের (compound sentence) প্রতিনিধিত্ব প্রকাশ করে। উক্ত কালেমাটি একই সাথে সৃষ্টি এবং স্রষ্টার বিধান, সৃষ্টি’র প্রকৃতি ও স্রষ্টার প্রকৃতি বর্ণনা করে যা নিম্নক্রম অনুযায়ী বিশ্লেষণ করা হলো। উল্লেখ্য যে, আলোচনার সুবিধার্থে এখানে সর্বনাম ব্যবহার করা হয়েছে যেমনভাবে ব্যাকরণ (grammar)-এর ব্যবহার হয়ে থাকে এবং এই একটি ক্ষেত্র ব্যতীত সকল ক্ষেত্রে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু সর্বোত্তম এবং সম্ভবত ইমাম গাজ্জালি (র.) উক্ত বিষয়টির দিকে মনোনিবেশ করে থাকবে।
আরেকটি বিষয় যেহেতু রাব্বুল আলামিন তার পূর্ণ রূপে অস্তিত্ববান, তাই একটি অকর্মক ক্রিয়া (intransitive verb) “আছেন” (exist) শব্দটি, বিশেষ্য বা সর্বনাম পদ যাই ব্যবহার করা হোক না কেন ব্যাকরণগতভাবে তার সাথে যুক্ত বলে ধরে নিতে হবে। অর্থাৎ বাক্যটির মূল প্রকাশিত অবস্থা হয় নিম্নরূপ: “নাই, তিনি (আছেন), ব্যতীত তিনি (আছেন)”। একই সাথে আরেকটি কথা, উক্ত আলোচনায় কুরআন ও হাদিসের ভাবার্থ গ্রহণ করা হয়েছে, আক্ষরিক নয়।
সৃষ্টি’র বিধান: যদি গভীরভাবে চিন্তা করা হয় তাহলে সৃষ্ট মানব বা জিন জাতির ক্ষেত্রে দুই ধরনের বিধান পরিলক্ষিত হবে। হয় একত্ববাদী হবে, না হয় কাফের অথবা মুশরিক হবে। এর বাইরে কিছু হতে পারে না। নাই এবং তিনি (আছেন) দ্বারা নিম্নরূপভাবে উক্ত বিধান প্রকাশিত হয়।
নাই: লা শব্দটির অর্থ হচ্ছে না বা নাই। লা শব্দটি দ্বারা একই সাথে উপাস্য, উপাসনা, উপাসক এবং এর ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে। লা বা নাই শব্দটি সৃষ্টি’র একটি ভাগ অর্থাৎ কাফের, মুশরিক এবং এক শ্রেণীর মুসলিম নামধারক মুনাফিকদেরকে বুঝানো হয়েছে যাদের ইবাদত তথা বিশ্বাসে আল্লাহ নাই (এই একটি ক্ষেত্রে যেখানে আল্লাহ না থাকতে পারেন) আর থাকলেও শিরকযুক্ত। এদের ইবাদত বা আমল বা কর্মের কোনো মূল্য নাই। এই ব্যাপারে কুরআনে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
তিনি (আছেন): ইলাহ শব্দটির অর্থ হচ্ছে উপাস্য। যদিও শব্দটি বিশেষণ, কিন্তু এর দ্বারা সৃষ্টি’র অপর ভাগ অর্থাৎ একত্ববাদীদের কথা, তাদের কর্মের বা আমলের এবং তার মূল্যায়নের প্রকাশ করা হয়েছে। একত্ববাদী বলতে শুধু ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের উদ্দেশ্য নয়, বরং তাদের কথাও বুঝানো হয়েছে যারা অন্য ধর্মাবলম্বী কিন্তু শুধুমাত্র এক ও একক সত্তাকে তাদের প্রভু হিসেবে মানে এবং তারই ইবাদত করে এবং কোনো কিছুকে তার সাথে শরিক করে না।
এখানে একটি কথা আলোচনা করা প্রয়োজন। যদি গভীরভাবে লক্ষ করা হয় তাহলে দেখা যাবে যে লা বা নাই বলতে কোনো কিছুরই বাস্তব অস্তিত্ব নাই। এটা কেবল একটি ধারণা। আরও সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, লা বা নাই শব্দটি একটি আপেক্ষিক বিষয়, যা স্থান-কাল, পাত্রভেদে পরিবর্তনশীল বা ভিন্ন। (বাস্তব উদাহরণস্বরূপ, রহিমের নিকট ধন-সম্পদ নাই কিন্তু করিমের নিকট অনেক ধন-সম্পদ আছে)। তিনি আছেন বা স্রষ্টা আছেন—এই সত্তার বহিঃপ্রকাশের জন্য নাই বা বলা ভালো বিভিন্ন শব্দাদির অবতারণা করা হয়েছে।
সৃষ্টি জগতে এমন বহু কিছুই আছে যা শুধু নামেই আছে, বাস্তব কোনো অস্তিত্ব নাই অর্থাৎ নামসর্বস্ব। যারা একত্ববাদী, তারা সম্পূর্ণভাবে ব্যাপারটি অনুধাবন করতে পারবে কারণ তারা অবশ্যই গায়েবের বিশ্বাস করে। কারণ একত্ববাদীরা এটা মানে—ইহলোক ত্যাগ মানেই শেষ নয়, এর পরেও জীবন আছে। এই দিকগুলোর দিকে আলোকপাত করার জন্যই কুরআনে বহু আয়াতের অবতারণা করা হয়েছে। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য: ১- “মানুষের উপর দিয়ে এমন একটি সময় অতিবাহিত হয়েছে যখন সে উল্লেখযোগ্য কিছু ছিল না”, ২- “আদমকে আমি সব কিছুর নাম শিক্ষা দিলাম”, ৩- “ওগুলো তো নাম বই আর কিছু না”।
এখানে উল্লেখ্য যে আদম (আ.)-কে নাম শিক্ষা দেওয়ার আগে কুফর, শিরক বা নাস্তিকতা বলে কিছুই ছিল না, যদি থাকত তাহলে কিছু আয়াতের মূল্যই থাকত না, যার মাঝে উল্লেখ্য: ১- “আমরাই তো আপনার প্রশংসা করছি”, ২- “আমি আদমকে সব কিছুর নাম বলতে বললাম”, ৩- “আমাকে প্রশ্ন করার কেউ নাই”।
আরেকটি বিষয় উল্লেখ্য আর তা হলো কুফরের প্রকারভেদ। শিরকের ন্যায় কুফরও দুই প্রকার: ১- নাস্তিক ২- হুকুম অমান্যকারী বা সীমালঙ্ঘনকারী। কিন্তু মুনাফিকের কোনো প্রকারভেদ নাই। শয়তান মুশরিক বা নাস্তিক কোনোটাই নয়, বরং সে হুকুম অমান্যকারী বা সীমালঙ্ঘনকারী হিসেবে কাফের এবং মুনাফিক। তাই বলা হয়েছে, “মুনাফিকরা জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্থানে অবস্থান করবে”।
যাই হোক, নাই শব্দটি যে শুধুই ধারণা—তার বাস্তব উদাহরণস্বরূপ হচ্ছে বাতাসের নিম্নচাপ। নিম্নচাপের ক্ষেত্রে যদি সময়সাপেক্ষে উক্ত স্থানে বাতাস নাই বলে প্রতীয়মান হয় (যদিও তার স্থায়িত্ব খুবই সাময়িক হয়), কিন্তু তার মানে এই নয় যে উক্ত স্থানটি খালি বা কিছুই নাই। কারণ বাতাস না থাকলেও তরঙ্গ থাকা অস্বাভাবিক নয়, ঠিক তার বিপরীত অর্থাৎ বাতাস থাকলেও তরঙ্গ নাও থাকতে পারে। এখানে উল্লেখ্য যে তরঙ্গ না থাকা বলতে তা নির্ণয় যন্ত্রের ক্ষমতা বুঝতে হবে। আরও সহজভাবে বললে কণা তত্ত্বের কথা বলা যায়। কণা তত্ত্ব অনুযায়ী ফোটনের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য। কারণ নাই শব্দটির সাথে এর সমার্থক শব্দগুলি যেমন খালি, শূন্য, ফাঁকা ইত্যাদি শব্দের অবতারণা করা হয়েছে মূল একটি কথা প্রকাশের জন্য আর তা হলো, তিনি আছেন।
আরেকটি উদাহরণ হচ্ছে পূর্ব ও পশ্চিম। মূলত পূর্ব ও পশ্চিম বলে কোনো দিক নাই। ইহা শুধুই মাত্র একটি ধারণা যা সূর্যের উপর নির্ভরশীল। যেহেতু পৃথিবী কমলালেবুর ন্যায় গোল এবং সূর্যও পৃথিবীর নিজস্ব অক্ষে ঘুরছে, তাই পৃথিবীর যে প্রান্তে সূর্য উদয় হচ্ছে ঠিক তার বিপরীত দিকে অস্ত যাচ্ছে, আবার যে খানে অস্ত যাচ্ছে ঠিক তার বিপরীত দিকে উদয় হচ্ছে। সূর্যের উদয় আর অস্তের উপর নির্ভর করে পূর্ব ও পশ্চিম নির্ধারণ করা হচ্ছে। বাংলাদেশে যে দিক পশ্চিম, ঠিক তার উল্টো দিক আমেরিকার নিকট তা পূর্ব। বাস্তবিক পূর্ব ও পশ্চিম দিক নির্দিষ্টভাবে নির্ধারণের কোনো ক্ষেত্র নাই যেমন উত্তর দিক ও দক্ষিণ দিক নির্ধারণ করা হয় দুই মেরুকে কেন্দ্র করে। এই কারণে কুরআনে বলা হয়েছে, “আমি দুই পূর্ব ও পশ্চিমের মালিক”, যাহা দুই তাহাই নাই বা বলা উচিত ধারণা।
স্রষ্টার বিধান: যদি রাব্বুল আলামিন যা ইচ্ছা করতে পারেন এবং তার জন্য তিনি কাউকে জবাব দিতে বাধ্য নন, বরং বলা ভালো কেউ নেই তাকে প্রশ্ন করার। তারপরও তিনি তার জন্য একটি বিধান নির্ধারণ করে রেখেছেন যার পরিপন্থী তিনি করেন না। সে যে-ই হোক একত্ববাদী বা নাস্তিক বা মুশরিক, সকল ক্ষেত্রে ফলাফল প্রদান করা হবে। শাস্তি ও প্রদত্ত হতে পারে আবার ক্ষমাও করা হতে পারে। কোনো ক্ষেত্রে কেউ প্রশ্ন করার নাই। কারণ তিনি একমাত্র অন্তর্দৃষ্টি সম্পন্ন এবং যাবতীয় বিষয়ে একমাত্র জ্ঞানসম্পন্ন অস্তিত্বের অধিকারী সত্তা। “ব্যতীত তিনি” দ্বারা উক্ত বিধান প্রকাশ করা হয়েছে।
ব্যতীত তিনি (আছেন): ব্যতীত শব্দটি একটি অব্যয় বাচক শব্দ যা দুটি বাক্যকে যুক্ত করে এবং যা মাত্র দুই প্রকারের যেকোনো এক প্রকার অর্থ প্রকাশ করে। উদাহরণস্বরূপ, ১- রহিম ব্যতীত করিমের আর কোনো ভাই নাই। ২- রহিম ব্যতীত করিমের আর একটি (একাধিক, অনেক) ভাই আছে। উল্লেখ্য যে, যেকোনো বাক্যের একটি উদ্দেশ্য এবং আকাঙ্ক্ষা থাকে। ব্যতীত তিনি (আছেন) দ্বারা স্বাভাবিকভাবে বাক্যের উদ্দেশ্য বা আকাঙ্ক্ষা কোনোটাই পূরণ হয় না।
যেহেতু পূর্ব আলোচনায় এটা প্রমাণিত যে, আল্লাহতালাই একমাত্র প্রতিফল দানকারী তাই বাক্যটি যদি নিম্নরূপ লেখা হয়, “ব্যতীত তিনি আর যাদের উপাসনা করা হয় তাদের কারও প্রতিফল প্রদানের কোনো ক্ষমতা নাই”, তাহলে বাক্যের উদ্দেশ্য এবং আকাঙ্ক্ষা উভয়ই যেমন পূর্ণ হয় ঠিক তেমনি বিশেষ অর্থপূর্ণ কথাও প্রকাশ পায়।
সৃষ্টি’র প্রকৃতি: সৃষ্টি’র প্রতিটি ক্ষেত্রে রাব্বুল আলামিন তার এককত্বের বহিঃপ্রকাশ করেছেন। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু বা তার একত্বের বহিঃপ্রকাশ শুধুমাত্র মৌখিক নয় বরং কর্মের মাধ্যমে তথা সৃষ্টি এবং সৃষ্টি’র প্রকৃতির মাঝেও উক্ত শব্দাদির প্রয়োগও যে বিদ্যমান নিম্নে তা আলোচনা করা হলো।
নাই: প্রকৃতি শব্দটি একটি বিশেষণ। স্বভাব, চরিত্র, বৈশিষ্ট্য, গুণ ইত্যাদি শব্দাদির এর কয়েকটি সমার্থক শব্দ। এখন একটু গভীরভাবে লক্ষ করলে একটি বিষয় পরিলক্ষিত হবে সমগ্র সৃষ্টি’র মাঝে আর তাহলো পরনির্ভরশীলতা। আরও সহজভাবে বলা যায় কোনো সৃষ্টিই স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়, কোনো না কোনোভাবে অপূর্ণ। অর্থাৎ পূর্ণতা নাই। যেমন মানুষ না খেয়ে বাঁচতে পারে না। লা বা নাই দ্বারা ইহাই বুঝানো হয়েছে।
তিনি (আছেন): স্বাভাবিকভাবে প্রশ্নের উৎপত্তি হয় রাব্বুল আলামিন সৃষ্টি’র প্রকৃতির মধ্যে কীভাবে থাকতে পারেন? মূলত এই কথাটির মূল বক্তব্য না বোঝার দরুন কিছু সম্প্রদায় এই বিভ্রান্তির সম্মুখীন হয়ে স্রষ্টার সাথে সৃষ্টি কে এক করে ফেলেছে বা বলা ভালো করে ফেলেছে। লক্ষ করলে প্রতিটি সৃষ্টির ক্ষেত্রে একটি বিষয় অবশ্যই পরিলক্ষিত হবে আর তাহলো স্বতন্ত্রতা। সহজভাবে বললে, বাহ্যিক বা আভ্যন্তরীণ, গঠন, বৈশিষ্ট্য, গুণ বা চরিত্র ইত্যাদি যাই হোক না কেন, যেকোনো একটি ক্ষেত্রে হলেও কোনো না কোনোভাবে পার্থক্য পরিলক্ষিত হবেই। উদাহরণস্বরূপ মানুষের আঙুলের ছাপ (fingerprint) যা কোনো মানুষেরই এক নয়। এই কারণে বলা হয় সমগ্র সৃষ্টি’র মাঝে তিনি আছেন। কুরআন অনুযায়ী: “আমি আদমকে আমার সদৃশ সৃষ্টি করেছি”।
ব্যতীত তিনি (আছেন): স্বাভাবিকভাবে প্রশ্নের উৎপত্তি হয় যে ব্যতীত তিনি (আছেন) কথাটির বহিঃপ্রকাশ কীভাবে হতে পারে? প্রথমে জানা দরকার যে, রাব্বুল আলামিন আর কীভাবে বান্দার সাথে থাকতে পারেন? যেহেতু এখানে বান্দার প্রকৃতি’র বিষয়ে আলোচনা করা হচ্ছে, তাই বান্দার প্রকৃতির আর কী স্বরূপ আছে এটা জানাও জরুরি।
তাড়াহুড়ো বা সীমালঙ্ঘন করা বান্দার একটি প্রকৃতি। অপরদিকে তাড়াহুড়ো করা বা সীমালঙ্ঘন করা রাব্বুল আলামিনের অপছন্দনীয় কাজ। অতএব সৃষ্টি’র প্রকৃতির ক্ষেত্রে বাক্যটি নিম্নরূপ হলে প্রকৃত মর্ম প্রকাশিত হবে: তাড়াহুড়োকারী বা সীমালঙ্ঘনকারী বান্দা ব্যতীত অন্য সকল বান্দার সাথে তিনি আছেন। অন্যভাবে বললে, রাব্বুল আলামিনের নির্ধারিত সীমার মাঝে যতক্ষণ বান্দা আছে ততক্ষণ তিনি বান্দার সাথে আছেন, এর বাইরে তিনি নাই।
স্রষ্টার প্রকৃতি: সৃষ্টি’র ন্যায় স্রষ্টারও প্রকৃতি, বলা ভালো গুণাবলি আছে যার বহিঃপ্রকাশও উক্ত কালেমা দ্বারা করা হয়েছে।
নাই: রাব্বুল আলামিনের ক্ষেত্রে নাই দ্বারা একটি ব্যাপারই নাই বলে প্রকাশ পায় আর তা হলো ত্রুটি। অর্থাৎ তিনি যাবতীয় ত্রুটিমুক্ত। তাই বলা হয় সুবহানাল্লাহ। তিনি পবিত্র।
তিনি (আছেন): যদিও তিনি দৃশ্যমান নন তবুও রাব্বুল আলামিন আছেন আপন সত্তায় বিরাজমান। এখন স্বাভাবিকভাবে প্রশ্নের উৎপত্তি হয় যে তিনি তাহলে কীভাবে আছেন? তিনি আছেন সৃষ্টি এবং তার পরিচালনার মাধ্যমে প্রকাশিত, যা তার গুণাবলির বহিঃপ্রকাশ এবং এর মাধ্যমে তিনি প্রকাশিত, যা উপলব্ধিযোগ্য। আরও উল্লেখ্য যে যাবতীয় গুণাবলির একমাত্র মালিক তিনি, যা অনুধাবনের বিষয়। উক্ত কারণে বলা হয়, আলহামদুলিল্লাহ অর্থাৎ যাবতীয় প্রশংসার মালিক তিনি।
ব্যতীত তিনি (আছেন): পূর্বোল্লিখিতভাবে বাক্যটি নিম্নরূপ— ব্যতীত তিনি (আছেন) আর কোনো দাতা নাই। এভাবে বলা যায়, ব্যতীত তিনি (আছেন) আর সকলে গ্রহীতা। তাই বলা হয় আল্লাহু আকবর বা আল্লাহ মহান।
যুক্তির অবতারণা: লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু কালেমাটি একটি যুক্তি, বরং বলা ভালো একটি সূত্রের অবতারণা করে। পূর্বে যুক্তি বলতে কী বুঝায় তা উল্লেখ করা হয়েছে, তাই আলোচনা দীর্ঘ না করে সংক্ষিপ্তভাবে করা হলো।
নাই: নাই শব্দটি পুরোপুরি আপেক্ষিক। ঠিক তেমনি সংখ্যাদির মাঝে ০ সংখ্যাটিও আপেক্ষিক। আপাতদৃষ্টিতে তাওহীদ পরিপন্থীদের কর্মকাণ্ড মূল্যবান মনে হলেও মূলত তা মূল্যহীন, কারণ তা এই দুনিয়াতে সীমাবদ্ধ। তাই নাই বা না দ্বারা প্রকাশিত বাক্যের যুক্তিগত বাস্তব রূপ সংখ্যায় প্রকাশ করলে তা ০ এর সাথে তুলনাযোগ্য। কারণ ০ এর নিজস্ব কোনো মূল্য নাই, অন্য সংখ্যা এর উপর নির্ভরশীল। কোনো সংখ্যার বামে বসলে এর কোনো মূল্য নাই, অপরদিকে সংখ্যার ডানে বসলে মূল্য প্রকাশ পায় তবে তা অপর সংখ্যার মানের উপর নির্ভর করে।
তিনি (আছেন): যেহেতু উক্ত শব্দ দ্বারা প্রকাশিত বাক্যটি একত্ববাদী তথা তাওহীদপন্থীদের প্রকাশ করে, বা বলা ভালো নির্ধারিত একটি গোষ্ঠীকে বুঝায়, তাই সংখ্যায় প্রকাশিত হলে তা ১ এর প্রতিনিধিত্ব করে।
ব্যতীত তিনি (আছেন): উক্ত শব্দদ্বয় দ্বারা যেহেতু একটি যৌগিক বাক্য অর্থাৎ দুটি বাক্য প্রকাশ্য যার একটি বুঝায় শুধুমাত্র একজনই প্রতিদানকারী আছেন যিনি সকল গুণের অধিকারী, আর অপরটি দ্বারা বুঝায় আর কেউ প্রতিদান করার ক্ষমতা রাখে না বা গুণহীন, তাই সংখ্যা দ্বারা উক্ত বাক্যদ্বয় প্রকাশিত হলে তা নিম্নরূপভাবে প্রকাশ হবে: ১, ০।
অর্থাৎ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু এর সংখ্যাগত প্রকাশিত রূপ হলো ক্রমানুসারে ০, ১, ১, ০। যার বর্তমানকালীন দুনিয়া এবং কম্পিউটার এর বাইনারি সংখ্যা সম্পর্কিত একটু হলেও ধারণা আছে, সে-ই উক্ত বক্তব্যের মর্ম উপলব্ধি করতে পারবে।
উৎপত্তি: কুরআন অনুযায়ী “আমাকে প্রশ্ন করার কেউ নাই, সকলকে আমি-ই প্রশ্ন করব”। উক্ত কথার যথার্থতা বর্ণনাতীত, কারণ প্রশ্ন করার কোনো সুযোগ নাই। কারণ এখন যা প্রশ্ন, কাল তা উত্তর রূপে পরিগণিত হয়। হাদিসে কুদসিতে উল্লেখ আছে, রাব্বুল আলামিন বলেছেন, “আমি গোপন ছিলাম, নিজেকে পরিচিত করতে ইচ্ছা করলাম তাই সৃষ্টি করলাম”। উল্লেখিত হাদিসটি লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে সৃষ্টি’র কারণ হচ্ছে রাব্বুল আলামিনের ইচ্ছা। যদিও ইচ্ছা একটি ক্রিয়া, কিন্তু ইহা শুধুই নিজস্ব সত্তার সাথে সম্পর্কিত। অন্যভাবে বললে, বলা যায় ইচ্ছা একটি আভ্যন্তরীণ বিষয় যা সম্পূর্ণ একটি আপেক্ষিক বিষয়। বাস্তব প্রকাশ ছাড়া যার কোনো মূল্য নাই। সংখ্যাগতভাবে ০ এর সাথে তুলনীয়। অপরদিকে কর্ম তথা সৃষ্টি হচ্ছে প্রকাশিত রূপ। সংখ্যাগতভাবে প্রকাশ করলে ১ (সমগ্র সৃষ্টি) হলো এর প্রকাশিত রূপ।
এখন ব্যাকরণগতভাবে কর্মের সংজ্ঞা হচ্ছে, কর্তার ইচ্ছাই কর্ম। তাহলে অপরটিও সত্য, অর্থাৎ কর্তার কর্মই হচ্ছে কর্তার ইচ্ছা। কারণ উভয় ক্ষেত্রে উদ্দেশ্য এক, আর তা হলো পরিচিতি। তাই উক্ত হাদিসটি এভাবে বলা যায়, “আমি গোপন ছিলাম, আমি সৃষ্টি করলাম কারণ আমি নিজেকে পরিচিত করতে ইচ্ছা করলাম”।
সংখ্যাগত প্রকাশ ০, ১ যেমন সঠিক, ঠিক তেমনি ১, ০-ও সঠিক।
বাস্তবতার প্রকাশ — এই কালাম (বাণী) সৃষ্টির অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ—এই তিনটি বাস্তবতাকেই প্রকাশ করে।
নাই — কুরআনের মতে, “সৃষ্টির ওপর এমন একটি সময় অতিবাহিত হয়েছে, যখন তা আলোচনা করার মতো কিছুই ছিল না।” এর অর্থ হলো, সৃষ্টির একটি সূচনাবিন্দু ছিল এবং তারও আগে সময়ের অস্তিত্ব ছিল, যাকে আধুনিক বিজ্ঞানীরা বিগ ব্যাং-পূর্ব যুগ নামে অভিহিত করেন।
তিনি আছেন — এটি বর্তমান সময়কে প্রকাশ করে এবং মানবজীবনের চলমান অস্তিত্বের ধারণা দেয়। আধুনিক বিজ্ঞানীরা একে বিগ ব্যাং-পরবর্তী যুগ বলে থাকেন।
ব্যতিত তিনি আছেন — এটি ভবিষ্যৎকে প্রকাশ করে। অর্থাৎ, এই পার্থিব জীবনের বাইরে আরেকটি জীবন রয়েছে, যা পরকালকে নির্দেশ করে। আধুনিক বিজ্ঞানের এ সম্পর্কে সরাসরি কোনো ধারণা নেই; তবে আধুনিক বিজ্ঞানের বিভিন্ন আবিষ্কারের আলোকে এর সম্ভাবনা সম্পর্কে ধারণা করা যেতে পারে।
পরিশেষে উল্লেখ্য যে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু শুধুমাত্র ত্রুটিহীনই নয় বরং পরিপূর্ণ এবং গভীর মর্মসম্পন্ন, যা সমগ্র সৃষ্টিজগতের মূলতত্ত্ব এক কথায় প্রকাশ করে। এটি সার্বিক গুণসম্পন্ন এবং একই সাথে অবহিত করে যে ইসলাম ধর্ম আমাদের প্রতি বিশ্বজাহানের স্রষ্টা আল্লাহ কর্তৃক প্রদত্ত রহমতস্বরূপ, যার প্রতিটি ক্ষেত্র বিজ্ঞানভিত্তিক এবং কোনো প্রকার ত্রুটি তাতে নেই। এটি ত্রুটিপূর্ণ মানুষের প্রবর্তিত নয়। যে কারণেই কুরআনে সকলকে আহ্বান করে বলা হয়েছে, যদি কেউ পারে তবে কুরআনের সুরার ন্যায় একটি সুরা তৈরি করে নিয়ে আসার জন্য। উক্ত আহ্বানের ১৪০০ বছর পার হয়ে গেছে কিন্তু কেউ তা করতে সমর্থ হয়নি এবং ইনশাআল্লাহ তা পারবেও না।










