অনলাইন ডেস্ক:
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় ধরনের জয়ের মাধ্যমে কংগ্রেসের উভয় কক্ষ—প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—এখন ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে। এই ফলাফলের মধ্য দিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের গত দুই বছরের ক্ষমতার ভারসাম্য পুরোপুরি বদলে যেতে চলেছে। মঙ্গলবার রাতে নির্বাচনের ফলাফল নিশ্চিত হওয়ার পর ডেমোক্র্যাটদের প্রতিনিধি পরিষদের দলীয় নেতা হাকিম জেফ্রিস উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে একে আমেরিকার জন্য এক ‘ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তন’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
নির্বাচনী প্রচারণার সময় ডেমোক্র্যাটরা সরকারের দুর্নীতি তদন্ত, চিকিৎসা ব্যয় কমানো, মুদিপণ্য ও পেট্রোলের দাম নিয়ন্ত্রণ এবং মধ্যপ্রাচ্যে ইরান যুদ্ধ সংকুচিত করার মতো বড় বড় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তবে ওয়াশিংটনের আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ার জটিল সমীকরণ বলছে, আইনসভার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ পেলেও এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা তাদের জন্য সহজ হবে না। কারণ প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাতে রয়েছে যেকোনো আইন বাতিলের শক্তিশালী ‘ভেটো’ ক্ষমতা।
এই জয়কে একক কোনো ‘ম্যান্ডেট’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে সতর্ক করেছেন ডেমোক্র্যাটিক সেনেটর ক্রিস কুনস। তিনি বলেন, ‘আমাদের এখন প্রমাণ করতে হবে যে আমরা কাজ করতে পারি। বিশেষ করে নিম্ন মজুরি ও জীবনযাত্রার ঊর্ধ্বমুখী ব্যয় নিয়ে জনগণের যে দুশ্চিন্তা ও প্রশ্ন রয়েছে, তার বাস্তব সমাধান দিতে হবে।’
ক্যালেনিফোর্নিয়া থেকে নির্বাচিত প্রতিনিধি পরিষদ সদস্য রবার্ট গার্সিয়া খুব শিগগিরই প্রতিনিধি পরিষদের শক্তিশালী তদারকি কমিটির নেতৃত্বে আসছেন। বিজয়ের পর ট্রাম্প শিবিরকে ইঙ্গিত করে তিনি সরাসরি বলেছেন, ‘আইনজীবী প্রস্তুত রাখুন।’
মার্কিন সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদ উভয় কক্ষেরই যেকোনো বিষয়ে শক্তিশালী তদন্ত চালানোর আইনি ক্ষমতা রয়েছে। ডেমোক্র্যাটরা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং তার ঘনিষ্ঠদের নানা পদক্ষেপ ও স্বার্থসংঘাত নিয়ে তদন্ত শুরু করার পরিকল্পনা করছেন। গার্সিয়া ইতোমধ্যে ট্রাম্পের পরিবার, কর্পোরেট দুর্নীতি, ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি এবং আইসিই-এর অভ্যন্তরীণ অনিয়ম ও নথিপত্র (অ্যাপস্টিন ফাইল) নিয়ে তদন্তের প্রাথমিক তালিকার ইঙ্গিত দিয়েছেন।
সিনেটের ওপর অর্পিত ক্ষমতার বলে ডেমোক্র্যাটরা প্রেসিডেন্টের ক্যাবিনেট সদস্য এবং বিচারিক পদে নিয়োগ বা বিচারক বাছাইয়ের প্রস্তাব আটকে দিতে বা প্রভাবিত করতে পারবেন। ট্রাম্পের বাকি মেয়াদে সুপ্রিম কোর্টের কোনো আসন শূন্য হলে, সিনেট ডেমোক্র্যাটরা তাদের নতুন ক্ষমতার জোরে ট্রাম্পের পছন্দের উগ্র প্রার্থী আটকে দিয়ে মধ্যপন্থি প্রার্থী নির্বাচনে বাধ্য করতে পারেন।
প্রতিনিধি পরিষদের মাধ্যমে প্রেসিডেন্টকে অভিশংসন করার ক্ষমতাও এখন ডেমোক্র্যাটদের হাতে। এর আগে প্রথম মেয়াদে ট্রাম্পকে দুবার অভিশংসিত করেছিল প্রতিনিধি পরিষদ, যদিও সিনেটের বিচারে প্রতিবারই তিনি খালাস পেয়েছিলেন। কোনো প্রেসিডেন্টকে পদচ্যুত করতে সিনেটের দুই-তৃতীয়াংশ বা ৬৭টি ভোটের প্রয়োজন হয়, যা এককভাবে ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে জোগাড় করা প্রায় অসম্ভব।
অভিশংসন ইস্যুতে খোদ ডেমোক্র্যাটদের ভেতরেই বিতর্ক রয়েছে। ২০১৯ সালের প্রথম অভিশংসন রাজনৈতিক কাদা ছোড়াছুড়ির জন্ম দিয়েছিল, যা পরবর্তীতে ট্রাম্পকে রাজনৈতিক ভুক্তভোগী হিসেবে তুলে ধরে দ্বিতীয়বার হোয়াইট হাউসে ফেরার পথ সুগম করতে সাহায্য করেছিল। তাই হাকিম জেফ্রিস এ নিয়ে ভেবেচিন্তে এগোচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের কৌশল স্পষ্ট রেখেছি: কোনো কিছু আমরা এখনই চূড়ান্ত করে ফেলছি না, আবার কোনো সম্ভাবনা খারিজও করছি না।’
নির্বাচনের আগেই মার্কিন আইনসভার ওপর সাধারণ মানুষের হতাশা ছিল স্পষ্ট। গত অক্টোবরের এক গ্যালাপ জরিপ অনুযায়ী মাত্র ১৪ শতাংশ নিবন্ধিত ভোটার আইনপ্রণেতাদের পারফরম্যান্সে সন্তুষ্ট ছিলেন। এখন রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট এবং ডেমোক্র্যাট নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেসের মুখোমুখি অবস্থানের কারণে প্রশাসনিক এই জটিলতা ও অচলাবস্থা আরও বাড়তে পারে।
জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির লেজিসলেটিভ অ্যাফেয়ার্স বিভাগের অধ্যাপক কেসি বারগাট বলেন, আগের কংগ্রেসে যেখানে রিপাবলিকানদের একক নিয়ন্ত্রণ ছিল, সেখানেই আইন পাস করা কঠিন ছিল। এবার সমীকরণ আরও অনেক বেশি জটিল হতে যাচ্ছে।
দুই কক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে ডেমোক্র্যাটরা সহজে বিল পাস করলেও তা আইনে পরিণত করাটা হবে চরম চ্যালেঞ্জের। মার্কিন শাসনব্যবস্থায় যেকোনো বিল চূড়ান্ত আইনে পরিণত হতে প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষর লাগে। রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যেকোনো ডেমোক্র্যাট বিলে ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন। আর সেই ভেটো বাতিল করতে কংগ্রেসের দুই কক্ষেই দুই-তৃতীয়াংশ বা সুপার মেজরিটি ভোটের প্রয়োজন, যা ডেমোক্র্যাটদের একার শক্তিতে সম্ভব নয়।
নির্বাচনের রাতে একের পর এক সিনেট আসন হারানোর পর ট্রাম্প অবশ্য সমঝোতার সুরে বলেন, ‘আমরা ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে কাজ করব এবং তাদের সঙ্গে কাজ করার জন্য মুখিয়ে আছি। আমরা হয়তো একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে পারব।’
কিন্তু এর কয়েক মিনিট পরেই ট্রাম্প তার ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে নিজের লাল রঙের প্রচার ক্যাপের একটি ছবি পোস্ট করেন, যার সামনে স্পষ্ট অক্ষরে লেখা ছিল, ‘ভিইটিও’ (ভেটো)। অর্থাৎ, ডেমোক্র্যাটদের বিলে ট্রাম্পের বাধা দেওয়া বা ভেটো প্রয়োগের এই দ্বিমুখী মনোভাবই হতে যাচ্ছে আগামী দুই বছরের মূল প্রেক্ষাপট।
ট্রাম্পের ভেটো হুমকির মুখেও ডেমোক্র্যাট নেতা জেফ্রিস জানিয়েছেন, রিপাবলিকানদের দেওয়া কম আয়ের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচি ‘মেডিকেড’ এবং ‘অ্যাফোর্ডেবল কেয়ার অ্যাক্ট’ বা ওবামাকেয়ারের কর ছাড় পুনর্বহাল করাই হবে তাদের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার।
তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ন্ত্রণ, ইসরায়েলে সামরিক অর্থায়ন এবং ইরান যুদ্ধ সীমিত করার মতো সর্বদলীয় ইস্যুগুলোতে মধ্যস্থতার আলোচনার সময় বড় ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হতে পারে। ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে রিপাবলিকানরা কোনোভাবেই ডেমোক্র্যাটদের বড় কোনো রাজনৈতিক সাফল্য সহজেই অর্জিত হতে দেবে না।
এমনকি খোদ ডেমোক্র্যাটদের নিজেদের ভেতরেও ইসরায়েল ইস্যুতে ফাটল দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রচারাভিযানে ইসরায়েলে মার্কিন সামরিক সাহায্য নিয়ে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ভেতরে তীব্র মতবিরোধ সামনে এসেছে। মিশিগান থেকে বিজয়ী সিনেটর আবদুল এল-সাইয়েদের মতো নবনির্বাচিত বেশ কিছু প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য ইসরায়েলে সামরিক সহায়তা কমানোর বিলে ভোট দেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন, যা দলের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গেই তাদের মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড় করাতে পারে।
অন্যদিকে ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি ও বিশেষ করে ইরান যুদ্ধ সীমিত করার ক্ষেত্রে ডেমোক্র্যাট সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও তা থামানো কঠিন হতে পারে। নির্বাচনের আগেই ইরান সংঘাত বন্ধে কংগ্রেসে উভয় দলের যৌথ উদ্যোগে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। গত জুনে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট উভয় কক্ষেই ইরান সংঘাত থামানোর জন্য একটি প্রস্তাব পাস হলেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তা কার্যত উপেক্ষা করে চলেছেন।
হোয়াইট হাউসের দাবি, সংঘাত চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টের ব্যাপক সাংবিধানিক ক্ষমতা রয়েছে। ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের গভর্ন্যান্স স্টাডিজের সিনিয়র ফেলো স্কট অ্যান্ডারসন বলেন, প্রেসিডেন্টকে বাধ্য করার বিষয়ে কংগ্রেসের আইনগত কর্তৃত্ব একটি বড় প্রশ্ন। কংগ্রেস বিষয়টি আদালতের ওপর ছেড়ে দিয়ে আইনি লড়াই চালিয়ে যেতে পারে।











