নিজস্ব প্রতিবেদক:
উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে পোস্টার, মিছিল ও শোডাউন নিষিদ্ধ করে নতুন আচরণবিধি জারি করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। একই সঙ্গে প্রচারে বিলবোর্ড ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা করা গেলেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে ভুয়া, মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর, বিদ্বেষপূর্ণ ও ব্যক্তিগত আক্রমণাত্মক কনটেন্ট ছড়ানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) উপজেলা পরিষদ নির্বাচন আচরণ বিধিমালা-২০২৬ ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদের স্বাক্ষরে গেজেট আকারে জারি করা হয়।
নতুন বিধিমালায় নির্বাচনী প্রচারে পোস্টার ব্যবহার পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। প্রচারের জন্য ব্যানার, লিফলেট, হ্যান্ডবিল, ফেস্টুন ও বিলবোর্ড ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে। ইউনিয়নপ্রতি একটি, পৌরসভার প্রতি ওয়ার্ডে একটি এবং পুরো উপজেলায় সর্বোচ্চ ২০টি বিলবোর্ড ব্যবহার করা যাবে।
প্রচারসামগ্রীর আকারও নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। ব্যানার সর্বোচ্চ ১০ ফুট × ৪ ফুট, লিফলেট বা হ্যান্ডবিল এ৪ আকারের এবং ফেস্টুন সর্বোচ্চ ১৮ × ২৪ ইঞ্চি হতে পারবে। বিলবোর্ডের সর্বোচ্চ আকার ১৬ × ৯ ফুট। প্রচারসামগ্রীতে প্রার্থীর নিজের ছবি ও নির্বাচনী প্রতীক ব্যবহারের বিধান রাখা হয়েছে।
তফসিল ঘোষণার পর থেকে নির্বাচনের ফলাফল গেজেটে প্রকাশ হওয়া পর্যন্ত কোনো ধরনের মিছিল, শোভাযাত্রা বা শোডাউন করা যাবে না। এ ধরনের কর্মসূচিতে ট্রাক, বাস, মোটরসাইকেল, নৌযান, ট্রেনসহ কোনো যানবাহন ব্যবহার করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। প্রচারে হেলিকপ্টার বা অন্য কোনো উড়োজাহাজ ব্যবহারের ওপরও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
নির্বাচনী প্রচারে সরকারি যানবাহন, সরকারি সরঞ্জাম বা সরকারি সম্পদ ব্যবহার করা যাবে না। সরকারি কর্মকর্তা ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের প্রার্থীর পক্ষে প্রচারে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ রাখা হয়েছে।
ভোটারদের প্রভাবিত করতে টাকা, খাবার, পানীয় বা উপহার দেওয়াও নিষিদ্ধ। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি কার্যালয়ে প্রচারণা চালানো যাবে না। ধর্মের অপব্যবহার, পেশিশক্তির প্রদর্শন, মানহানিকর বক্তব্য ও চরিত্রহননের মতো কর্মকাণ্ডও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
ভোটের দিন ভোটার পরিবহনের জন্য কোনো যানবাহন ভাড়া বা ব্যবহারের সুযোগও থাকবে না।
নতুন বিধিমালায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল মাধ্যমে প্রচারণার সুযোগ রাখা হয়েছে। তবে প্রচার শুরুর আগে প্রার্থীকে কোন কোন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করা হবে, তা সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তাকে জানাতে হবে। এসব মাধ্যমে প্রচারে যে অর্থ ব্যয় হবে, তা প্রার্থীর নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাবের মধ্যেও অন্তর্ভুক্ত হবে।
এআই ব্যবহার করে নির্বাচনী পরিবেশ নষ্ট করতে পারে এমন কোনো কনটেন্ট তৈরি বা প্রচার করা যাবে না। বিশেষ করে ভুয়া, মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর, বিদ্বেষপূর্ণ কিংবা ব্যক্তিগত আক্রমণাত্মক কনটেন্ট প্রচার নিষিদ্ধ। এআই দিয়ে তৈরি করে এমন কোনো নকল বা বিভ্রান্তিকর তথ্যও ছড়ানো যাবে না, যা ভোটারদের বিভ্রান্ত করতে বা নির্বাচনী পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
প্রার্থীর পক্ষ থেকে ভোটার বা তাদের পরিবারের সদস্যদের ব্যক্তিগত জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) নম্বর সংগ্রহ করে ভোটে প্রভাব বিস্তার করা যাবে না। মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে লেনদেনের উদ্দেশ্যেও ভোটারদের মোবাইল নম্বর সংগ্রহে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
নির্বাচনী প্রচারে মাইক ব্যবহারের সময়ও নির্ধারণ করা হয়েছে। বেলা ১২টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মাইকে প্রচার চালানো যাবে এবং মোট ছয় ঘণ্টা মাইক ব্যবহার করা যাবে। একসঙ্গে একটির বেশি মাইক্রোফোন ব্যবহার করা যাবে না।
প্রচারণার জন্য নির্বাচনী ক্যাম্প স্থাপনের ক্ষেত্রেও সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। পুরো উপজেলার জন্য একটি কেন্দ্রীয় ক্যাম্প, প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে এবং পৌর এলাকায় প্রতি তিনটি ওয়ার্ডে সর্বোচ্চ একটি ক্যাম্প রাখা যাবে।
নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন করলে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড, ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড হতে পারে। গুরুতর লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে প্রার্থিতা বাতিলের ক্ষমতাও নির্বাচন কমিশনের হাতে রাখা হয়েছে।
নির্বাচনী ব্যয়সীমা অতিক্রম করা, টাকা বা পেশিশক্তি ব্যবহার করে ভোটারদের প্রভাবিত করা কিংবা সরকারি সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার করাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হবে। আচরণবিধি লঙ্ঘন বা লঙ্ঘনের চেষ্টার অভিযোগ তদন্ত করার ক্ষমতাও কমিশনের রয়েছে।
ইসি জানিয়েছে, অবাধ, সুষ্ঠু ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রার্থীদের জন্য সমান সুযোগ তৈরিই নতুন আচরণবিধির অন্যতম লক্ষ্য।
এদিকে বছর শেষে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন দিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হবে। নতুন আচরণবিধিতে পোস্টার ও মিছিলের ওপর নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি ডিজিটাল প্রচারে এআই-নির্ভর অপপ্রচার ঠেকাতে বিধিনিষেধ যুক্ত হওয়ায় আসন্ন স্থানীয় নির্বাচনে প্রচারের ধরনেও পরিবর্তন আসতে পারে।











