অনলাইন ডেস্ক:
ইসরায়েলে গাজার যুদ্ধের ভয়াবহতা চলতে থাকলেও এর নেপথ্যে দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতি আরও জটিল হয়ে উঠছে। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে ইসরায়েলেরই একাধিক আইনপ্রণেতা অভিযোগ তুলেছেন যে, তিনি গাজা যুদ্ধের ভয়াবহতা এবং যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা নিজের দুর্নীতি মামলার সুবিধার্থে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছেন। গত রোববার টাইমস অব ইসরায়েল এবং আনাদোলু এজেন্সির প্রতিবেদনে এ অভিযোগের বিস্তারিত উঠে এসেছে।
ইসরায়েলের ডেমোক্রেটিক পার্টির নেসেট সদস্য নামা লাজিমি বলেছেন, নেতানিয়াহু ইসরায়েল এবং দেশটির ভবিষ্যৎকে নিজের দুর্নীতির মামলার সঙ্গে যুক্ত করে ফেলছেন। তাঁর ভাষায়, নেতানিয়াহু এমন এক রাজনৈতিক সমঝোতা খুঁজছেন, যেখানে নিজের বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগের বিনিময়ে যুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে প্রধানমন্ত্রী পদে টিকে থাকতে চান। এ অভিযোগের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও আলোচনায় আসেন। গত শনিবার ট্রাম্প আবারও নেতানিয়াহুকে দুর্নীতি মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইসরায়েলকে দেওয়া বিপুল আর্থিক সহায়তার প্রসঙ্গ টেনে বলেন, “আমরা এটি সহ্য করব না”এবং নেতানিয়াহুকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান।
তবে ইসরায়েলি রাজনীতির অনেকেই ট্রাম্পের এমন বক্তব্যকে নেতানিয়াহুর স্বার্থে হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। ডেমোক্রেটিক দলের আরেক আইনপ্রণেতা গিলাদ কারিভ বলেন, ট্রাম্পের টুইটের পেছনে রয়েছে নেতানিয়াহু এবং তাঁর দুর্নীতিগ্রস্ত ঘনিষ্ঠদের প্রচেষ্টা। তাঁর দাবি, নেতানিয়াহু এবং তাঁর সহযোগীরা আদালতের শাস্তি এড়াতে জাতীয় নিরাপত্তা ও গাজায় থাকা ইসরায়েলি জিম্মিদের জীবন নিয়ে রাজনীতি করছেন।
গাজা যুদ্ধের ইস্যুতে হামাস একাধিকবার জানিয়েছে, যুদ্ধ থামানো, গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার এবং ফিলিস্তিনি বন্দিদের মুক্তির বিনিময়ে তারা গাজায় থাকা সব ইসরায়েলি জিম্মি ছেড়ে দিতে প্রস্তুত। কিন্তু নেতানিয়াহু এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে গাজা উপত্যকায় হামলা অব্যাহত রেখেছেন। আনাদোলু এজেন্সির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে চলমান এই যুদ্ধের ফলে গাজায় এখন পর্যন্ত ৫৬ হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।
নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলাগুলো দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের রাজনীতিকে আলোচিত করে রেখেছে। ইয়েশ আতিদ পার্টির নেসেট সদস্য কারিন এলহারার সতর্ক করে বলেছেন, নেতানিয়াহু ইসরায়েলি জনগণের স্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ করছেন, কারণ তিনি নিজের আইনগত ভাগ্যকে জিম্মি মুক্তি এবং আঞ্চলিক স্বীকৃতির মতো গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িয়ে ফেলেছেন।
বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদও এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে ইসরায়েলের স্বাধীন বিচারব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ না করার আহ্বান জানিয়েছেন।
রিলিজিয়াস জায়নিজম পার্টির আইনপ্রণেতা এবং নেসেটের সংবিধান, আইন ও বিচার কমিটির চেয়ারম্যান সিমচা রথম্যান বলেছেন, নেতানিয়াহুর মামলার অবসান চেয়ে ট্রাম্পের আহ্বান ‘অনুপযুক্ত’। নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে ঘুষ, প্রতারণা এবং বিশ্বাসভঙ্গের মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাঁর কারাদ- হতে পারে। ২০১৯ সালের নভেম্বরে ইসরায়েলের অ্যাটর্নি জেনারেল নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে মামলার অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেন। তাঁর বিচার শুরু হয় ২০২০ সালের ২৪ মে। তিনি ইসরায়েলের ইতিহাসে প্রথম দায়িত্বরত প্রধানমন্ত্রী, যিনি ফৌজদারি মামলায় আসামির আসনে বসেছেন।
অন্যদিকে, গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানকে কেন্দ্র করে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক মহলেও কঠিন চাপ তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে নেতানিয়াহু এবং সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে। গাজায় চালানো অভিযানের ভয়াবহতা এবং সেখানে হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানির ঘটনায় নেতানিয়াহুর ভূমিকা আন্তর্জাতিক মহলে তীব্রভাবে সমালোচিত হচ্ছে।
ইসরায়েলের অভ্যন্তরে যেমন, তেমনি আন্তর্জাতিক পরিসরেও নেতানিয়াহুর অবস্থান দিন দিন চাপে পড়ছে। গাজায় যুদ্ধ কতদিন চলবে এবং নেতানিয়াহুর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক এবং আইনি ভাগ্য কীভাবে এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে আছে, তা এখন পুরো মধ্যপ্রাচ্য এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।











