কনডেনসেট স্বল্পতায় কমে যাচ্ছে দেশীয়ভাবে জ্বালানির উৎপাদন

নিজস্ব প্রতিবেদক:

কনডেনসেট স্বল্পতায় কমে যাচ্ছে দেশীয় জ্বালানির উৎপাদন। মূলত দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের উৎপাদন কমে যাওয়ার কারণেই দেখা দিয়েছে কনডেনসেটের স্বল্পতা। বিগত এক যুগের বেশি সময়ে কনডেনসেট উৎপাদন অর্ধেকে নেমে গেছে। কিন্তু ওই সময়ে ৩ গুণেরও বেশি জ্বালানির চাহিদা বেড়েছে। বর্তমানে জ্বালানি সংকটে বাংলাদেশকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। কারণ দেশের জ্বালানির উল্লেখযোগ্য অংশই আমদানি করতে হয়। দেশীয়ভাবে মোট জ্বালানির একটি অংশের চাহিদা হবিগঞ্জের রশিদপুর কনডেনসেট ফ্র্যাকশনেশন প্ল্যান্ট (আরসিএফপি) মেটাচ্ছে। কিন্তু প্রাকৃতিক গ্যাসের উৎপাদন কমে যাওয়ায় এখন কমে গেছে ওই প্রতিষ্ঠানটির জ্বালানির জোগানও। সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেড (এসজিএফএল) সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

 

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, আরসিএফপিতে আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে অকটেন, পেট্রোল, এলপিজি, মোটর স্পিরিট, কেরোসিন এবং ডিজেল উৎপাদন করা হয়। এটি সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেড (এসজিএফএল)-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এবং তা দেশের জ্বালানি সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ওই প্ল্যান্টে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা হয় এসজিএফএল এবং শেভরন বাংলাদেশ লিমিটেডের বিভিন্ন গ্যাসক্ষেত্র থেকে প্রাপ্ত হেভি কনডেনসেট। আর উৎপাদিত পণ্যসমূহ বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) অধীন পদ্মা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড, মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেড এবং যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের বিভিন্ন ডিপোতে সরবরাহ করা হয়।

 

সূত্র জানায়, আরসিএফপিতে বর্তমানে বরাদ্দ দেয়া হয় ৪ হাজার ৩৫০ ব্যারেল কনডেনসেট। তা থেকে ৮৫০ ব্যারেল অকটেন এবং ৩ হাজার ১০০ ব্যারেল পেট্রোল, ৩০০ ব্যারেল কেরোসিন ও ডিজেল এবং ১৫ থেকে ২০ ব্যারেল এলপিজি উৎপাদিত হয়। চলতি অর্থবছরে ওই প্ল্যান্ট থেকে সারা দেশে মোট চাহিদার ৮ থেকে ৯ শতাংশ অকটেন সরবরাহ করা হয়েছে। আর পেট্রোলের চাহিদা পূরণ করা হচ্ছে ৩২ থেকে ৩৫ শতাংশ। গত অর্থবছরে পেট্রোলের ২৫ থেকে ২৬ শতাংশ আর অকটেনের ৩০ শতাংশ চাহিদা পূরণ করা হয়। আরসিএফপির কনডেনসেট ফ্র্যাকশনেশন সক্ষমতা ৭ হাজার ৭৫০ ব্যারেল। তবে কনডেনসেট রিটার্ন ইউনিটের (সিআরইউ)-এর সক্ষমতা ৩ হাজার ব্যারেল। সেখানে সাড়ে ৪ থেকে ৫ হাজার ব্যারেল পর্যন্ত কনডেনসেট ফ্র্যাকশনেশন করা যাবে। মূলত প্ল্যান্টটির সিআরইউর সক্ষমতা কম হওয়ায় ৫ হাজার ব্যারেলের বেশি কনডেনসেট ফ্র্যাকশনেট করা যায় না। তবে সরকারি ওই প্ল্যান্টের বাইরে বেসরকারিভাবে আরো চারটি প্ল্যান্ট আমদানীকৃত কনডেনসেট দিয়ে দেশে জ্বালানি উৎপাদন করছে।

 

সূত্র আরো জানায়, দেশে পাঁচ থেকে ছয় বছর আগেও দৈনিক সাড়ে ১০ হাজার ব্যারেল কনডেনসেট উৎপাদিত হতো। এখন দেশে দৈনিক উৎপাদন হচ্ছে ৬ হাজার ২০০ ব্যারেল কনডেনসেট। আগে বিবিয়ানায় শেভরন গ্যাসক্ষেত্রে ১ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন হতো, এখন তা ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুটের নিচে নেমে এসেছে। ওই গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদিত গ্যাসই ছিল ওই প্ল্যান্টের কনডেনসেটের মূল উৎস। আগে গ্যাসক্ষেত্রটি সাড়ে ৭ হাজার ব্যারেল কনডেনসেট উৎপাদন করতো। এখন তা কমে ৪ হাজার ৩০০ ব্যারেলে নেমেছে। মূলত গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ায় এখন সামগ্রিকভাবে দেশে কনডেনসেটের উৎপাদনও কমে গেছে।

 

এদিকে বিগত ২০০৮-০৯ অর্থবছরে দেশে ৭০ থেকে ৮০ হাজার মেট্রিন টন অকটেনের চাহিদা ছিল। পেট্রোলের চাহিদা ছিল ১ লাখ ২০ হাজার থেকে ১ লাখ ৩০ হাজার মেট্রিক টন। কিন্তু গত অর্থবছরে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) জ্বালানি বিক্রির তথ্যানুযায়ী ৪ লাখ ১৫ হাজার মেট্রিক টন অকটেন বিক্রি হয়েছে। আর পেট্রোল বিক্রি করেছে ৪ লাখ ৬২ হাজার মেট্রিক টন। অর্থাৎ ওই সময়ে অকটেন-পেট্রোলের বিক্রি ৩ গুণের বেশি বেড়েছে। কিন্তু কনডেনসেটের উৎপাদন অর্ধেকে নেমেছে।

 

অন্যদিকে এ প্রসঙ্গে সিলেট গ্যাস ফিল্ডের মহাব্যবস্থাপক (এলপিএম) প্রকৌশলী জীবন শান্তি সরকার জানান, আরসিএফপিতে ৪ হাজার ৩০০ ব্যারেল কনডেনসেট থেকে প্রাপ্ত জ্বালানির প্রতি ব্যারেল ১২০ ডলার হিসেবে ধরা হয়। তাহলে দিনে ৫ লাখ ২২ হাজার ডলার বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হচ্ছে। আর বছরে ২ হাজার ৩৪৩ কোটি টাকা সাশ্রয় করছে। সিলেট গ্যাস ফিল্ড কর্তৃপক্ষ নতুন প্রকল্প হাতে নিয়ে নতুন গ্যাসকূপ খনন করে গ্যাস উৎপাদনের চেষ্টা করছে। আর গ্যাস উৎপাদনের সঙ্গে কনডেনসেটও আসবে। গ্যাস উৎপাদন কমে গেলে বিদেশ থেকে কনডেনসেট এনে জ্বালানি উৎপাদন করতে গেলে অনেক সমস্যায় পড়তে হবে। সেজন্যই সিলেট অঞ্চলে গ্যাস উৎপাদনের মাধ্যমে কনডেনসেটের উৎপাদন বৃদ্ধির চেষ্টা করা হচ্ছে। ওই লক্ষ্যে ছাতক গ্যাসক্ষেত্র বাপেক্সের মাধ্যমে উন্নয়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আর তার একটি অংশ সিলেট গ্যাস ফিল্ড লিমিটেডকে দেয়ার কথা রয়েছে। সেক্ষেত্রে রশিদপুর প্ল্যান্টটি পরিচালনার জন্য যে কনডেনসেট দরকার হবে, তা ছাতক গ্যাসক্ষেত্র থেকেই পাওয়া যাবে।