নিজস্ব প্রতিবেদক:
কর্মস্থলে অননুমোদিতভাবে অনুপস্থিত থাকা ও পলায়নের অভিযোগে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক যুগ্ম কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকারসহ পাঁচ পুলিশ কর্মকর্তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বরখাস্তের প্রক্রিয়া প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। রাষ্ট্রপতির অনুমোদন পাওয়ার পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি হতে পারে। এই পাঁচ কর্মকর্তার মধ্যে রয়েছেন আলোচিত ‘গুলি করি, মরে একটা, আহত হয় একটা’ বক্তব্য দেওয়া ডিএমপির ওয়ারী বিভাগের সাবেক উপকমিশনার মো. ইকবাল হোসাইন।
বরখাস্ত হতে যাওয়া অন্য তিন কর্মকর্তা হলেন মো. গোলাম রুহানী, সুদীপ কুমার চক্রবর্তী ও রাজন কুমার দাস। সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, বিপ্লব কুমার সরকার ও সুদীপ কুমার চক্রবর্তী সাময়িক বরখাস্ত হয়ে বরিশাল রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয়ে সংযুক্ত রয়েছেন। ইকবাল হোসাইনও সাময়িক বরখাস্ত হয়ে খুলনা রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয়ে সংযুক্ত আছেন। গোলাম রুহানী ও রাজন কুমার দাস সাময়িক বরখাস্ত অবস্থায় পলাতক রয়েছেন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, পাঁচ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনুমতি ছাড়া দীর্ঘ সময় কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকা এবং পলায়নের অভিযোগে বিভাগীয় মামলা করা হয়। অনুমোদিত ছুটি শেষ হওয়ার পরও তারা নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থলে যোগ দেননি। নোটিশ দেওয়ার পরও কেউ কর্মস্থলে যোগদান বা নিজেদের অবস্থান সম্পর্কে কর্তৃপক্ষকে জানাননি।
অননুমোদিত অনুপস্থিতির সময় ৬০ দিনের বেশি হওয়ায় সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়। মামলায় বিধিমালার ৩(খ) ও ৩(গ) অনুযায়ী ‘অসদাচরণ’ ও ‘পলায়ন’-এর অভিযোগ আনা হয়।
অভিযোগের বিষয়ে পাঁচ কর্মকর্তাকেই কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তারা কোনো জবাব দেননি। পরে তদন্তকারী কর্মকর্তা নিয়োগ করে অভিযোগের তদন্ত করা হয়। তদন্ত শেষে তাদের বিরুদ্ধে ‘অসদাচরণ’ ও ‘পলায়ন’-এর অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে মতামত দেওয়া হয়।
এরপর তাদের চাকরি থেকে বরখাস্ত করার গুরুদণ্ড আরোপের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সেই সিদ্ধান্তের বিষয়েও দ্বিতীয় দফায় কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। তাতেও কোনো জবাব না পাওয়ার পর তদন্ত প্রতিবেদন, অভিযোগের গুরুত্ব ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয় পর্যালোচনা করে বরখাস্তের সিদ্ধান্ত বহাল রাখা হয়।
গুরুদণ্ড আরোপের বিষয়ে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ এবং বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (পরামর্শকরণ) রেগুলেশনস, ১৯৭৯ অনুযায়ী সরকারি কর্ম কমিশনের পরামর্শ চাওয়া হয়। কমিশন পাঁচ কর্মকর্তাকেই চাকরি থেকে বরখাস্ত করা যেতে পারে বলে মত দেয়।
এরপর বিধিমালার ৪(৬) অনুযায়ী নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ হিসেবে রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের জন্য বিষয়টি উপস্থাপন করা হয়েছে। অনুমোদন পাওয়ার পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করে সিদ্ধান্তটি কার্যকর করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
পাঁচ কর্মকর্তার মধ্যে মো. ইকবাল হোসাইন ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় একটি বক্তব্যের কারণে ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসেন। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সঙ্গে তাঁর একটি ৪৩ সেকেন্ডের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
ভিডিওতে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালানোর প্রসঙ্গে ইকবাল হোসাইনকে বলতে শোনা যায়, “গুলি করে করে লাশ নামানো লাগছে স্যার। গুলি করি, মরে একটা, আহত হয় একটা। একটাই যায় স্যার, বাকিডি যায় না। এইটা হলো স্যার সবচেয়ে বড় আতঙ্কের এবং দুশ্চিন্তার বিষয়।”
ভিডিওতে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আশপাশে পুলিশের মহাপরিদর্শক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন ও স্বরাষ্ট্রসচিব জাহাঙ্গীর আলমকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। ইকবাল হোসাইন তখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে মুঠোফোনে একটি ভিডিও দেখাচ্ছিলেন।
কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার অভিযোগে ইকবাল হোসাইনের বিরুদ্ধে আলাদাভাবে বিভাগীয় মামলা হয়। বর্তমানে তিনি খুলনা রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয়ে সংযুক্ত। নথি অনুযায়ী, কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া ২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট থেকে তিনি কর্মস্থলে অনুপস্থিত রয়েছেন।
ইকবাল হোসাইনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলাও চলছে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে যাত্রাবাড়ীর কাজলা এলাকায় পুলিশ কর্মকর্তা ও শিক্ষার্থী ইমাম হাসান তাইমকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় তাকে অন্যতম আসামি করা হয়েছে।
রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ, ২০২৪ সালের ২০ জুলাই যাত্রাবাড়ীর কাজলা এলাকায় ডিএমপির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশে খুব কাছ থেকে গুলি করে তাইমকে হত্যা করা হয়। তাঁকে বাঁচাতে এগিয়ে এলে তাঁর বন্ধু রাহাতকেও গুলি করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইকবাল হোসাইনের বিরুদ্ধে হত্যার নির্দেশ, উসকানি ও প্ররোচনাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ আনা হয়েছে। এ মামলায় সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর নির্দেশ দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। মামলাটির বিচারিক কার্যক্রম ও যুক্তিতর্ক চলমান রয়েছে।
ডিএমপির সাবেক যুগ্ম কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকারের বিরুদ্ধেও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে একাধিক মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা ও অভিযোগ রয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান এবং এর আগে বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে দমনপীড়নের ঘটনায় তাকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
মো. গোলাম রুহানী আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ডিএমপির মতিঝিল জোনের সহকারী কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি সাবেক ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীর ছোট ভাই। তাঁর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে পুলিশ প্রশাসনে প্রভাব খাটানো ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগও আলোচিত হয়েছে। ২০২৪ সালের ১১ আগস্ট থেকে অনুমতি ছাড়া কর্মস্থলে অনুপস্থিত রয়েছেন তিনি। বর্তমানে তিনি পলাতক।
সুদীপ কুমার চক্রবর্তী ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর চানখাঁরপুলে ছাত্র-জনতা হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত হন। ওই মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত ২৬ জানুয়ারি ট্রাইব্যুনাল-১ এ রায় ঘোষণা করে।
আর রাজন কুমার দাস ২০২৪ সালের জুলাইয়ে সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন। জুলাই-আগস্টের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমনে নির্বিচারে বলপ্রয়োগ ও গুলির নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। আন্দোলনের সময় সুনামগঞ্জ শহরে শিক্ষার্থী ও সাধারণ নাগরিকদের ওপর পুলিশের বলপ্রয়োগ, লাঠিচার্জ ও শর্টগানের গুলি চালানোর ঘটনায় মাঠপর্যায়ে তিনি নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তা ছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
পাঁচ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে চাকরি থেকে বরখাস্তের সিদ্ধান্তের প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর এখন রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের অপেক্ষা। অনুমোদন মিললেই প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাদের চাকরি থেকে বরখাস্তের সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে।










