গ্যাস সংকট ঠেকাতে বড় পরিকল্পনা সরকারের, ২০৩০ সালের মধ্যে ১৫০ কূপ খনন

নিজস্ব প্রতিবেদক:

আকস্মিক বা সাময়িক গ্যাস সংকটে শিল্পখাত যাতে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে না পড়ে, সে জন্য বড় ধরনের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। নতুন ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন, গ্যাসের নতুন উৎস অনুসন্ধান এবং ২০৩০ সালের মধ্যে ১৫০টি কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি শিল্পাঞ্চলে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে ভোলার গ্যাস এলএনজি আকারে মূল ভূখণ্ডে আনার সম্ভাব্যতাও যাচাই করা হচ্ছে।

 

বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্বে এসব তথ্য জানান প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান। সংসদ সদস্য সুলতানা আহমেদের প্রশ্নের জবাবে তিনি সরকারের জ্বালানি পরিকল্পনার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম।

 

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভবিষ্যতে হঠাৎ গ্যাস সংকট দেখা দিলে শিল্পখাত যাতে গ্যাসের অভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেজন্য সরকার বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে নতুন ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন অন্যতম। টার্মিনালগুলোর মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি সংকটের সময়ে শিল্পকারখানায় জ্বালানি সরবরাহ সচল রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।

 

বর্তমানে দেশে থাকা দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের মাধ্যমে গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৯৩৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব বলে সংসদে জানান প্রধানমন্ত্রী।

 

নতুন এলএনজি টার্মিনাল, সরবরাহ বাড়ানোর পরিকল্পনা

 

মহেশখালীর কুতুবজোমে নতুন একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের কার্যক্রম চলছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই টার্মিনাল থেকে ২০২৮ সালে রি-গ্যাসিফাইড এলএনজি সরবরাহের আশা করা হচ্ছে।

 

এর পাশাপাশি মাতারবাড়ীতে একটি ল্যান্ড-বেইজড এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের কার্যক্রমও চলছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩০ সালের ডিসেম্বর নাগাদ সেখান থেকে রি-গ্যাসিফাইড এলএনজি সরবরাহের লক্ষ্য রয়েছে।

 

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জ্বালানি চাহিদা বিবেচনায় পায়রা বা মোংলা বন্দর এলাকা কিংবা ওই অঞ্চলের সমুদ্র উপকূলের সুবিধাজনক কোনো স্থানে জরুরি ভিত্তিতে আরও একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হচ্ছে।

 

প্রধানমন্ত্রী জানান, কুতুবজোমের টার্মিনাল এবং অন্যান্য উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে আগামী কয়েক বছরে দেশে এলএনজি আমদানির সক্ষমতা বাড়বে। আকস্মিক সংকটের সময় শিল্পকারখানায় গ্যাস সরবরাহ ধরে রাখাই এসব উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।

 

২০৩০ সালের মধ্যে ১৫০ কূপ খনন

 

দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন ও সরবরাহ বাড়াতে নতুন কূপ খননের পরিকল্পনাও নিয়েছে সরকার। প্রধানমন্ত্রী জানান, ২০৩০-৩১ সালের মধ্যে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ১৫০টি কূপ খননের পরিকল্পনা রয়েছে।

 

দেশের গ্যাসের নতুন উৎস খুঁজতে বড় পরিসরে ভূকম্পন জরিপও করা হবে। এর মধ্যে ৪ হাজার ৫০০ লাইন কিলোমিটার এলাকায় ২ডি সাইসমিক সার্ভে এবং ৪ হাজার ২০০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় ৩ডি সাইসমিক সার্ভে পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে।

 

সমুদ্রাঞ্চলেও তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সমুদ্রের ২৬টি ব্লকে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের জন্য আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান নিয়োগে ২০২৬ সালের ২৪ মে আন্তর্জাতিক বিডিং রাউন্ড আহ্বান করা হয়েছে। এতে বিড দাখিলের সময়সীমা নভেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।

 

এ ছাড়া স্থলভাগে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ অনশোর মডেল পিএসসি ২০২৬ প্রণয়নের কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে।

 

ভোলার গ্যাস শিল্পে ব্যবহারের উদ্যোগ

 

ভোলার গ্যাস মূল ভূখণ্ডে এনে শিল্পপ্রতিষ্ঠানে সরবরাহের বিষয়েও সম্ভাব্যতা যাচাই করা হচ্ছে। গ্যাস প্রাপ্তি সাপেক্ষে শিল্পপ্রতিষ্ঠানে তা সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।

 

এ ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক অঞ্চল, রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল বা ইপিজেড এবং বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন বা বিসিকের মতো পরিকল্পিত শিল্পাঞ্চলে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।

 

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভোলার গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে মূল গ্যাস সঞ্চালন লাইনে আনতে দীর্ঘ সময় লাগবে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এ কাজে সাত বছর সময় লাগতে পারে। একই সঙ্গে ভোলায় কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনার কথাও তিনি জানান।

 

ছাদে সৌরবিদ্যুতে বাড়তি সুবিধা

 

গ্যাস ও জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে অগ্রাধিকার খাত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। এ জন্য ২০৩০ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

 

ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে উৎসাহ দিতে বিশেষ সুবিধার কথাও জানান তিনি। ২০২৭ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে যেসব গ্রাহক নিজেদের ব্যবহারের পর অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করবেন, তাঁরা পরবর্তী তিন বছর প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের জন্য ১০ টাকা ৫০ পয়সা মূল্য পাবেন।

 

প্রধানমন্ত্রী বলেন, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকারের নেওয়া পদক্ষেপগুলো ইতোমধ্যে দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। সামনে এসব উদ্যোগের আরও সুফল পাওয়া যাবে।

 

প্রকল্পের ব্যয় ও মেয়াদ নিয়েও কঠোরতা

 

সংসদে প্রধানমন্ত্রী সরকারি প্রকল্পের ব্যয় ও মেয়াদ বৃদ্ধির প্রবণতা নিয়েও সরকারের পদক্ষেপের কথা জানান। তিনি বলেন, বিভিন্ন প্রকল্পে ব্যয় ও মেয়াদ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে নানা দুর্বলতা ধরা পড়েছে।

 

এ কারণে নতুন প্রকল্প গ্রহণের আগে নির্ভুল সমীক্ষা করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রস্তুতি দ্রুত শেষ করা এবং বাস্তবায়ন পর্যায়ে নিবিড় তদারকি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

 

আওয়ামী লীগ আমলে নেওয়া মেগাপ্রকল্পগুলোর অতিরঞ্জিত ব্যয় ও দুর্নীতির অভিযোগের তদন্ত চলছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী। কয়েকটি প্রকল্পের তদন্ত ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। বিভিন্ন প্রকল্পের ব্যয় কমিয়ে জনগণ যাতে কম খরচে সর্বোচ্চ সুবিধা পায়, সরকার সে বিষয়টি নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে বলে জানান তিনি।

 

গত ১৭ বছরের দুর্নীতি ও দুঃশাসন নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার যে শ্বেতপত্র প্রকাশ করেছিল, সেটিকে সামনে রেখে বর্তমান সরকার পর্যায়ক্রমে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে বলেও সংসদে জানান প্রধানমন্ত্রী।