জ্যামিতিক হারে বাড়ছে সরকারের ঋণ গ্রহণের প্রবণতা

নিজস্ব প্রতিবেদক:

রাজস্ব আদায়ের সীমিত সক্ষমতায় জ্যামিতিক হারে বাড়ছে সরকারের ঋণ গ্রহণের প্রবণতা। ফলে ক্রমেই বাড়ছে সরকারের ঋণের বোঝা। আর এ ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী ৩ বছরে সরকারের ঋণ দাঁড়াবে প্রায় ৩৪ লাখ কোটি টাকা। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে দেশের মোট সরকারি ঋণের পরিমাণ ছিল ২৩ লাখ কোটি টাকারও বেশি। আর মাত্র এক মাসের ব্যবধানে মার্চ শেষে তা বেড়ে পৌঁছেছে প্রায় ২৪ লাখ কোটি টাকায়। অথচ সুষম সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনাই হচ্ছে একটি দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার অন্যতম প্রধান শর্ত। কিন্তু সামপ্রতিক বছরগুলোয় বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের বিরাট অসংগতি বিরাজ করছে। সরকারের রাজস্ব আদায়ের পরিধি ও সক্ষমতা সীমিত হওয়ায় অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উভয় উৎস থেকেই ঋণ গ্রহণের প্রবণতা বাড়ছে। তাতে বেসরকারি খাতের বিকাশ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করছে। অর্থ বিভাগ সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে,  সরকারের ২০২৬-২৭ অর্থবছর শেষে মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়াবে ২৬ লাখ ৩৩ হাজার ১০০ কোটি টাকা। পরবর্তী অর্থবছরে তা আরো বেড়ে ২৯ লাখ ৫৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকা হবে এবং তিন বছর পর অর্থাৎ ২০২৮-২৯ অর্থবছর শেষে ওই ঋণ স্থিতি দাঁড়াবে ৩৩ লাখ ৭৭ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। ওই বিশাল ঋণের মধ্যে ১৮ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা অভ্যন্তরীণ উৎসের অবদান থাকবে এবং বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ দাঁড়াবে ১৪ লাখ ৯৭ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। ফলে স্বাভাবিকভাবেই সরকারের সুদ পরিশোধের ব্যয়ও বহুগুণ বাড়বে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরকারকে সুদ বাবদ ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হবে। আর মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে ২০২৮-২৯ অর্থবছরে ওই ব্যয় বেড়ে ১ লাখ ৬২ হাজার ৭০০ কোটি টাকায় দাঁড়াবে। অর্থাৎ বাজেটের একটি বড় অংশই বিগত বছরগুলোর ঋণের মাশুল গুনতে চলে যাবে। তাতে সংকুচিত হয়ে পড়বে উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের বরাদ্দ।

সূত্র জানায়, সরকারের ঋণ বাড়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে রাজস্ব আদায়ের ধীরগতি। গত পাঁচ অর্থবছরে রাজস্ব আয় মাত্র ৩৫ শতাংশ বাড়লেও ঋণের পরিমাণ বেড়েছে ৪২ শতাংশ। ফলে করের টাকায় সরকারের পুরো পরিচালন ব্যয় মেটানো তো দূরের কথা, বেতন-ভাতা, পেনশন ও সুদের টাকা পরিশোধের পর কৃচ্ছ্রসাধন করেও ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। এ অবস্থায় বাধ্য হয়ে সরকার স্থানীয় ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। আর সরকার যখন নিজের ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নেয়, তখন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো বেসরকারি খাতে ঋণ দিতে উৎসাহ হারিয়ে ফেলে। যার প্রত্যক্ষ প্রভাব বেসরকারি বিনিয়োগ, শিল্পায়ন ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর পড়ে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে মন্থর করে দেয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি। বর্তমানে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি বাংলাদেশ। অতীতে নেয়া অনেক মেগা প্রকল্পের গ্রেস পিরিয়ড বা রেয়াতকাল শেষ হয়ে আসায় এখন মূল ও সুদ একসঙ্গে পরিশোধ করতে হচ্ছে। আর এমন পরিস্থিতির ডলারের বিপরীতে টাকার ধারাবাহিক অবমূল্যায়ন ঝুঁকি আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। কারণ বাংলাদেশে বাস্তবায়িত অধিকাংশ অবকাঠামো প্রকল্প স্থানীয় মুদ্রায় আয় করে। কিন্তু ডলারের দাম বাড়ার কারণে ঋণ পরিশোধের প্রকৃত বোঝা প্রাক্কলনের চেয়ে অনেক বেশি হচ্ছে।

এদিকে আগামী তিন অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের যে প্রক্ষেপণ করা হয়েছে তাতে সরকারকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৩৭৭ কোটি ৮০ লাখ ডলার, ২০২৭-২৮ অর্থবছরে ৪২৩ কোটি ৮০ লাখ ডলার ও ২০২৮-২৯ অর্থবছরে ৪২৭ কোটি ৬০ লাখ ডলারের ঋণ পরিশোধ করতে হবে। সরকারের অর্থায়নের ক্ষেত্রে বৈদেশিক ঋণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু ওই ঋণের পরিশোধ সক্ষমতার নির্ভর করে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের অবস্থান। সেক্ষেত্রে যদি টাকার অবমূল্যায়ন হয় এবং বৈদেশিক ঋণে বাস্তবায়িত প্রকল্পগুলো থেকে আয় মূলত টাকায় আসে, তাহলে ঋণ পরিশোধের প্রকৃত বোঝা আরো বেড়ে যায়। কারণ অধিকাংশ প্রকল্পই সরাসরি বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে না।

অব্যদিকে সরকারের ঋণনিভ কমানোর প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি স্বীকার  করে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে জানান, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রোগ্রামিং ও বাজেট কাঠামো এখন একটি পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘদিনের প্রচলিত বাজেট পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে এসে বৈশ্বিক বাস্তবতা ও নতুন অর্থনৈতিক চিস্তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি কাঠামোর দিকে অগ্রসর হওয়ার প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছে। কারণ বিশ্ব অর্থনীতির ধরন, বিনিয়োগের পোর্টফোলিও এবং বিনিয়োগের মানদণ্ড দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। এ বাস্তবতায় দেশের পাবলিক ফাইন্যান্সের বিদ্যমান আর্কিটেকচারেও পরিবর্তন আনা জরুরি।