জ্বালানি নিরাপত্তায় বেশি মূল্যে কেনা হচ্ছে বিপুল পরিমাণ এলএনজি

নিজস্ব প্রতিবেদক:

দেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় বেশি মূল্যে কেনা হচ্ছে বিপুল পরিমাণ এলএনজি। স্পট মার্কেট থেকে ওই এলএনজি কেনা হবে। আগামী আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ৫ মাসে ওই এলএনজি কেনা হবে ১০টি কোম্পানির কাছ থেকে। সরকার টু সরকার চুক্তির আওতায় ওই এলএনজি কিনছে জ্বালানি বিভাগ। সেক্ষেত্রে প্রতি ইউনিট এলএনজির দর ১৭ থেকে ১৯ ডলার দেয়া হয়েছে। ফলে দীর্ঘ মেয়াদে চুক্তির চেয়ে এলএনজি কিনতে বাংলাদেশকে ৫০ শতাংশ বেশি দাম গুনতে হবে। জ্বালানি বিভাগ সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

 

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, পেট্রোবাংলা এবং রাষ্ট্রীয় সংস্থা রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি (আরপিজিসিএল) ১০টি কোম্পানির কাছ থেকে এলএনজি কেনার প্রস্তাব নিয়েছে। ইতিমধ্যে এলএনজি সরবরাহকারী ১০ প্রতিষ্ঠানই দর দিয়েছে। যদিও এখনো ওই দর চূড়ান্ত হয়নি। তবে দর নিয়ে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির সঙ্গে সমঝোতা করা হবে। তারপর তাদের প্রস্তাব চূড়ান্ত করা হবে। যদিও স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কারণ বর্তমান মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি কারণে এলএনজির দাম এখন চড়া। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের সমঝোতার মাধ্যমে যুদ্ধ বন্ধ হলে অনেক কমতে পারে এলএনজির বাজার। গত জুন মাসেও এমন ঘটেছে। ওই সময়ে ১৮-১৯ ডলারের এলএনজি ১৫-১৬ ডলারে নেমে এসেছিলো।

 

সূত্র জানায়, বর্তমানে দেশে দৈনিক সরবরাহ দেয়া হয় ২৬৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস। তার মধ্যে আমদানি করা ১০৫ কোটি ঘনফুটের বেশি হচ্ছে এলএনজি। জাতীয় গ্রিডে ওই গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে পেট্রোবাংলা প্রতি মাসে ১০টির বেশি এলএনজি কার্গো আমদানি করে। আর আগামী ৫ মাসে ৫০টির বেশি এলএনজি কার্গো প্রয়োজন। তার মধ্যে পেট্রোবাংলা দীর্ঘ মেয়াদে চুক্তির আওতায় প্রতি মাসে ৪টি থেকে ৫টি কার্গো পেতে পারে। মূলত স্পট মার্কেট থেকে একসঙ্গে বেশি করে এলএনজি কিনলে সস্তায় পাওয়ার সম্ভাবনা থেকেই জি-টু-জি নীতিমালার আওতায় বিভন্ন সরবরাহকারীকে প্রস্তাব দিতে বলা হয়। তার মধ্যে ৫ মাসের বিভিন্ন সময়ে এলএনজি সরবরাহের আগ্রহ দেখিয়ে ভিটল, ইউএসএ, টোটাল এনার্জি, ইউকে, হানবোর ইউএসএ, গানবোর সিঙ্গাপুর, এমিরাতস ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি, সিঙ্গাপুর প্রাইভেট কোম্পানি, অরচার এনার্জি ও সিকার ইন্টারন্যাশনাল যৌথ কোম্পানি, এডনক ট্রেডিং, আইআরএইচ গে­াবাল ট্রেডিং ও সরকার ট্রেডিং ইতিমধ্যে অনলাইনে দরপত্র জমা দিয়েছে। আর তাদের প্রস্তাবের মূল কপি কুরিয়ারের মাধ্যমে পেট্রোবাংলার কাছে পাঠানো হয়েছে। কোম্পানিগুরো ১৭ থেকে ১৯ ডলার পর্যন্ত দর দিয়েছে। যদিও স্পট মার্কেটে এখন প্রতি ইউনিট ২০ ডলারের বেশি চলছে। প্রতি কার্গো এলএনজি আমদানি করতে সরকারকে ৬৫০ থেকে ৭০০ কোটি টাকা ব্যয় হয়। ওই হিসাবে ৩০ কার্গোর জন্য এলএনজি আমদানি করতে ২০ হাজার কোটি টাকার বেশি খরচ হতে পারে।

 

সূত্র আরো জানায়, জি-টু-জির আওতায় ৫ মাসের স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি সরবরাহ দিতে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল ১৮টি কোম্পানির কাছে। তার মধ্যে ১০টি কোম্পানি সাড়া দিয়েছে। এখন ওই ১০ কোম্পানির সঙ্গে দাম নিয়ে দরকষাকষি করা হবে। তবে সরকারের একটি পক্ষ স্পট মার্কেট থেকে এভাবে একসঙ্গে এলএনজি কেনার পক্ষে নয়। কারণ যুদ্ধ থেমে গেলে ওই এলএনজির দাম কমতে পারে। এখন ১০ কোম্পানির সঙ্গে ৫ মাসের জন্য চুক্তি হলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও বেশি দামেই কিনতে হবে এলএনজি। যদিও দীর্ঘ মেয়াদে চুক্তির আওতায় প্রতি মাসে ৪-৫টি কার্গো এলএনজি কিনছে সরকার। ওই এলএনজির দাম অনেক কম। সর্বশেষ দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার এনার্জি থেকে প্রতি ইউনিটে এলএনজি কিনে মাত্র ১৩ দশমিক ৭২ ডলারে। যুদ্ধের আগে বেশির ভাগ কাতার, ওমান এবং মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির কাছ থেকে এলএনজি কেনা হতো। কিন্তু যুদ্ধের ফলে কাতার, ওমান এবং এক্সিলারেট এনার্জি ফোর্স শাটডাউন দিয়ে দেয়। তার মধ্যে কাতার এনার্জি কিছুটা সরবরাহ দিলেও বাকিরা এখনো দিতে পারছে না। সমপ্রতি কাতার এনার্জি জানিয়েছে, যুদ্ধে তাদের গ্যাসক্ষেত্র দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এমন পরিস্থিতি যুদ্ধ বন্ধ হলে আগামী ৫ বছর তারা আগের চেয়ে ৫০ শতাংশ এলএনজি সরবরাহ কম দিতে পারবে। চুক্তির আওতায় বাকিরা কবে নাগাদ এলএনজি সরবরাহ শুরু করবে তা এখনো অনিশ্চিত। আর ওই কারণে বাংলাদেশকে এখন স্পট মার্কেটের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। তাতে করে দীর্ঘ মেয়াদে চুক্তির চেয়ে ৫০ শতাংশ বেশি দামে এলএনজি বাংলাদেশকে কিনতে হচ্ছে। গত বছর সরকার ৪৫ হাজার কোটি টাকার এলএনজি আমদানি করে। আর এ বছর ওই খরচ ৬৫ হাজার কোটি টাকায় গিয়ে দাঁড়াতে পারে।