খ্যাতি মানেই কি ব্যক্তিগত জীবন কেড়ে নেওয়া? প্রশ্ন বলিউড অভিনেত্রী রাধিকা আপ্তের

অনলাইন ডেস্ক:

তারকাখ্যাতির আড়ালে নিজের ব্যক্তিগত জীবনটুকু হারাতে চান না বলিউড অভিনেত্রী রাধিকা আপ্তে। অভিনেত্রী হিসেবে পরিচিতি ও দর্শকের ভালোবাসা পেলেও রাস্তায় তাকে দেখলেই ছবি তোলার আবদার, পিছু নেওয়া কিংবা একটানা তাকিয়ে থাকার মতো ঘটনায় ভীষণ বিরক্ত তিনি। তার প্রশ্ন, অভিনেত্রী হয়েছেন বলে কি ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বলে কিছু থাকবে না?

সম্প্রতি দ্য হলিউড রিপোর্টার ইন্ডিয়াকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে খ্যাতি ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিয়ে নিজের অস্বস্তির কথা খোলামেলা জানিয়েছেন রাধিকা আপ্তে। নতুন সিরিজ ‘আক্কা’ মুক্তির আগে দেওয়া এই সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, মানুষের অতিরিক্ত আগ্রহের কারণে অনেক সময় স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করাও কঠিন হয়ে পড়ে। খ্যাতির বিষয়টি তার কাছে আনন্দের চেয়ে বেশি অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

২০১৫ সালে ‘বাদলাপুর’, ‘হান্টারর’ ও ‘মাঞ্জি: দ্য মাউন্টেন ম্যান’ সিনেমার মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনায় আসেন রাধিকা। এরপর বিভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জিং চরিত্রে অভিনয় করে চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রিতে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন তিনি। তবে অভিনয়জীবনে পরিচিতি বাড়লেও তারকা হিসেবে মানুষের নজরে থাকতে কখনোই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না এই অভিনেত্রী।

সাক্ষাৎকারে রাধিকা জানান, রাস্তায় কেউ তাকে চিনে ছবি তুলতে চাইলে তিনি সাধারণত তাতে রাজি হন না। সেলফি তোলার আবদারও এড়িয়ে চলেন তিনি। এমনকি তার এ সিদ্ধান্ত নিয়ে নিজের এজেন্টদের সঙ্গেও তার মতবিরোধ হয়। তাদের প্রশ্ন থাকে, অভিনেত্রী হয়ে এমন আচরণ কেন করছেন তিনি? কিন্তু রাধিকা নিজের এই অবস্থানে সম্পূর্ণ অনড় থাকেন।

বিমানবন্দরে সাজগোজ করে যাওয়া কিংবা সব সময় লোকজনের সঙ্গে ঘুরে বেড়ানোর মতো বিষয়েও তার কোনো আগ্রহ নেই। তারকা পরিচয়কে ঘিরে তৈরি হওয়া প্রচলিত এই জীবনযাপন থেকে নিজেকে সবসময় দূরে রাখতেই পছন্দ করেন তিনি।

রাধিকার মতে, একজন অভিনয়শিল্পী হওয়ার অর্থ এই নয় যে, সব সময় দর্শকের সঙ্গে ছবি তুলতে হবে কিংবা সবার মনোযোগ গ্রহণ করতে হবে। দর্শকের ভালোবাসার প্রতি তিনি কোনোভাবেই অকৃতজ্ঞ নন, তবে নিজের ব্যক্তিগত পরিসর রক্ষার পূর্ণ অধিকারও তার রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

বর্তমানে লন্ডন ও ভারতের মধ্যে নিয়মিত যাতায়াত করেন রাধিকা আপ্তে। লন্ডনে অবস্থানকালে গণপরিবহন ব্যবহার করতেই বেশি পছন্দ করেন তিনি। তার মতে, শহরটিতে যাতায়াতের জন্য এটি অত্যন্ত সহজ ও সুবিধাজনক মাধ্যম। কিন্তু সেখানেও মানুষের অতিরিক্ত নজর তার স্বাভাবিক চলাচলে মারাত্মক বাধা সৃষ্টি করে।

অভিনেত্রী জানান, কেউ একটানা তার দিকে তাকিয়ে থাকলে বা তার সামনে এসে বসে একইভাবে নজর রাখতে থাকলে কখনো কখনো তাকে পাঁচবার পর্যন্ত ট্রেনের কামরা পরিবর্তন করতে হয়। মানুষের এ ধরনের অদ্ভুত আচরণ কেন হয়, তা কিছুতেই বুঝতে পারেন না তিনি।

শুধু বাইরে চলাফেরা নয়, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর ক্ষেত্রেও ঠিক একই ধরনের চরম অস্বস্তির মুখোমুখি হন রাধিকা। বিশেষ করে ছোট মেয়েকে নিয়ে বাইরে বের হলে মানুষের অতিরিক্ত নজর তাকে দারুণভাবে বিরক্ত করে। এমনকি তার বাড়ির বাইরে এসেও কেউ কেউ দাঁড়িয়ে থাকেন বলে সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন অভিনেত্রী।

তার মতে, একজন অভিনয়শিল্পীকে পর্দায় নিয়মিত দেখে দর্শকের মনে একটা পরিচিতির অনুভূতি তৈরি হতেই পারে। কিন্তু বাস্তবে তাকে অনুসরণ করা কিংবা তার ব্যক্তিগত জীবনে অনধিকার প্রবেশ করা কোনোভাবেই সেই পরিচিতির অংশ হতে পারে না।

মানুষের অতিরিক্ত আগ্রহ যে তাকে কতটা কষ্ট দেয়, তা বোঝাতে গিয়ে অত্যন্ত বেদনাদায়ক একটি ঘটনার কথা বলেছেন রাধিকা। একদিন একটি পার্কে এক নারীকে হাঁসকে সাদা পাউরুটি খাওয়ানো থেকে বিরত করার চেষ্টা করছিলেন তিনি। কিন্তু ওই নারী যখন বুঝতে পারেন যে তিনি একজন জনপ্রিয় অভিনেত্রী, তখন তার কথার প্রতি বিন্দুমাত্র মনোযোগ না দিয়ে সেলফি তোলার জন্য তীব্র আগ্রহ দেখান।

ঘটনাটি রাধিকাকে ভীষণভাবে কষ্ট দিয়েছিল এবং পরে বাড়ি ফিরে তিনি কেঁদেছিলেন। তার মনে হয়েছিল, তিনি আসলে কী বলছেন বা বোঝাচ্ছেন, সেটি শোনার চেয়ে ওই নারীর কাছে তার কেবল অভিনেত্রী পরিচয় এবং ছবি তোলার বিষয়টিই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।

রাধিকার মতে, কেউ সত্যিকারের ভক্ত হলে অত্যন্ত ভদ্রভাবে কাছে এসে নিজের ভালো লাগার কথা জানাতে পারেন। এতে তার বিন্দুমাত্র আপত্তি নেই। কিন্তু খাওয়ার সময়, কোনো বন্ধুর সঙ্গে কফি খেতে বসে কিংবা পরিবারের সঙ্গে একান্ত বাইরে থাকার সময় বারবার এ ধরনের বাধার মুখে পড়া অত্যন্ত অস্বস্তিকর।

তারকাদের ব্যক্তিগত পরিসর নিয়ে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে রাধিকা স্পষ্ট করেছেন, এই পুরো বিষয়টি ভক্ত-দর্শकोंের প্রতি কোনো ধরনের অকৃতজ্ঞতা নয়। বরং অভিনয়শিল্পীরাও অন্য আটদশটি মানুষের মতো সাধারণ মানুষ এবং তাদেরও একটি আলাদা ব্যক্তিগত জীবন রয়েছে।

তার মতে, পর্দায় কাউকে নিয়মিত দেখার কারণে দর্শক হয়তো ভাবতেই পারেন যে তারা তাকে খুব ভালোভাবে চেনেন। কিন্তু পর্দার বাইরের মানুষটির নিজস্ব কিছু পছন্দ, অপছন্দ ও গোপনীয় পরিসর রয়েছে। সেই সীমারেখাকে সম্মান জানানো অত্যন্ত প্রয়োজন।

রাধিকা আরও জানান, এ ধরনের পরিস্থিতিতে তিনি অনেক সময় তীব্র রাগ অনুভব করেন। তার স্বামী তাকে কৃত্রিমভাবে হলেও সবসময় হাসিমুখে থাকার পরামর্শ দিয়েছেন, যাতে এই কঠিন পরিস্থিতিগুলো সামলানো কিছুটা সহজ হয়। স্বামীর সেই পরামর্শ মেনে নিজের প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণেরও চেষ্টা করছেন তিনি। তবে তার কাছে বিষয়টি শুধু রাগের নয়; নিজের অমূল্য গোপনীয়তা হারানোর দীর্ঘ কষ্টও এর সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।

অভিনেতা বন্ধুদের সঙ্গে বাইরে গেলে পরিস্থিতি কখনো কখনো আরও বেশি অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে বলে জানিয়েছেন রাধিকা। কারণ, তার বন্ধুরা ভক্তদের সঙ্গে ছবি তুলতে রাজি হলেও তিনি নিজের সিদ্ধান্তে পুরোপুরি অটল থাকেন। এতে তাকে অনেক সময় নেতিবাচকভাবে দেখা হতে পারে। তবু তিনি নিজের ব্যক্তিগত সীমারেখা কঠোরভাবে বজায় রাখতে চান।

রাধিকা আপ্তের নতুন প্রতীক্ষিত সিরিজ ‘আক্কা’ খুব শীঘ্রই মুক্তি পেতে যাচ্ছে জনপ্রিয় স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম নেটফ্লিক্সে। এই সিরিজটিতে তার সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেছেন কীর্তি সুরেশ। ধামারাজ শেঠি সিরিজটি অত্যন্ত যত্ন নিয়ে লিখেছেন এবং পরিচালনা করেছেন। আগামী ৩০ অক্টোবর সিরিজটির প্রিমিয়ার হওয়ার কথা রয়েছে।

অভিনয়জীবনে ব্যাপক সাফল্য ও জনপ্রিয়তা অর্জন করলেও ব্যক্তিগত জীবনে নিজের মতো করে স্বাধীনভাবে বাঁচতে চান রাধিকা আপ্তে। তার সাবলীল বক্তব্যে এটি অত্যন্ত স্পষ্ট যে, তিনি দর্শকের ভালোবাসাকে বিন্দুমাত্র অস্বীকার করছেন না; বরং সেই ভালোবাসার পাশাপাশি নিজের ব্যক্তিগত পরিসরটুকুও অক্ষুণ্ন রাখতে চান। অভিনেত্রী পরিচয়ের কারণে যেন একজন মানুষের স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার ও জীবনযাপনের অধিকার হারিয়ে না যায়, সেটাই তার একমাত্র প্রত্যাশা।