অনলাইন ডেস্ক:
খেলাধুলার পাশাপাশি পড়াশোনার গুরুত্ব তুলে ধরে প্রকাশিত হয়েছে জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক ও ক্রিকেট অপারেশন্সের ইনচার্জ শাহরিয়ার নাফীস এবং শিক্ষক ও তার বন্ধু আতিফ আকিফের লেখা বই ‘প্লে, স্টাডি, উইন দ্য রেস্ট’। খেলোয়াড়ি জীবনের সাফল্যের পাশাপাশি শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা, ক্রীড়াজীবন শেষ হওয়ার পরের বাস্তবতা এবং খেলাধুলা ও পড়াশোনার মধ্যে ভারসাম্য তৈরির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে বইটিতে।
শনিবার মিরপুর শেরে বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামের প্রেস কনফারেন্স রুমে বইটির মোড়ক উন্মোচন করা হয়। অনুষ্ঠানে দুই লেখকের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন শাহরিয়ার নাফীসের শৈশবের কোচ ওয়াহিদুল গনি।
বইটি তৈরি করা হয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আন্তর্জাতিক পর্যায়ের খেলোয়াড়, অ্যাথলেট, কোচ, শিক্ষাবিদ ও ক্রীড়াঙ্গনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের অভিজ্ঞতা ও গবেষণার ভিত্তিতে। নাফীস জানান, প্রায় তিন বছর ধরে ৩৫ থেকে ৩৭ জন আন্তর্জাতিক পর্যায়ের খেলোয়াড় ও অ্যাথলেটের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করেছেন তারা। বইটির কাজ শুরু হয় ২০২২ সালে। বিভিন্ন পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ ও তা সাজানোর পর বইটি প্রকাশের পর্যায়ে আসে।
বইটির ভাবনা কীভাবে তৈরি হলো, তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে নাফীস বলেন, ছোটবেলা থেকে প্রচলিত কথা, ‘পড়াশোনা করে যে, গাড়ি-ঘোড়া চড়ে সে’, সেটিকে একটু ভিন্নভাবে দেখার চেষ্টা থেকেই এই উদ্যোগ।
তার ভাষায়, ‘মূল উদ্দেশ্য ছিল একটাই, ছোটবেলা থেকে আমরা শুনে আসছি, “পড়াশোনা করে যে, গাড়ি-ঘোড়া চড়ে সে।” কিন্তু সেই ধারণাটাকে একটু ভিন্নভাবে তুলে ধরা, “পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা করে যে, গাড়ি-ঘোড়া চড়ে সে।” সেখান থেকেই একাডেমি ও অ্যাথলেট, এই দুই ক্ষেত্রকে কীভাবে এক জায়গায় আনা যায়, সেই ভাবনা থেকেই মূলত বইটি তৈরি করা।’
আতিফ আকিফ জানান, খেলাধুলার প্রতি আগ্রহের কারণে কোনো শিশু বা তরুণ যেন পড়াশোনায় পিছিয়ে না পড়ে, সেটিও বইটির অন্যতম উদ্দেশ্য। তার মতে, নতুন প্রজন্মকে পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলার গুরুত্ব বোঝানো দরকার।
তিনি বলেন, ‘আমরা চাই, অন্তত এই প্রজন্মকে এগিয়ে নিতে পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেটি তুলে ধরতে। আমাদের প্রজন্মের যারা খেলাধুলার সঙ্গে আসছে, তারা যেন পড়াশোনায় পিছিয়ে না যায়। সবকিছু মিলিয়ে গত চার বছর ধরে এটা আমাদের ছোট্ট একটা চেষ্টা।’
বইটিতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের ক্রিকেটার, ফুটবলার, কোচসহ বিভিন্ন ক্রীড়া ব্যক্তিত্বের অভিজ্ঞতার পাশাপাশি এমন কিছু মানুষের গল্পও রয়েছে, যারা একসময় সম্ভাবনাময় ক্রিকেটার বা ক্রীড়াবিদ ছিলেন। শেষ পর্যন্ত তারা খেলাধুলার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে না পারলেও তাদের জীবনে পড়াশোনা কীভাবে কাজে এসেছে, সেই অভিজ্ঞতাও তুলে ধরা হয়েছে।
নাফীস জানান, বইয়ের জন্য তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে তারা শুধু পরিচিত বা প্রতিষ্ঠিত ক্রীড়াবিদদের ওপর নির্ভর করেননি। বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষের অভিজ্ঞতাও যুক্ত করেছেন। তার সঙ্গে কথা বলা ব্যক্তিদের মধ্যে বাংলাদেশের সাবেক কোচ অ্যালান ডোনাল্ড, স্টুয়ার্ট ল এবং ২০০৪ সালের অলিম্পিকে অস্ট্রেলিয়ার হয়ে ৪০০ মিটারে সোনাজয়ী ক্যাথি ফ্রিম্যানের অলিম্পিক কোচও রয়েছেন।
নাফীস বলেন, ‘আমি জাতীয় দলের বিভিন্ন খেলোয়াড়ের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যায়ের ব্যক্তিদের সঙ্গেও কথা বলেছি। যেমন অ্যালান ডোনাল্ডের সঙ্গে কথা বলেছি, এ নিয়ে স্টুয়ার্ট লর সঙ্গেও কথা বলেছি। ২০০৪ সালের অলিম্পিকে অস্ট্রেলিয়ার হয়ে ৪০০ মিটারে সোনার পদকজয়ী ক্যাথি ফ্রিম্যানের অলিম্পিক কোচের সঙ্গেও কথা বলেছি।’
খেলাধুলার পাশাপাশি পড়াশোনার প্রয়োজনীয়তা বোঝাতে গিয়ে নাফীস নিজের জীবনের অভিজ্ঞতাও তুলে ধরেছেন। ছোটবেলা থেকেই ক্রিকেটের সঙ্গে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার জন্য পরিবারের কাছ থেকে চাপ ছিল বলে জানান তিনি। জাতীয় দলের অধিনায়ক হওয়ার পরও বাবার একটি কথা তাকে শুনতে হয়েছে, ‘ক্রিকেট শেষ পর্যন্ত ভাত দেবে না।’
নাফীস বলেন, ‘আমি যখন একদম ছোট, তখন বাসায় আমার আব্বা-আম্মু পড়ালেখার জন্য প্রচণ্ড রকমের চাপ দিতেন। এমনকি স্যার (কোচ ওয়াহিদুল গনি) অনেক সময় বলতেন, তুই ক্রিকেট খেলে কী করবি, তুই তো সারাদিন পড়াশোনাই করিস; কিন্তু আমার বাসায় সবসময় এই চাপটা ছিল। আমি যখন জাতীয় দলের অধিনায়কও হয়েছিলাম, তখনও আব্বার কথা এখনো আমার কানে ভাসে। আব্বা একটা কথা বলতেন, ক্রিকেট শেষ পর্যন্ত ভাত দেবে না। তখন খুব বিরক্ত লাগত, জাতীয় দলের অধিনায়কত্ব করছি, আর আব্বা বলছেন ক্রিকেট ভাত দেবে না। কিন্তু ওই কথার মর্মটা আমি এখন বুঝি।’
তার নিজের অভিজ্ঞতার পাশাপাশি বইয়ে বিভিন্ন ক্রীড়াবিদের জীবনে পড়াশোনার প্রভাবও তুলে ধরা হয়েছে। নাফীসের ভাষ্য, প্রতিভাবান অনেক খেলোয়াড়ই শেষ পর্যন্ত সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেন না। সেই পরিস্থিতিতে খেলাধুলার পাশাপাশি অর্জিত শিক্ষা তাদের পরবর্তী জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
পড়াশোনার গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে নাফীস বলেন, ‘আপনাকে পিএইচডি ডিগ্রিধারী হতে হবে না। তবে পড়াশোনা করলে যেটা হয়, আপনি খুব সহজভাবে চিন্তা করতে পারেন।’
বাংলাদেশের বাস্তবতায় খেলাধুলার পাশাপাশি পড়াশোনা কেন জরুরি, তার ব্যাখ্যাও দিয়েছেন সাবেক এই ক্রিকেটার। তার মতে, দেশে খেলাধুলা, নাটক-অভিনয়সহ পারফরম্যান্সভিত্তিক অনেক ক্ষেত্র এখনো এমন বড় শিল্পে পরিণত হয়নি, যেখানে সবাই দীর্ঘমেয়াদে ক্যারিয়ার চালিয়ে যেতে পারেন। তাই বিকল্প প্রস্তুতি থাকা জরুরি।
নাফীস বলেন, ‘বাংলাদেশের বাস্তবতাটা আমাকে মেনে নিতেই হবে। বাংলাদেশে এখনো খেলাধুলা বলেন, নাটক-অভিনয় বলেন বা এই সেক্টরগুলো এত বড় ইন্ডাস্ট্রি হয়ে ওঠেনি, যেখানে পরবর্তীতে আপনার ব্যাকআপ না থাকলেও চলবে। তাই আমার কাছে মনে হয়েছে পড়াশোনাটা খুবই জরুরি। বিভিন্ন সেক্টরের বিভিন্ন মানুষের সেই গল্পই এখানে নিয়ে আসা হয়েছে।’
বয়সভিত্তিক ক্রিকেটে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকেও বাবা-মায়েদের উদ্দেশে বার্তা দিয়েছেন নাফীস। সন্তানকে খেলাধুলার সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি পড়াশোনায়ও মনোযোগী করার পরামর্শ তার।
তিনি বলেন, ‘আমি বাচ্চাদের বাবা-মাকে সবসময় একটা কথা বলি, আপনার বাচ্চাদের খেলতে দেন। কিন্তু বাচ্চাকে গিয়ে এই কথাটা বলি, তুমি যতই করো না কেন, পড়াশোনা না করলে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তোমার জীবন খুব কঠিন হবে। আশা করি, এই বই পড়লে ওই গল্পগুলো যখন মানুষ জানবে, অবশ্যই কিছু না কিছু অনুপ্রেরণা তারা পাবে।’
খেলাধুলা ও পড়াশোনাকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে না দেখে পাশাপাশি এগিয়ে নেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। নাফীসের মতে, পড়াশোনায় ভালো ফল করলে খেলাধুলার জন্য বাবা-মায়ের কাছ থেকেও সহযোগিতা পাওয়া সহজ হয়।
তিনি বলেন, ‘দুইটা জিনিস। একটা হচ্ছে, তুমি যদি পড়াশোনা করো, সেটা তোমার পারফরম্যান্সও উন্নত করবে। আর দুই নম্বর, আমাদের বাবা-মায়ের সবচেয়ে বড় অভিযোগ এখন হচ্ছে, স্কুল-কলেজে পড়াশোনার এত চাপ, খেলতে কেন দেব? তখন বাচ্চাদের কানে কানে ওই কথাটাই বলি, তুমি যদি পড়াশোনাটা ন্যূনতম ভালো করো, তখন তুমি তোমার বাবা-মায়ের সঙ্গে সেই সমঝোতাটা করতে পারবে, আমার ফলাফলও তো একটু ভালো হচ্ছে, তাহলে আমাকে খেলতে দেবে না কেন?’
নিজের শৈশবের কথাও এ প্রসঙ্গে তুলে ধরেন নাফীস। তার পরিবারেও পড়াশোনা ও খেলাধুলা নিয়ে একটি সমঝোতা ছিল। পড়াশোনার ফলাফল ঠিক না থাকলে খেলতে দেওয়া হবে না, আবার খেলতে হলে পড়াশোনাও চালিয়ে যেতে হবে, এমন শর্তের মধ্যেই বেড়ে উঠেছেন তিনি।
নাফীস বলেন, ‘আমার বাবা-মায়ের সঙ্গে সবসময় একটা সমঝোতা ছিল। আমার বাবা-মা বলতেন, ফলাফল ও পড়াশোনা ঠিক না করলে খেলতে দেব না। আর আমার ক্ষেত্রে ছিল, আমাকে খেলতে হবে, তার জন্য কিছুটা হলেও পড়াশোনা করতে হবে। এই সমঝোতাটা সবসময় ছিল। আমার কাছে মনে হয়, কোনটার জন্য কতটুকু ত্যাগ আমি করতে পারব, সেটাও বুঝতে হবে।’
শুধু সার্টিফিকেট অর্জনের জন্য নয়, মানুষের চিন্তাশক্তি ও সামাজিক বিকাশের জন্যও পড়াশোনা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন নাফীস। এ ক্ষেত্রে খেলোয়াড়দের পাশাপাশি অভিভাবক, কোচ ও বয়োজ্যেষ্ঠদেরও দায়িত্ব রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
নাফীস বলেন, ‘পড়াশোনা শুধুমাত্র আমার সার্টিফিকেট, এটা না। পড়লে আসলে যেকোনো কাজ করার ক্ষেত্রে আমার মস্তিষ্কের বিকাশের জন্য জরুরি, সামাজিকভাবেও জরুরি।’
নিজের উপলব্ধি তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে খেলাধুলা, গান, নাটক ও অভিনয়সহ বিভিন্ন পারফরম্যান্সভিত্তিক পেশার সময়কাল সবসময় দীর্ঘ হয় না। ফলে ক্যারিয়ারের পরবর্তী সময়ে অনেকের জন্য পরিস্থিতি কঠিন হয়ে উঠতে পারে। এ কারণেও পড়াশোনাকে গুরুত্ব দেওয়ার পক্ষে তিনি।
বইটির মূল লক্ষ্য হিসেবে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের কথা বলেছেন নাফীস। সন্তানকে খেলাধুলা থেকে দূরে না রেখে পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলার সুযোগ দেওয়া এবং তরুণদেরও শিক্ষার গুরুত্ব বোঝানোই তাদের উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য।
তার ভাষায়, ‘আমাদের এই উদ্যোগটা মূলত দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের জন্য। বাবা-মাকে বোঝানো দরকার যে সন্তানকে খেলতে দেওয়া উচিত। পাশাপাশি খেলোয়াড়দেরও বলা দরকার, পড়াশোনা করলে তাদের পারফরম্যান্স ১০০ শতাংশ উন্নত হবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। পড়াশোনা মানে ডক্টরেট ডিগ্রি বা মাস্টার্সে প্রথম শ্রেণি পাওয়া নয়, আপনার পড়ার অভ্যাস থাকতে হবে। তাহলে অনেক কিছুই সহজ হয়ে যায়।’











