আকাশপথের যাত্রীদের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে দেশে অবৈধ জিএসএ’র কার্যক্রম

নিজস্ব প্রতিবেদক:

আকাশপথের যাত্রীদের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে দেশে অবৈধ আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্সের স্থানীয় জেনারেল সেলস এজেন্টের (জিএসএ) কার্যক্রম। বর্তমানে দেশে ডজনের বেশি জিএসএ বৈধ লাইসেন্স ছাড়াই চালিয়ে যাচ্ছে টিকিট বিক্রি ও কার্গো কার্যক্রম চালাচ্ছে। তাতে একদিকে যেমন বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার, অন্যদিকে অবৈধ বা মেয়াদোত্তীর্ণ জিএসএ-এর মাধ্যমে টিকিট কেনা কিংবা কার্গো বুকিং করা যাত্রী ও ব্যবসায়ীদের জন্য ভয়াবহ ঝুঁকি তৈরি করছে। অবৈধ জিএসএ কার্যক্রমে কোনো ফ্লাইট বাতিল, অর্থ আত্মসাৎ, কার্গো জটিলতা বা প্রতারণার ঘটনা ঘটলে ভুক্তভোগীদের আইনি প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ নেই। এভিয়েশন খাত সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

 

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বর্তমানে দেশে বেবিচকের নির্দেশনা উপেক্ষা করে ১৬টি আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্সের জেনারেল সেলস এজেন্ট (জিএসএ) প্রতিষ্ঠান লাইসেন্সবিহীন অবস্থাতেই পরিচালনা করছে ব্যবসা। ওসব প্রতিষ্ঠানের সাময়িক অনুমতিপত্রের মেয়াদ গত ৩১ মার্চ শেষ হয়ে যায়। কিন্তু তাদের সঙ্গে নতুন করে কোনো চুক্তি হয়নি। ফলে কোনো বৈধ অনুমোদন ছাড়াই ওসব প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

 

সূত্র জানায়, দেশের বিমান পরিবহণ খাতে লাইসেন্স ছাড়া কার্যক্রম পরিচালনা শুধু বেআইনিই নয়, তা জাতীয় নিরাপত্তা, আর্থিক স্বচ্ছতা ও যাত্রীর জন্যও উদ্বেগজনক। কারণ লাইসেন্সবিহীন জিএসএ-এর মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকি ছাড়াও আর্থিক লেনদেনের নামে অর্থ পাচার ও অবৈধ ডলার লেনদেনের শঙ্কা থাকে। তাছাড়া তাতে প্রকাশ্যে আইন লঙ্ঘিত হওয়ার পাশাপাশি সরকার হারাচ্ছে রাজস্ব। অভিযোগ রয়েছে, নিয়ন্ত্রক সংস্থার দুর্বল নজরদারি ও প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় ওসব প্রতিষ্ঠান লাইসেন্স ছাড়া ব্যবসা করার সুযোগ পাচ্ছে। আন্তর্জাতিক জিএসএ লাইসেন্স যাত্রী সুরক্ষা, আর্থিক জবাবদিহি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক কমপ্লায়েন্সের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। এ পরিস্থিতিতে যাত্রীরা প্রতারণা বা সেবা জটিলতায় পড়লে আইনি সুরক্ষা দুর্বল হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক টিকিটিংয়ের মাধ্যমে প্রতিদিন লেনদেন হয় বড় অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা। কিন্তু লাইসেন্সবিহীন কার্যক্রম অর্থ পাচার প্রতিরোধ ও আর্থিক নজরদারির ক্ষেত্রে ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

 

সূত্র আরো জানায়, বিগত ১৭ ফেব্রুয়ারি বেবিচক এক আদেশে দেশের ১৬টি প্রভাবশালী জিএসএ প্রতিষ্ঠানের অনুমতির মেয়াদ বাড়িয়েছিল। ওই আদেশে স্পষ্টভাবে নিয়মিত নবায়ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত তা কেবল একটি অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থার কথা উল্লেখ। সর্বোচ্চ ৩১ মার্চ পর্যন্ত ওই আদেশ কার্যকারিতা বলবৎ থাকার কথা। আর আদেশের শর্ত অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় নথিপত্র জমা দিয়ে নিয়মিত লাইসেন্স নবায়ন সম্পন্ন করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো তা অনুসরণ করেনি। বরং মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও ওসব প্রতিষ্ঠান বৈধ লাইসেন্স না নিয়েই পরিচালনা করে যাচ্ছে কোটি কোটি টাকার টিকিট ও কার্গো বাণিজ্য। ওই তালিকায় রয়েছে সৌদি এরাবিয়ান এয়ারলাইন্সের জিএসএ ইউনাইটেড লিংক লিমিটেড, কাতার এয়ারওয়েজের জিএসএ ওরিক্স এভিয়েশন লিমিটেড এবং ইতিহাদ এয়ারওয়েজের এজেন্ট উইং এভিয়েশন লিমিটেড। তাছাড়া ইন্ডিগো ও এয়ার এরাবিয়ার এজেন্ট হিসাবে কাজ করছে আরএএস হলিডেজ ও ওয়ান ওয়ার্ল্ড এভিয়েশন। ক্যাথে প্যাসিফিক এয়ারওয়েজের এজেন্ট হিসাবে গ্লোবাল এভিয়েশন লিমিটেড এবং মালিন্দো (বাটিক এয়ার) এয়ারলাইন্সের এজেন্ট হিসাবে রয়েছে প্রাইম এভিয়েশন লিমিটেড। এ তালিকায় আরও রয়েছে জাজিরা এয়ারওয়েজ, স্পাইসজেট, ইথিওপিয়ান এয়ারলাইন্স এবং ভিয়েতনাম এয়ারলাইন্সের স্থানীয় প্রতিনিধি।

 

এদিকে এভিয়েশন বিশেষজ্ঞদের মতে, বেবিচকের আদেশের ২(ঘ) ধারা অনুযায়ী যে কোনো সময় কোনো কারণ না দেখিয়েই জিএসএ-এর বর্ধিত মেয়াদ বাতিল বা সংশোধন করার ক্ষমতা রাখে বেবিচক। কিন্তু মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও কার্যক্রম চলানো ওসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অদৃশ্য কারণে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। আর ২(খ) শর্তানুযায়ী মূল অনুমোদনের সব শর্তাবলি কঠোরভাবে মেনে চলার কথা থাকলেও মেয়াদহীন অবস্থায় ব্যবসা করা লাইসেন্সিং বিধিমালার সরাসরি লঙ্ঘন।

 

অন্যদিকে এ বিষয়ে বেবিচকের সদস্য (ফ্লাইট সেফটি অ্যান্ড রেগুলেশন) এয়ার কমোডর মুকিত উল আলম মিয়া জানান, কিছু প্রশাসনিক জটিলতার কারণে বেবিচকের পক্ষ থেকেই লাইসেন্স নবায়ন প্রক্রিয়ায় বিলম্ব হচ্ছে। তবে বিষয়টি দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আশা করা যায় শিগ্গিরই এ জটিলতা কেটে যাবে। আর লাইসেন্স ছাড়া অবৈধভাবে ব্যবসা পরিচালনার কোনো সুযোগ নেই।