কারাগারে বাড়ছে বন্দিমৃত্যুর সংখ্যা

নিজস্ব প্রতিবেদক:

অতিরিক্ত বন্দির চাপ এবং সমন্বিত চিকিৎসা সক্ষমতার অভাবে দেশের কারাগারগুলোতে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে বন্দিমৃত্যু। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর তথ্যমতে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত দেশের কারাগারগুলোতে মৃত্যু হয়েছে ৯৭ জন বন্দির। অথচ গত বছরের একই সময়ে ওই মৃত্যুর সংখ্যা ৬১ জন ছিলো। আর কারা অধিদফতরের হিসাবে, গত বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন কারাগারে ৩৯০ জন বন্দি মারা যায়। আর চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ৩০০ জন। বর্তমানে দেশের ৬৮টি কারাগারে মোট ৪৫ হাজার বন্দির ধারণ ক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে প্রায় লাখখানেক বন্দি রয়েছে। আর অতিরিক্ত বন্দির কারণে কারাগারে তৈরি হচ্ছে আবাসন, খাবার, স্যানিটেশন, চিকিৎসা ও নিরাপত্তাসহ প্রতিটি ব্যবস্থার ওপর চাপ। আর একই জায়গায় ধারণ ক্ষমতার তুলনায় অতিরিক্ত মানুষ থাকলে সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বাড়ে। পাশাপাশি কঠিন হয়ে পড়ে হৃদরোগ, কিডনি রোগ, ডায়াবেটিস কিংবা উচ্চ রক্তচাপের মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত বন্দিদের নিয়মিত পর্যবেক্ষণও। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এবং কারা অধিদপ্তর সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

 

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, দেশের কারাগারগুলোতে চিকিৎসা ব্যবস্থা অত্যন্ত নাজুক। সবগুলো কারাগারে বন্দিদের জন্য মাত্র ২৩টি অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে। আর চিকিৎসক ও নার্সেরও তীব্র সঙ্কট। কারাগারের ভেতরে হঠাৎ বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট কিংবা স্ট্রোকের উপসর্গ দেখা দিলে একজন বন্দির পক্ষে নিজে থেকে উন্নত চিকিৎসা বেছে নেয়ার সুযোগ থাকে না। কারণ চিকিৎসক পাওয়া, কারা হাসপাতাল থেকে রেফার করা, নিরাপত্তা ব্যবস্থাসহ অ্যাম্বুলেন্স জোগাড় এবং বাইরের হাসপাতালে পৌঁছানো পর্যন্ত পুরো ব্যবস্থার ওপরই রোগীকে নির্ভর করতে হয়। কিন্তু চিকিৎস ও নার্স সঙ্কট এবং অ্যাম্বুলেন্সের অপ্রতুলতা বন্দির জরুরি চিকিৎসার পথকে কঠিন করে তুলছে। যে কারণে দেশের কারাগারগুলোতে বেড়েই চলেছে বন্দিমৃত্যুর ঘটনা।

 

সূত্র জানায়, গুরুতর অসুস্থ বন্দিকে কারাগারের বাইরে বিশেষায়িত হাসপাতালে পাঠাতে নানা সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। বর্তমানে দেশে ৬৮টি কারাগারের জন্য মাত্র ২৩টি অ্যাম্বুলেন্স থাকায় অনেক কারাগারেই তা নেই। ফলে অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে সমস্যায় পড়তে হয়। তাছাড়া বন্দির নিরাপত্তা প্রস্তুতি এবং রোগী স্থানান্তরে পুরো প্রক্রিয়ায় লেগে যায় বাড়তি সময়। ফলে হাসপাতালে পৌঁছাতে দেরি হওয়ার পাশাপাশি পথে রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তবে পরিস্থিতি উত্তরণে ৪৪টি নতুন অ্যাম্বুলেন্স সংগ্রহের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তাছাড়া কারাগারগগুলোর জন্য ১৫১টি চিকিৎসকের অনুমোদিত পদ থাকলেও মাত্র ১০ জন নিয়মিত চিকিৎসক আছেন। ডিপ্লোমা নার্সের সংকটও দীর্ঘদিনের। বিপুলসংখ্যক বন্দির বিপরীতে চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় চরমভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা থেকে শুরু করে দীর্ঘমেয়াদি রোগের চিকিৎসা এবং রাতের জরুরি সেবা।

 

সূত্র আরো জানায়, বর্তমানে কারাগারে থাকা বন্দিদের প্রায় ৫০ শতাংশের বয়স ৪৫ বছর বা তার বেশি। ওই বয়সে স্বাভাবিকভাবেই একজন মানুষের হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপসহ বিভিন্ন শারীরিক জটিলতার ঝুঁকি বাড়ে। আর কারাগারের সীমিত পরিবেশ ও মানসিক চাপ ওই ঝুঁকিকে তীব্র করে। কারণ কারাগারে আটক ব্যক্তিরা একটি বদ্ধ পরিবেশে থাকে। স্বাধীনভাবে হাঁটাচলার সুযোগ সীমিত। মানসিক চাপও থাকে। ফলে বিভিন্ন ধরনের শারীরিক জটিলতা দেখা দেয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। তাছাড়া কারাগারে থাকা বন্দিদের প্রায় ৩০ শতাংশ মাদকাসক্ত অথবা মাদক সংশ্লিষ্ট অপরাধের সঙ্গে যুক্ত। মাদকাসক্ত বন্দিদের অনেকের ক্ষেত্রে সাধারণ শারীরিক চিকিৎসার পাশাপাশি আসক্তি নিরাময় ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজন। কিন্তু কারা হাসপাতালগুলোতে ওই ধরনের চিকিৎসার সক্ষমতা সীমিত।

 

এদিকে এ প্রসঙ্গে ভারপ্রাপ্ত কারা মহাপরিদর্শক কর্নেল মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল জানান, যে কোন মৃত্যুই অনাকাঙ্ক্ষিত। কারাগারগুলোতে বর্তমানে এক লাখের বেশি বন্দি রয়েছে। ওই অনুপাতে মৃত্যুর সংখ্যা খুব বেশি না। তবে আমরা কেনো অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু চাই না। সীমিত সক্ষমতার মধ্যেও অসুস্থ বন্দিদের চিকিৎসা নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। চিকিৎসকের পরামর্শে প্রয়োজন হলে বন্দিকে কারাগারের বাইরে সরকারি হাসপাতালে পাঠানো হচ্ছে। বর্তমানে চিকিৎসক সংকট, নিয়মিত চিকিৎসক না থাকা এবং ডিপ্লোমা নার্সের ঘাটতির মধ্যেই কাজ করতে হচ্ছে। চিকিৎসক নিয়োগ ও পদায়নের বিষয়টি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন হওয়ায় কারা কর্তৃপক্ষকে তাদের ওপর নির্ভর করতে হয়। সমপ্রতি সরকারি কর্ম কমিশনের মাধ্যমে কারা অধিদফতরে ৫৫ জন ডিপ্লোমা নার্স নিয়োগ পেয়েছেন। তাছাড়া অর্থ মন্ত্রণালয়ের সম্মতির পর আরো ৪৪টি অ্যাম্বুলেন্স সংগ্রহের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। নতুন অ্যাম্বুলেন্সগুলো পাওয়া গেলে জরুরি রোগী পরিবহন ব্যবস্থায় বড় ধরনের উন্নতি হবে।