নিজস্ব প্রতিবেদক:
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য প্রস্তাবিত নবম পে-স্কেল অনেকটাই চূড়ান্তের পথে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন। সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের ১৮০ দিন পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় তিনি বলেন, নতুন বেতন কাঠামো প্রণয়নের কাজ এগিয়ে গেছে এবং এটি এখন চূড়ান্ত পর্যায়ের দিকে।
সোমবার (১৭ আগস্ট) সকাল ১১টায় প্রধানমন্ত্রীর তেজগাঁও কার্যালয়ের ‘শাপলা’ হলে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং আয়োজিত ওই মতবিনিময় সভায় সরকারের গত ছয় মাসের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড তুলে ধরা হয়। ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার শপথ গ্রহণের ১৮০ দিন পূর্তি উপলক্ষে এ সভার আয়োজন করা হয়।
নবম পে-স্কেল নিয়ে মাহদী আমিন বলেন, “সরকারি কর্মকর্তাদের সুবিধার জন্য নতুন যে পে-স্কেল করা হয়েছে, সেটা অনেকটাই চূড়ান্তের পথে।”
এর আগে রোববার প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এবিএম আব্দুস সাত্তারও নবম পে-স্কেল চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে এবং যেকোনো সময় এর ঘোষণা আসতে পারে বলে জানিয়েছিলেন।
নবম পে-স্কেলের প্রেক্ষাপট
অষ্টম বেতন কমিশনের প্রায় এক যুগ পর ২০২৫ সালের ২৭ জুলাই অন্তর্বর্তী সরকার ২৩ সদস্যের নবম জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করে। সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানকে চেয়ারম্যান করে গঠিত ওই কমিশন চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়।
কমিশন বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রেখে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করেছিল।
এরপর গত ২১ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনিকে সভাপতি করে ১০ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। নবম পে-স্কেল কমিশনের সুপারিশ ও পরবর্তী পর্যায়ের পর্যালোচনার ভিত্তিতে সচিব কমিটির চূড়ান্ত করা খসড়া এখন মন্ত্রিসভায় উপস্থাপনের অপেক্ষায় রয়েছে। মন্ত্রিসভায় অনুমোদন মিললে নবম পে-স্কেল ঘোষণার পথ তৈরি হবে।
‘ভোটের কালি শুকানোর আগেই কাজ শুরু’
সরকারের ছয় মাসের কর্মকাণ্ড তুলে ধরে মাহদী আমিন বলেন, নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সরকার কাজ করে যাচ্ছে। তাঁর দাবি, ভোটের কালি শুকানোর আগেই ইশতেহারে ঘোষিত কর্মসূচির বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে।
তিনি বলেন, ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদ-পরবর্তী ধ্বংসস্তূপের মধ্যে বাংলাদেশকে নতুনভাবে গড়ে তোলার কাজ চলছে।
সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের মধ্যে তিনি অর্থনীতিতে সংস্কার, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন পে-স্কেল প্রণয়ন এবং গণপরিবহন ব্যবস্থায় ২০০টি ইলেকট্রিক বাস আনার উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন।
মাহদী আমিনের ভাষ্য, গত ছয় মাসে সরকারের প্রতি জনগণের অভূতপূর্ব সমর্থন দেখা গেছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক হয়রানিমুক্ত পুলিশ ও প্রশাসন গড়ে তোলা হয়েছে এবং মানুষের বাকস্বাধীনতা ও মানবাধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে।
কৃষক ও অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের জন্য উদ্যোগ
সরকারের জনকল্যাণমূলক কর্মসূচির কথা তুলে ধরে মাহদী আমিন বলেন, প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকেই ১৩ লাখ কৃষক পরিবারের জন্য ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত সুদসহ ঋণ মওকুফ করা হয়েছে। কৃষকদের জন্য ‘কৃষক কার্ড’, নারীদের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’ এবং প্রবাসীদের জন্য ‘প্রবাসী কার্ড’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ইমাম-মুয়াজ্জিন ও অন্যান্য ধর্মীয় গুরুদের সম্মানী ভাতা এবং দেশজুড়ে খাল খনন ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি পুনরুজ্জীবিত করার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
অবসরপ্রাপ্ত এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের পাওনা প্রসঙ্গে মাহদী আমিন বলেন, অবসর ভাতা ও কল্যাণ ট্রাস্টের প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা আগের সরকার লোপাট করে দিয়েছিল। তাঁর দাবি, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকরা ২০২২ সালের পর থেকে তাঁদের প্রাপ্য অর্থ পাননি। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীকে জানানোর পর অর্থের ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং এর ধারাবাহিকতায় দুই দিন আগে একটি অনুষ্ঠানে ২ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে।
শিক্ষা, পরিবহন ও আইন সংস্কার
সরকারের শিক্ষা খাতের উদ্যোগের মধ্যে পাঠ্যক্রমে নতুন বিষয় যুক্ত করা, মেয়েদের স্নাতক পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষা, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মিড-ডে মিল এবং ফ্রি ওয়াইফাই সুবিধার কথা তুলে ধরেন মাহদী আমিন। শিক্ষার্থীদের সংসদে উপস্থিতির সুযোগ এবং ক্রীড়া ও উদ্ভাবনী প্রতিযোগিতা আয়োজনের কথাও জানান তিনি।
এ ছাড়া ঢাকায় ২০০টি ইলেকট্রিক বাস ও এআইভিত্তিক ট্রাফিক ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র।
আইন সংস্কারের ক্ষেত্রে সংসদে রেকর্ড সংখ্যক অধ্যাদেশকে আইনে রূপান্তরের কথা বলেন তিনি। সন্ত্রাসবিরোধী সংশোধিত অধ্যাদেশের মাধ্যমে একটি স্বৈরাচারী রাজনৈতিক সংগঠনকে নিষিদ্ধ করার কথাও তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে।
পররাষ্ট্রনীতি ও বিনিয়োগ
বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে বলে জানান মাহদী আমিন। তাঁর ভাষ্য, গত ছয় মাসে নতজানু পররাষ্ট্রনীতির অবসান হয়েছে এবং সমতা ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, অভ্যন্তরীণ বিষয়ে এখন কারও হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই।
বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে বিনিয়োগবান্ধব নীতিমালা নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় মালয়েশিয়া, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ কোম্পানিগুলোর সঙ্গে আলোচনার কথাও সভায় তুলে ধরা হয়। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে ভ্রমণ সতর্কতার দ্বিতীয় ধাপে উন্নীত করেছে বলে দাবি করেন মাহদী আমিন।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও সরকারের অবস্থান তুলে ধরে তিনি বলেন, রাজনৈতিক হয়রানিমুক্ত পুলিশ ও প্রশাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। বহুল আলোচিত বিভিন্ন মামলার দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়েছে এবং শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে বলেও তিনি জানান।
সরকারের কর্মসূচি বাস্তবায়নের দাবি
মাহদী আমিন বলেন, নির্বাচনী ইশতেহারের পাশাপাশি শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ১৯-দফা, বেগম খালেদা জিয়ার ‘ভিশন ২০৩০’, বিএনপির ২৭-দফা এবং যুগপৎ আন্দোলনের ৩১-দফার আলোকে সরকার কর্মসূচি বাস্তবায়ন শুরু করেছে।
রমজান ও ঈদে কৃত্রিম সিন্ডিকেট রোধ করে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং শ্রমিকদের বেতন-বোনাস নিশ্চিত করার উদ্যোগের কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইংয়ের উদ্যোগে আয়োজিত সভাটি সঞ্চালনা করেন প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী। স্বাগত বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন।
সভায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য রুহুল কবির রিজভী, ইসমাইল জবিউল্লাহ, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলীসহ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার, এসডিজিবিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক অধ্যাপক এস এম আব্দুল আওয়াল এবং প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনিসহ প্রেস উইংয়ের সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন।











