নিজস্ব প্রতিবেদক:
আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক দল মনে করেন না বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। দলটিকে ‘মাফিয়া গ্যাং’ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেছেন, অতীতে সহিংসতার পর কোনো দল রাজনীতিতে ফিরতে চাইলে অন্তত অনুশোচনা ও সহিংসতা থেকে সরে আসার মানসিকতা থাকা প্রয়োজন। অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধনের ওপর হামলার ঘটনাকে আওয়ামী লীগের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তোলার আরেকটি কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন তিনি।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ের তথ্য অধিদফতরের সম্মেলন কক্ষে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে আয়োজিত সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন জাহেদ উর রহমান।
আজমেরী হক বাঁধনের ওপর হামলার বিষয়ে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, ঘটনার ভিডিও সরকার দেখেছে। হামলাকারীরাও নিজেদের কর্মকাণ্ডের ভিডিও প্রকাশ করেছে। এ ঘটনায় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, “আমরা অবশ্যই এটা ছেড়ে দেব না। এটা কোনোভাবেই ছেড়ে দেওয়া যাবে না।”
তিনি স্পষ্ট করেন, কোনো ব্যক্তি বা পক্ষের ওপর এ ধরনের হামলা হলে সরকার একইভাবে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে। রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে সহিংসতা চালালেও আইনের আওতার বাইরে থাকার সুযোগ নেই।
বাঁধনের ওপর হামলার প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন জাহেদ উর রহমান। তিনি বলেন, “আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক দল কিনা, এই আলোচনা আমরা অনেকে করেছি। আমি আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক দল মনে করি না। আমরা যে মাফিয়া গ্যাং বলছি, এই ঘটনা তার আরেকটি প্রমাণ।”
তার বক্তব্য অনুযায়ী, অতীতে সহিংসতায় জড়িত কোনো রাজনৈতিক শক্তি আবার রাজনীতিতে ফিরতে চাইলে নিজেদের কর্মকাণ্ড নিয়ে অনুশোচনা এবং সহিংসতা থেকে সরে আসার প্রবণতা থাকা উচিত। কিন্তু শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড সেই প্রশ্নকে আরও সামনে এনেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
জাহেদ উর রহমান বলেন, সহিংস কর্মকাণ্ড অব্যাহত রেখে রাজনৈতিক অধিকার দাবি করা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। বাঁধনের ওপর হামলার ঘটনাও আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক দল হিসেবে বিবেচনা করা উচিত কি না, সেই বিতর্ক নতুন করে সামনে এনেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধনের উদ্দেশে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, আওয়ামী লীগের হেনস্তার শিকার হওয়াকে তার অবস্থানের এক ধরনের অর্জন বা সম্মান হিসেবেও দেখা যেতে পারে। তার ভাষায়, “এই ঘটনা এটাই প্রমাণ করে তিনি সঠিক পথে আছেন।”
বাঁধন নিজেকে ‘জুলাই যোদ্ধা’ হিসেবে উল্লেখ করার প্রসঙ্গও আসে তার বক্তব্যে। এ বিষয়ে জাহেদ উর রহমান বলেন, “ইয়েস, আই অ্যাম।” একই সঙ্গে তিনি বলেন, তারাও অনেকে একইভাবে হামলার শিকার হতে পারেন। তবে এতে তাদের অবস্থান বদলাবে না। “আমরা হামলার শিকার হতে পারি, কিন্তু তাতে কিছু যায় আসে না,” বলেন তিনি।
শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরাতে চায় সরকার
ব্রিফিংয়ে ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরানোর বিষয়েও সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন জাহেদ উর রহমান। তিনি বলেন, শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে আসতে হবে এবং সরকার তাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে চায়।
তথ্য উপদেষ্টার ভাষ্য, শেখ হাসিনা বর্তমানে পলাতক ও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান প্রসিকিউটর জানিয়েছেন, তার আর আপিল করার সুযোগ নেই। ফলে বিষয়টি এখন এমন অবস্থায় রয়েছে যে শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তার জন্য মৃত্যুদণ্ড অপেক্ষা করছে।
জাহেদ উর রহমান বলেন, “শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে আসতে হবে, তাকে ধরে নিয়ে আসতে চাই। তিনি পলাতক আসামি, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি।”
তিনি আরও বলেন, “টেকনিক্যালি ব্যাপারটি এমন, শেখ হাসিনা আসবেন এবং তার জন্য মৃত্যুদণ্ড অপেক্ষা করছে।”
শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি শুধু ভারতের ওপর চাপ তৈরির কৌশল নয় বলেও মন্তব্য করেন তথ্য উপদেষ্টা। তার বক্তব্য, সরকার তাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে চায় এবং এ বিষয়ে কোনো কৌশল বা অন্য উদ্দেশ্য নেই।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের প্রসঙ্গও তোলেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের সঙ্গে শেখ হাসিনাকে ফেরত চাওয়ার বিষয়টি শর্ত হিসেবে যুক্ত হয়েছে উল্লেখ করে জাহেদ উর রহমান বলেন, বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া উচিত।
সাম্প্রতিক সময়ে শেখ হাসিনা ভারতের কয়েকটি প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দেওয়ায় অসন্তোষ প্রকাশ করেন তথ্য উপদেষ্টা। তিনি বলেন, প্রত্যর্পণ না হওয়া পর্যন্ত শেখ হাসিনা যেন এ ধরনের কার্যক্রম চালাতে না পারেন, সেটি তিনি প্রত্যাশা করেছিলেন এবং এখনও করেন।
তার মতে, ভারতের দিক থেকেও বিষয়টি ঠিক হচ্ছে না। শেখ হাসিনাকে ফেরত পাওয়ার দাবিকে তিনি ‘স্ট্রং’ বা জোরালো দাবি হিসেবে উল্লেখ করেন।
জাহেদ উর রহমান বলেন, শেখ হাসিনা নিজে দেশে আসুন বা সরকার তাকে ফিরিয়ে আনুক, এ নিয়ে কোনো কৌশল নেই। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক যে পর্যায়ে গিয়েছিল, সেটির উন্নতির জন্য অন্তত তাৎক্ষণিকভাবে শেখ হাসিনার গণমাধ্যমে কথা বলার বিষয়টি বন্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া যেত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনারকে বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করার কথাও বলেন তথ্য উপদেষ্টা। তার ভাষ্য, বাংলাদেশের শেখ হাসিনাকে ঘিরে সংবেদনশীলতা রয়েছে। বিশেষ করে আজমেরী হক বাঁধনসহ অন্যরা যখন হামলার শিকার হচ্ছেন, তখন শেখ হাসিনার গণমাধ্যমে কথা বলা মানুষের মধ্যে বিরক্তি ও ক্ষোভ তৈরি করছে। বিষয়টি ভারতের বোঝা উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ঢাকায় কিছুটা লোডশেডিং মেনে নেওয়ার আহ্বান
এদিকে রাজধানীতে বিদ্যুতের কিছুটা লোডশেডিং মেনে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তথ্য উপদেষ্টা। তবে ঢাকা দেশের সবচেয়ে বড় শহর এবং এখানে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বেশি হওয়ায় বিদ্যুতের ক্ষেত্রে রাজধানী কিছুটা অগ্রাধিকার পেতে পারে বলেও জানান তিনি।
জাহেদ উর রহমান বলেন, “ঢাকাকে একেবারে লোডশেডিংমুক্ত রাখব”, এমন ধারণা থেকে সরকার সরে আসছে। এ কারণেই ঢাকায় কিছুটা লোডশেডিং হচ্ছে।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ও দেশে লোডশেডিং ছিল। তবে ঢাকায় তা প্রায় দেওয়া হতো না। তার ব্যাখ্যায়, ঢাকার মানুষের ‘ভয়েস’ বেশি এবং সামাজিক পুঁজি বেশি থাকায় রাজধানীর বাসিন্দারা অতীতে লোডশেডিং খুব একটা দেখেননি। এর ফলে তাদের মধ্যে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে একটি বিশেষ ধরনের ধারণা তৈরি হয়েছে।
লোডশেডিংয়ের তুলনা তুলে ধরে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, শেখ হাসিনা সরকারের শেষ পূর্ণ বছর ছিল ২০২৩। ওই বছরের জুন, জুলাই ও আগস্টের সঙ্গে ২০২৬ সালের একই তিন মাসের গড় লোডশেডিংয়ের তুলনা করলে জুন ও জুলাইয়ে ২০২৬ সালে পরিস্থিতি আগের তুলনায় ভালো ছিল।
তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের জুনে দেশে প্রতিদিন গড়ে লোডশেডিং ছিল ৯৬৯ মেগাওয়াট। ২০২৬ সালের জুনে তা কমে ৭৪১ মেগাওয়াটে দাঁড়ায়। ২০২৩ সালের জুলাইয়ে গড় লোডশেডিং ছিল ৬১৩ মেগাওয়াট, যা ২০২৬ সালের জুলাইয়ে ছিল ৪৬০ মেগাওয়াট।
তবে আগস্টে চিত্র ছিল ভিন্ন। ২০২৩ সালের আগস্টে গড় লোডশেডিং ছিল ৩৬০ মেগাওয়াট। ২০২৬ সালের আগস্টে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৫৬৫ মেগাওয়াটে।
আগস্টে কেন বিদ্যুৎ সংকট বেড়েছিল, তা সবাই জানেন বলে মন্তব্য করেন জাহেদ উর রহমান। তবে জুন ও জুলাইয়ে ২০২৬ সালের গড় লোডশেডিং ২০২৩ সালের তুলনায় কম ছিল বলেও তিনি আবার উল্লেখ করেন।
বর্তমান বিদ্যুৎ সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে গ্যাস সংকটকে চিহ্নিত করেন তথ্য উপদেষ্টা। তার আশা, গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হলে বর্তমানে যে লোডশেডিং হচ্ছে, তা আর থাকবে না।











