নিজস্ব প্রতিবেদক:
ক্যাপাসিটি চার্জ দেশের বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক সঙ্কটের অন্যতম কারণ। লাফিয়ে লাফিয়ে ওই চার্জ বাড়ছে। চলতি অর্থবছরে ৪৮ হাজার ২৬০ কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ দাঁড়াবে। আর আগামী অর্থবছরে তা পৌঁছাবে ৫২ হাজার ৬০৮ কোটি টাকায়। বিগত ২০১১-১২ থেকে ২০২৩-২৪ পর্যন্ত ক্যাপাসিটি চার্জ হিসেবে বিদ্যুতের ১ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা খরচ হয়। আর সর্বশেষ ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তার পরিমাণ ছিল ৩৬ হাজার ৭৪৬ কোটি টাকা। তার পরের অর্থবছরে তা বেড়ে ৪৫ হাজার ৪৫১ কোটি টাকা হয়। মাত্র এক বছরেই বিদ্যুতের ক্যাপাসিটি চার্জ ২৪ শতাংশ বেড়েছে। আর বিগত ১৫ বছরে ক্যাপাসিটি চার্জে ২ লাখ ১৩ হাজার ৪৯৫ কোটি টাকা রাষ্ট্রের খরচ হয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগ সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, দেশে বর্তমানে চাহিদার চেয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ৫৪ শতাংশ বেশি। বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা দেশে বর্তমানে ২৯ হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ ১৭ হাজার ২০০ মেগাওয়াট উৎপাদন হয়েছে। আবার তাও ছিলো মাত্র এক দিনের উৎপাদন। তবে দেশে গড় বিদ্যুৎ উৎপাদন ১৪-১৫ হাজার মেগাওয়াট। তারপরও ১৭ হাজার মেগাওয়াটকে হিসাবে ধরলেও প্রায় ১২ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বেশি। আর গড় উৎপাদন ধরলে অর্ধেক বিদ্যুৎকেন্দ্রই বসে থাকে। যদিও রক্ষণাবেক্ষণ ও সংরক্ষণের বিবেচনায় চাহিদার চেয়ে উৎপাদন সক্ষমতা কিছুটা বেশি থাকতে হয়। তাকে রিজার্ভ মার্জিন বলে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসারে রিজার্ভ মার্জিন হিসেবে চাহিদার ২০ শতাংশ বেশি থাকতে পারে। ওই হিসাবে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ১৯-২০ হাজার মেগাওয়াট হলেই যথেষ্ট। কিন্তু রিজার্ভ মার্জিন ২০ শতাংশের বেশি হলে ক্যাপাসিটি চার্জ বেশি দিতে হয় আর কম হলে হবে লোডশেডিং।
সূত্র জানায়, বিগত ২০০৯-১০ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত ১৫ বছরে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য ১ লাখ ৩৩ হাজার ৩৭৭ কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয়েছে। বেসরকারি খাতের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার সঙ্গে সঙ্গে ক্যাপাসিটি চার্জও বেড়েছে। যদিও ওই সময় ব্যবহার হয়নি বেশির ভাগ বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতার অর্ধেকও। কিছু কিছু কেন্দ্র তো উৎপাদন করেছে বছরের সক্ষমতার মাত্র ২-৩ শতাংশ। যদিও কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতার ৮০ শতাংশ ব্যবহৃত হওয়ার শর্তেই চুক্তির সময় ক্যাপাসিটি চার্জ নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু এখন বিদ্যুৎ উৎপাদন কোম্পানিকে পরিশোধ করা বিলের সবচেয়ে প্রধান অংশই হচ্ছে ক্যাপাসিটি চার্জ। সাধারণত ১২ বছরের মধ্যে প্রকল্পের ঋণের টাকা শোধ হলেও চুক্তির কারণে ১৩ থেকে ২২ বছর পর্যন্ত সরকারকে অত্যন্ত উচ্চ হারে ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে।
সূত্র আরো জানায়, বিদ্যুৎ খাতে ২০১১-১২ অর্থবছরে ক্যাপাসিটি চার্জ হিসেবে ৫ হাজার ৪৩৫ কোটি টাকা ব্যয় ছিলো। আর ২০১২-১৩ অর্থবছরে ক্যাপাসিটি চার্জ ছিলো ৬ হাজার ২৭ কোটি টাকা, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ৫ হাজার ৭৭৪ কোটি টাকা, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৫ হাজার ৭৪৭ কোটি টাকা, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৬ হাজার ৪৬১ কোটি টাকা এবং ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৭ হাজার ৪৮০ কোটি টাকা। তারপর ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ব্যয় দাঁড়ায় ৯ হাজার ২৪০ কোটি টাকা, পরের অর্থবছরে তা বেড়ে ১২ হাজার ৪১০ কোটি টাকা হয়। ২০১৯-২০ অর্থবছরে ১৫ হাজার ১১৪ কোটি, ২০২০-২১ অর্থবছরে ১৭ হাজার ২৩৮ কোটি এবং ২০২১-২২ অর্থবছরে ১৫ হাজার ৮৯৩ কোটি টাকা ব্যয় হয়। তবে ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে আবার বড় উল্লম্ফন দেখা যায়। ওই বছরে ব্যয় দাঁড়ায় ২৪ হাজার ৪৭৯ কোটি টাকা, যা পরের অর্থবছরে বেড়ে হয় ৩৬ হাজার ৭৪৬ কোটি টাকা। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা পৌঁছায় ৪৫ হাজার ৪৫১ কোটি টাকায়। ওই ১৪ অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে ২ লাখ ১৩ হাজার ৪৯৫ কোটি টাকা মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে। কারিগরি মূল্যায়ন কমিটির পূর্বাভাস অনুযায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ক্যাপাসিটি চার্জ ধরা হয়েছে ৪৮ হাজার ২৬০ কোটি টাকা। আর আগামী অর্থবছরে তা বেড়ে ৫২ হাজার ৬০৮ কোটি টাকা হতে পারে। ক্রমবর্ধমান ওই ব্যয়ের কারণে সরকার ইতিমধ্যে পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম সমন্বয় করেছে।
এদিকে বিগত দেড় দশকে বিদ্যুৎ খাতে ডজনখানেক কোম্পানি ফুলেফেঁপে উঠেছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের অনুমতি দিয়ে কমিশন বাণিজ্যেরও অভিযোগ রয়েছে। তার মাধ্যমে ৩০০ কোটি ডলার নয়ছয় হয়েছে। বিনা দরপত্রে চুক্তি করে বিদ্যুৎকেন্দ্রের অতিরিক্ত ক্যাপাসিটি চার্জ নেয়ার সুযোগ করে দেয়া হয়েছে। কয়েকবার চুক্তি নবায়নের সময়ও তাদের ক্যাপাসিটি চার্জ বেশি দেয়া হয়েছে।
অন্যদিকে বিদ্যুৎ খাতের ক্যাপাসিটি চার্জ প্রসঙ্গে এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানান, বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ক্যাপাসিটি চার্জের কারণে বাড়ছে।
এ বিষয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানান, ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতে সরকারের ওপর বড় আর্থিক চাপ তৈরি হচ্ছে।











