নিজস্ব প্রতিবেদক:
দেশে গত জুন মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় ৪৬৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে আহত হয়েছেন এক হাজার ৩২৩ জন। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্য অনুযায়ী, মাসজুড়ে সারাদেশে ৫৩২টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগজনক ছিল মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা, যা মোট দুর্ঘটনার প্রায় এক তৃতীয়াংশ।
মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি তাদের মাসিক দুর্ঘটনা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। দেশের জাতীয় ও আঞ্চলিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে সংগঠনটির দুর্ঘটনা মনিটরিং সেল এ প্রতিবেদন তৈরি করেছে। তবে সংগঠনটির দাবি, অনেক দুর্ঘটনার খবর প্রকাশ না পাওয়ায় প্রকৃত হতাহতের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুনে ১৭২টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৭৩ জন নিহত এবং ১৩২ জন আহত হয়েছেন। এটি মোট সড়ক দুর্ঘটনার ৩২ দশমিক ৩৩ শতাংশ। নিহতদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রয়েছেন বিভিন্ন পরিবহনের ১১১ জন চালক। এছাড়া ৭১ জন পথচারী, ৬০ জন শিক্ষার্থী, ৪৭ জন শিশু, ৪৫ জন নারী, ১১ জন পরিবহন শ্রমিক, ১০ জন শিক্ষক এবং ৯ জন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী রয়েছেন। নিহতদের মধ্যে দুইজন পুলিশ সদস্য, একজন সেনাসদস্য এবং একজন প্রকৌশলীও আছেন।
শুধু সড়ক নয়, জুন মাসে রেল ও নৌপথেও দুর্ঘটনা ঘটেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রেলপথে ৫৩টি দুর্ঘটনায় ৪৫ জন নিহত ও ৮ জন আহত হয়েছেন। আর নৌপথে ৫টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৫ জন, আহত হয়েছেন আরও ৫ জন। সব মিলিয়ে সড়ক, রেল ও নৌপথে জুনে ৫৯০টি দুর্ঘটনায় ৫১৩ জনের মৃত্যু এবং এক হাজার ৩৩৬ জন আহত হয়েছেন।
বিভাগভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, জুনে সবচেয়ে বেশি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে চট্টগ্রাম বিভাগে। সেখানে ১২৮টি দুর্ঘটনায় ১২৬ জন নিহত এবং ৩৭৩ জন আহত হয়েছেন। অন্যদিকে সবচেয়ে কম দুর্ঘটনা ঘটেছে ময়মনসিংহ বিভাগে। এ বিভাগে ২৫টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ২৬ জন।
দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণ করে যাত্রী কল্যাণ সমিতি জানিয়েছে, মোট দুর্ঘটনার ৪৩ দশমিক ২৩ শতাংশ ছিল মুখোমুখি সংঘর্ষ। এছাড়া ২৭ দশমিক ৬৩ শতাংশ পথচারীকে গাড়িচাপা বা ধাক্কা দেওয়ার ঘটনা, ২০ দশমিক ৬৭ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে যাওয়া এবং ৭ দশমিক ১৪ শতাংশ অন্যান্য কারণে ঘটেছে।
স্থানভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৪৪ দশমিক ৭৩ শতাংশ দুর্ঘটনা জাতীয় মহাসড়কে, ২৮ দশমিক ৩৮ শতাংশ আঞ্চলিক মহাসড়কে এবং ২০ দশমিক ৬৭ শতাংশ ফিডার সড়কে ঘটেছে। এছাড়া ৪ দশমিক ১৩ শতাংশ দুর্ঘটনা ঢাকা মহানগরীতে, শূন্য দশমিক ৯৩ শতাংশ চট্টগ্রাম মহানগরীতে এবং ১ দশমিক ১২ শতাংশ রেলক্রসিংয়ে সংঘটিত হয়েছে।
জুন মাসে দুর্ঘটনায় জড়িত ৭৯৫টি যানবাহনের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিল মোটরসাইকেল, যার হার ২৬ দশমিক ৭৯ শতাংশ। এরপর রয়েছে ট্রাক, পিকআপ, কাভার্ডভ্যান ও লরি, বাস, ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক, সিএনজিচালিত অটোরিকশাসহ অন্যান্য যানবাহন।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, “সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি কমাতে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় ও বিআরটিএকে আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থার পরিবর্তে দেশি ও বিদেশি পরিবহন বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে পরিচালনা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর সড়ক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, ই প্রসিকিউশন চালু এবং যাত্রীদের মধ্যে ব্যাপক সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।”
প্রতিবেদনের শেষাংশে জাতীয় মহাসড়কে মোটরসাইকেল ও ধীরগতির যানবাহনের অবাধ চলাচল, অদক্ষ চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, ট্রাফিক আইন অমান্য, সড়ক অবকাঠামোর ত্রুটি, বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো এবং সড়কে চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন কারণকে দুর্ঘটনার জন্য দায়ী করা হয়েছে। একই সঙ্গে এসব সমস্যা মোকাবিলায় সড়ক নিরাপত্তা জোরদারে একাধিক সুপারিশও তুলে ধরেছে সংগঠনটি।











