অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ইতিহাস, ৯ উইকেটে জিতল বাংলাদেশ

অনলাইন ডেস্ক:

অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথম টেস্ট জয়ের ইতিহাস গড়ল বাংলাদেশ। ডারউইনের মারারা স্টেডিয়ামে স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটে হারিয়ে ২৩ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়েছে নাজমুল হোসেন শান্তর দল। অস্ট্রেলিয়ার ২৮৪ রানের দ্বিতীয় ইনিংসের পর বাংলাদেশের সামনে জয়ের লক্ষ্য দাঁড়ায় ৫৭ রান। তানজিদ হাসান শূন্য রানে ফিরলেও মুমিনুল হক ও সাদমান ইসলাম মিলে ১৪.২ ওভারে মাত্র এক উইকেট হারিয়ে জয় নিশ্চিত করেন।

 

এই জয় অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্টে বাংলাদেশের দ্বিতীয় জয়। এর আগে ২০১৭ সালে মিরপুরে প্রথমবার অস্ট্রেলিয়াকে টেস্টে হারিয়েছিল বাংলাদেশ। তবে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে এটাই বাংলাদেশের প্রথম জয়। ২০০৩ সালে প্রথমবার অস্ট্রেলিয়া সফরে গিয়ে দুই টেস্টেই বড় ব্যবধানে হারের পর প্রায় ২৩ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে বাংলাদেশকে।

 

ডারউইন টেস্টে অবশ্য শুরু থেকেই বাংলাদেশ নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিতে থাকে। ১৩ আগস্ট শুরু হওয়া ম্যাচের প্রথম ইনিংসে হাসান মাহমুদের ক্যারিয়ারসেরা বোলিংয়ে মাত্র ১৯৮ রানে অলআউট হয় অস্ট্রেলিয়া। ১৭ ওভারে ৫৫ রান দিয়ে ৬ উইকেট নেন হাসান। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্টে বাংলাদেশের কোনো বোলারের এটাই সেরা বোলিং।

 

তাসকিন আহমেদ ও এবাদত হোসেনও পেস আক্রমণে তাকে দারুণ সঙ্গ দেন। অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংসের ১০ উইকেটই নেন বাংলাদেশের পেসাররা। শুরুতেই স্বাগতিকদের চাপে ফেলে ম্যাচের গতিপথ নিজেদের অনুকূলে নিয়ে আসে বাংলাদেশ।

 

ব্যাট হাতেও সেই ধারাবাহিকতা ধরে রাখেন বাংলাদেশের ব্যাটাররা। মাত্র দ্বিতীয় টেস্ট খেলতে নামা তানজিদ হাসান তামিম অস্ট্রেলিয়ার শক্তিশালী পেস আক্রমণের বিপক্ষে খেলেন ১৯৭ বলে ১০১ রানের দুর্দান্ত ইনিংস। আটটি চার ও একটি ছক্কায় সাজানো তার এই সেঞ্চুরি ছিল ক্যারিয়ারের প্রথম টেস্ট শতক। একই সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে কোনো বাংলাদেশি ব্যাটারের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি।

 

তানজিদের সঙ্গে ১০২ রানের জুটি গড়েন মুমিনুল হক। এরপর নাজমুল হোসেন শান্তর ৮৪ ও মেহেদী হাসান মিরাজের ৬৫ রানের ইনিংসে বাংলাদেশের স্কোর আরও বড় হয়। লোয়ার অর্ডার থেকেও আসে গুরুত্বপূর্ণ রান। শেষ পর্যন্ত ৪২৬ রানে অলআউট হয়ে অস্ট্রেলিয়ার চেয়ে ২২৮ রানের লিড নেয় বাংলাদেশ।

 

এরপর দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নেমে আবারও শুরুতে ধাক্কা খায় অস্ট্রেলিয়া। হাসান মাহমুদ ফিরিয়ে দেন জেক ওয়েদারাল্ড ও ট্রাভিস হেডকে। প্রথম ইনিংসে ৬ উইকেট নেওয়া এই পেসার দ্বিতীয় ইনিংসে আরও ৩ উইকেট নিয়ে ম্যাচে মোট ৯ উইকেট শিকার করেন।

 

তবে এরপর অস্ট্রেলিয়াকে কিছুটা স্বস্তি দেন মার্নাস লাবুশেন, স্টিভেন স্মিথ ও ক্যামেরন গ্রিন। লাবুশেন করেন ৩১, স্মিথ ৪৪ রান। আর বাংলাদেশের বোলারদের সামনে একাই লড়াই চালিয়ে যান গ্রিন।

 

চতুর্থ দিনের শুরুতে ৪ উইকেটে ১৬১ রান নিয়ে ব্যাট করতে নামে অস্ট্রেলিয়া। বাংলাদেশের চেয়ে তখনও ৬৭ রান পিছিয়ে ছিল তারা। হাতে ছিল ছয় উইকেট। দিনের প্রথম সেশনেই ম্যাচের চিত্র আরও একবার বাংলাদেশের দিকে ঘুরিয়ে দেন মিরাজ।

 

অ্যালেক্স ক্যারিকে ৩০ রানে ফেরানোর পর বিউ ওয়েবস্টার ও প্যাট কামিন্সকেও সাজঘরে পাঠান এই অফস্পিনার। ক্যারি ও গ্রিনের ৫৬ রানের জুটি ভাঙার পর ওয়েবস্টার মাত্র ৫ এবং কামিন্স ৮ রান করে ফেরেন। নতুন দিনে এটি ছিল মিরাজের তৃতীয় উইকেট, ইনিংসে চতুর্থ।

 

এক পর্যায়ে মনে হচ্ছিল, অস্ট্রেলিয়াকে হয়তো ইনিংস ব্যবধানেই হারাবে বাংলাদেশ। কিন্তু গ্রিন ও মিচেল স্টার্কের জুটিতে সেই সম্ভাবনা থেমে যায়। প্রথম সেশন শেষে অস্ট্রেলিয়া ৭ উইকেটে ২৪৩ রান করে লাঞ্চে যায়। তখন তাদের লিড ছিল ১৫ রান।

 

দ্বিতীয় সেশনের শুরুতেই স্টার্ককে ফিরিয়ে দেন তাসকিন আহমেদ। ৩৪ বলে দুই চারে ১৮ রান করেন স্টার্ক। গ্রিনের সঙ্গে তার জুটি থেকে আসে ৪৩ রান।

 

অন্য প্রান্তে গ্রিন তখনও অবিচল। ১৩ মাস পর এবং ১৩ ইনিংস পর টেস্টে হাফ সেঞ্চুরি করেন তিনি। এমনকি ৯৫ রানে জীবনও পান এই অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটার। তাসকিন আহমেদের বলে পাওয়া সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে গ্রিন তুলে নেন সেঞ্চুরি।

 

শেষ পর্যন্ত ২০১ বলে ৪ চার ও ১ ছক্কায় ১০৪ রান করেন গ্রিন। তবে তার সেঞ্চুরি অস্ট্রেলিয়াকে বড় লিড এনে দিতে পারেনি। গ্রিনকে বোল্ড করে ফেরান হাসান মাহমুদ। এর মধ্য দিয়ে ম্যাচে নিজের নবম উইকেট পান তিনি।

 

গ্রিনের প্রতিরোধ ভাঙার পর অস্ট্রেলিয়ার লেজ দ্রুত গুটিয়ে দেন মিরাজ। ৬০তম ওভারে তার বাঁক খাওয়া বলে ব্যাটের কানায় লেগে অ্যালেক্স ক্যারির পর আরও একের পর এক উইকেট আসে। শেষ পর্যন্ত বিউ ওয়েবস্টার, প্যাট কামিন্স ও নাথান লায়নকে ফিরিয়ে ইনিংসে পাঁচ উইকেট পূর্ণ করেন মিরাজ। ৬৬ রান দিয়ে টেস্টে ১৫তমবার পাঁচ উইকেট নেওয়ার কীর্তি গড়েন তিনি।

 

লাঞ্চের আগে নিজের বোলিং নিয়ে মিরাজ সাবেক অস্ট্রেলিয়ান পেসার ও ধারাভাষ্যকার ব্রেন্ডন জুলিয়ানকে বলেন, “সহজভাবে সবকিছু করতে চেয়েছি। অফ স্টাম্পের বাইরে (পিচে) প্রচুর ফুটমার্কস আছে, সেখানে বল ফেলার চেষ্টা করেছি। সব ওভারেই উইকেটের খোঁজ করিনি। এমন উইকেটে শৃঙ্খলা রেখে বোলিং গুরুত্বপূর্ণ।”

 

সেই শৃঙ্খলাই ধরে রাখেন বাংলাদেশের বোলাররা। অস্ট্রেলিয়া শেষ পর্যন্ত ২৮৪ রানে অলআউট হয়। গ্রিনের ১০৪ রানের পাশাপাশি স্মিথ ৪৪, লাবুশেন ৩১, ক্যারি ৩০, স্টার্ক ১৮ ও লায়ন ১৫ রান করেন। বাংলাদেশের হয়ে মিরাজ ৫টি, হাসান মাহমুদ ৩টি এবং তাসকিন আহমেদ ও তাইজুল ইসলাম একটি করে উইকেট নেন।

 

ফলে বাংলাদেশের সামনে জয়ের জন্য লক্ষ্য দাঁড়ায় ৫৭ রান। ছোট লক্ষ্য হলেও শুরুতেই তানজিদ হাসানকে হারায় বাংলাদেশ। জশ হ্যাজলউডের বলে শূন্য রানে বোল্ড হন প্রথম ইনিংসের ঐতিহাসিক সেঞ্চুরিয়ান।

 

তবে সেই ধাক্কা আর বড় হতে দেননি মুমিনুল হক ও সাদমান ইসলাম। দ্বিতীয় উইকেটে অবিচ্ছিন্ন ৫৩ রানের জুটি গড়ে ম্যাচ শেষ করেন দুজন। সাদমান ২৫ এবং মুমিনুল ৩০ রানে অপরাজিত থাকেন। ওয়েবস্টারকে ডিপ ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্ট দিয়ে বাউন্ডারি মেরে জয়সূচক রানটি করেন মুমিনুল।

 

১৪.২ ওভারে ১ উইকেটে ৫৭ রান তুলে বাংলাদেশ নিশ্চিত করে ৯ উইকেটের ঐতিহাসিক জয়।

 

এই জয়ের পেছনে বাংলাদেশের বোলারদের দাপট ছিল শুরু থেকেই। প্রথম ইনিংসে হাসান মাহমুদের ৬ উইকেট, ব্যাট হাতে তানজিদের সেঞ্চুরি, শান্ত ও মিরাজের অর্ধশতক, এরপর দ্বিতীয় ইনিংসে মিরাজের পাঁচ উইকেট এবং হাসানের আরও তিন উইকেট মিলিয়ে চার দিনেই অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে দেয় বাংলাদেশ।

 

ডারউইনের গ্যালারিতেও জয়ের পর বদলে যায় দৃশ্যপট। অস্ট্রেলিয়ার অল্পসংখ্যক দর্শকের মাঝেও গর্জে ওঠে, “বাংলাদেশ, বাংলাদেশ।” অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী বাংলাদেশিদের উচ্ছ্বাসে কিছু সময়ের জন্য মারারা স্টেডিয়াম যেন বাংলাদেশের ঘরের মাঠে পরিণত হয়। ড্রেসিংরুমের সামনে ক্রিকেটাররা একে অন্যকে জড়িয়ে ধরে উদযাপনে মেতে ওঠেন।

 

চতুর্থ দিনে অবশ্য গ্যালারিতে দর্শক ছিল খুবই কম। ম্যাচের আগের তিন দিনের উৎসবমুখর পরিবেশও দেখা যায়নি। স্টেডিয়ামের প্রিমিয়াম এক্সপেরিয়েন্স লাউঞ্জ, যেখানে আগের দিনগুলোতে সাবেক ক্রিকেটার, ক্রিকেট কর্মকর্তা ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতি ছিল, সেখানেও ছিল না কোনো আয়োজন। বসানো হয়নি খাবারের টেবিল, ছিল না বুফে বা পানীয়ের ব্যবস্থা।

 

লাউঞ্জের এক কর্মীর ভাষ্য অনুযায়ী, ডারউইন টেস্ট তৃতীয় দিনের পর আর গড়াবে না ধরে নিয়ে চতুর্থ দিনের জন্য কেউ প্রিমিয়াম এক্সপেরিয়েন্স লাউঞ্জের টিকিট কাটেনি। পরে ম্যাচ চতুর্থ দিনে গড়ালেও অস্ট্রেলিয়ার পরিস্থিতি বিবেচনায় নতুন করে টিকিটও বিক্রি হয়নি। ফলে স্টেডিয়াম কর্তৃপক্ষ আগেই জানিয়ে দিয়েছিল, চতুর্থ দিনে লাউঞ্জটি বন্ধ থাকবে।

 

মাঠের লড়াই চতুর্থ দিন পর্যন্ত গড়ালেও ম্যাচের সম্ভাব্য পরিণতি যেন অনেকটাই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল আগেই। শেষ পর্যন্ত সেই প্রত্যাশাই সত্যি হলো। ২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ফিরে বাংলাদেশ শুধু প্রতিদ্বন্দ্বিতা করল না, বরং স্বাগতিকদের ৯ উইকেটে হারিয়ে লিখল নিজেদের টেস্ট ইতিহাসের নতুন অধ্যায়।

 

সংক্ষিপ্ত স্কোর:

 

অস্ট্রেলিয়া: ১৯৮ ও ২৮৪ (গ্রিন ১০৪, স্মিথ ৪৪, লাবুশেন ৩১, ক্যারি ৩০, স্টার্ক ১৮, লায়ন ১৫; মিরাজ ৫/৬৬, হাসান ৩/৫৬, তাসকিন ১/৬৬, তাইজুল ১/৫১, এবাদত ০/৩৮)

 

বাংলাদেশ: ৪২৬ ও ১/৫৭ (মুমিনুল ৩০*, সাদমান ২৫*, তানজিদ ০; হ্যাজলউড ১/৫, স্টার্ক ০/১৫, লায়ন ০/২৩)

 

ফল: বাংলাদেশ ৯ উইকেটে জয়ী

 

ম্যাচসেরা: হাসান মাহমুদ

 

সিরিজ: দুই ম্যাচের সিরিজে বাংলাদেশ ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে