জেলা প্রতিনিধি :
জনবল-সংকটের কারণে স্থবির হয়ে পড়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চল। পাকশী ও লালমনিরহাট রেল বিভাগের অধীনে থাকা ২৭৩টি স্টেশনের মধ্যে ইতো মধ্যে ৬৭টি স্টেশন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। একই সাথে ইঞ্জিন ও বগি সংকটে বন্ধ রয়েছে ৪০টি লোকাল ও মেইল ট্রেন। এছাড়া আন্তঃদেশীয় মৈত্রী, মিতালী ও বন্ধন এক্সপ্রেসের চলাচলও প্রায় ২২ মাস ধরে বন্ধ রয়েছে। এতে বিপাকে পড়েছেন কয়েক লাখ যাত্রী। বন্ধ থাকার কারণে স্টেশন গুলোর মূল্যবান সরঞ্জাম চুরি ও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। পশ্চিমাঞ্চল চিফ অপারেটিং সুপারিনটেনডেন্টের কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলে স্টেশন মাস্টার, সহকারী স্টেশন মাস্টার, প্ল্যাটফরম মাষ্টার, কেবিন স্টেশন মাস্টারের পদ রয়েছে ৯৭৫ জন।
এর মধ্যে কর্মরত রয়েছেন ৩৩৩ জন। স্টেশন মাষ্টার পদ শূন্য রয়েছে ৬৪২টি। গার্ড পদের ২৩৫ জনের মধ্যে কর্মরত রয়েছেন ২০২ জন। গেটকিপার পদে ৬৫৪ জনের মধ্যে আছেন ১৬৩ জন। পয়েন্টসম্যান ৯৩৬ জনের মধ্যে রয়েছেন ৬৫৪ জন । সব মিলিয়ে মোট জনবলের ৫৫ ভাগ শূন্য। পাকশী রেলওয়ে বিভাগ ও লালমনিরহাট রেলওয়ে বিভাগের পরিবহণ কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জনবল সংকটের কারণে পশ্চিমাঞ্চলের পাকশী বিভাগের ৫৬টি পুরোপুরি ও ২টি স্টেশন আংশিক বন্ধ। আর লালমনিরহাট বিভাগে বন্ধ ১১টি স্টেশন। পাকশী বিভাগের ৮টি মেইল, ৭টি লোকাল ট্রেন এবং লালমনিরহাট বিভাগের ১১ টি মেইল, কমিউটার ও ১৪টি লোকাল ট্রেন বন্ধ রয়েছে। এছাড়া ঈশ্বরদী-ঢাকা রেলরুটের গুয়াখাড়া ও গফুরাবাদ স্টেশনটি দুই দশকের বেশি সময় ধরে বন্ধ রয়েছে। এই দুই স্টেশন পাবনার চলনবিল এলাকায় অবস্থিত। চলনবিলসহ আশ পাশের উপজেলার কৃষিপণ্য ও মাছ এই দুই রেলস্টেশন দিয়ে পাঠানো হতো সারা দেশে। স্টেশন দুটি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় পরিত্যক্ত পড়ে থাকায় বেদখল হয়ে গেছে রেল কর্মচারীদের বাসভবন, প্লাটফর্মসহ রেলের বিপুল সম্পত্তি। ফাটল দেখা দিয়েছে স্টেশন ভবনেও।গফুরাবাদ স্টেশন এলাকার বাসিন্দা আমজাদ হোসেন বলেন, ব্রিটিশ আমলে নির্মিত এ স্টেশন আগে বেশ ভালো অবস্থায় ছিল।
কিন্তু এখন এটি রক্ষণাবেক্ষণে কেউ নেই। স্টেশনটিতে নেই স্টেশন মাস্টারও। যখন চালু ছিল, তখন স্টেশনটি দিয়ে একটি লোকাল ট্রেন চলাচল করত। গুয়াখাড়া স্টেশনও বন্ধ আছে দীর্ঘদিন ধরে। কৃষিপণ্য বিপণনসহ নানা কারণে এলাকার মানুষকে যেতে হচ্ছে দূরের স্টেশনে। এতে খরচ ও ভোগান্তি বেড়েছে। গুয়াখাড়া স্টেশন এলাকার বাসিন্দা আনিসুর রহমান বলেন, বিল ও বাঁওড় থাকায় এখানে মাছের চাষ হয়। স্টেশনটি বন্ধ থাকায় সেই মাছ বিপণন করতে পারছেন না তারা। রাজশাহীর চারঘাটের নন্দনগাছি স্টেশন এক যুগের বেশি সময় ধরে বন্ধ রয়েছে। নন্দনগাছি বাজার কমিটির সাবেক সভাপতি আবুল কালাম আজাদ বলেন, এক সময়ের ব্যস্ততম স্টেশনটির কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।
জনবলহীন একেবারে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে এই স্টেশনের বিল্ডিং। স্টেশন মাস্টার কোনো কর্মচারী না থাকায় অকেজো হয়ে পড়ে আছে স্টেশন এর লুপ লাইনের মিটারসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি। দিনে মহানন্দা নামে একটি লোকাল ট্রেন যাত্রা বিরতি দিলেও প্লাটফর্ম না থাকায় অনেকটা কষ্ট ও ঝুকি নিয়ে ট্রেন এর বগিতে উঠানামা করতে হয়। উঠতে গিয়ে অনেক সময় ভোগান্তিতে পড়তে হয়। নারী, বৃদ্ধ এমনকি শিশুদের। অথচ এক সময় মহানন্দা, উত্তরা, ৬৪ আড়াই ট্রেন নামে ৩টি ট্রেন এই স্টেশনে নিয়মিত যাত্রবিরতি করতো। নন্দনগাছী নিমপাড়া ইউনিয়ন চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বলেন, চাকুরি, ব্যবসা, চিকিৎসাসহ বিভিন্ন কাজে প্রায় কয়েক হাজার মানুষ রাজশাহী, নাটোরসহ বিভিন্ন জেলায় যাতায়াত করে। স্টেশনটি বন্ধ থাকায় প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে গিয়ে রাজশাহী অথবা নাটোর স্টেশন থেকে ট্রেন এ চেপে গন্তব্যস্থলে যেতে হচ্ছে। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় এই এলাকার সাধারণ মানুষ ভোগান্তির শিকার হচ্ছে। শুধু গুয়াখড়া, গুফুরাবাদ ও নন্দনগাছীই নয়, জনবল সংকটে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ পশ্চিমাঞ্চল রেলের ৬৭টি স্টেশন।
এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন এ অঞ্চলের কয়েক লাখ যাত্রী। তাদের অভিযোগ, স্টেশন বন্ধ থাকায় ব্যাহত হচ্ছে কৃষি পণ্য বিপণন ও ব্যবসা বাণিজ্য। এ ছাড়া, দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত থাকায় বেদখল হয়ে যাচ্ছে স্টেশনের শত কোটি টাকার সম্পদ। পাকশী রেলওয়ে বিভাগের পরিবহণ কর্মকর্তা হাসিনা বেগম বলেন, স্টেশন বন্ধের মূল কারণ হলো, জনবল সংকট। আর ট্রেন বন্ধ হয়েছে লোকোমোটিভ (ইঞ্জিন), বগি সংকট থাকায়। পাশা পাশি লোকবল সংকটতো রয়েছেই। লালমনিরহাট রেলওয়ে বিভাগের পরিবহণ কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, জনবল সংকটের কারণে স্টেশন ও কিছু ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে। রেলওয়েতে নতুন লোকবল নিয়োগের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।লোকবল সংকট কেটে গেলে কিছু স্টেশন চালু ও ট্রেন চলাচল শুরু হতে পারে। পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের অ্যাসিস্ট্যান্ট চিফ অপারেটিং সুপারিনটেনডেন্ট মো. আব্দুল আওয়াল বলেন, রেলের লোকবল সংকট রয়েছে। এজন্য কিছু স্টেশন ও ট্রেন বন্ধ রয়েছে।











