ডলারনির্ভর ক্যাপাসিটি চার্জ কমাতে রূপপুর হতে পারে বড় সুযোগ

জাভেদ হোসেন :

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র দ্রুত বাণিজ্যিক উৎপাদনে আনতে পারলে দেশের বিদ্যুৎ খাতের ব্যয়বহুল চুক্তি পুনর্বিবেচনা এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় কমানোর ক্ষেত্রে বড় সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে ডলারের সঙ্গে সংযুক্ত ক্যাপাসিটি চার্জনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সরকার অপ্রয়োজনীয় চুক্তি থেকে সমঝোতার ভিত্তিতে বেরিয়ে আসতে এবং প্রয়োজনীয় কেন্দ্রগুলোর ক্ষেত্রে আরও অনুকূল শর্ত আদায় করতে পারে। এতে শুধু বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়বে না, বরং সরকারি অর্থের অপচয়, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ এবং শিল্প উৎপাদনের ব্যয় কমানোর পথও তৈরি হতে পারে।

বাংলাদেশে শীতকালে বিদ্যুতের চাহিদা তুলনামূলক কম থাকে। এ সময়টিকে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সঙ্গে চুক্তি পুনর্বিন্যাস ও আর্থিক সমঝোতার জন্য কাজে লাগানো যেতে পারে। তবে রূপপুরের বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরুতে বিলম্ব হলে আগামী গ্রীষ্মে বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধির সময় সরকারকে বাড়তি চাপের মুখে পড়তে হতে পারে। একই সঙ্গে নতুন পারমাণবিক বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হলেও পুরোনো তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর জন্য নির্ধারিত অর্থ পরিশোধ অব্যাহত থাকলে বিদ্যুৎ খাতের সামগ্রিক ব্যয় প্রত্যাশিত মাত্রায় কমবে না।

সরকারের জন্য মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত, অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতাকে ব্যবহার করে আবাসিক গ্রাহক, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও জাতীয় বাজেটের ওপর বিদ্যুৎ খাতের ব্যয়ভার কমানো।

বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তি পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজন

বিদ্যুৎ খাত নিয়ে সরকারের উদ্যোগে তৈরি শ্বেতপত্রে ২০১০ সালের বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইনের আওতায় অনুমোদিত ৪১টি স্বতন্ত্র বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের (আইপিপি) চুক্তি চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব চুক্তির আওতায় মোট ৬ হাজার ৩০৮ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে। অন্যদিকে, জাতীয় পর্যালোচনা কমিটির হিসাবে অতিরিক্ত ক্যাপাসিটি চার্জের কারণে বাংলাদেশকে বছরে সর্বোচ্চ ১৫০ কোটি ডলার পর্যন্ত ব্যয় বহন করতে হতে পারে। এটি কমিটির একটি প্রাক্কলন, আদালতে প্রমাণিত বা আদায়যোগ্য অর্থের পরিমাণ নয়। তবে বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক চাপ মোকাবিলায় বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

চুক্তিগুলো মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সরকারকে দুটি শ্রেণির মধ্যে পার্থক্য করতে হবে। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রে ন্যায্যতা, মূল্য নির্ধারণ ও বিনিয়োগকারীদের আস্থার বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হবে। চাহিদা পরিবর্তনের কারণে এসব কেন্দ্র আর্থিকভাবে অকার্যকর হয়ে পড়লে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে স্বেচ্ছামূলক বাণিজ্যিক সমঝোতার মাধ্যমে সমাধান খোঁজা যেতে পারে।

অন্যদিকে, ২০১০ সালের বিশেষ আইনের আওতায় প্রতিযোগিতামূলক আন্তর্জাতিক দরপত্র ছাড়াই অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর চাহিদা নিরূপণ, মূল্য নির্ধারণ, মালিকানা এবং ঝুঁকি বণ্টন আরও কঠোরভাবে পরীক্ষা করা প্রয়োজন। ২০২৪ সালের নভেম্বরে আইনটি বাতিল হলেও এর অধীনে করা চুক্তিগুলোর দায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে শেষ হয়ে যায়নি। একইভাবে, বিশেষ আইনের আওতায় চুক্তি করা হয়েছিল বলেই কোনো প্রকল্পে দুর্নীতি হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছানো যাবে না। প্রকৃতপক্ষে প্রকল্পগুলো জাতীয় গ্রিডের প্রয়োজন মিটিয়েছে কি না এবং যুক্তিসংগত ব্যয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ করেছে কি না, তা যাচাই করতে হবে।

যেসব চুক্তি অব্যাহত রাখলে জাতীয় স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে প্রমাণ পাওয়া যাবে, সেগুলোর ক্ষেত্রে নিট আর্থিক সাশ্রয় নিশ্চিত হলে পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে চুক্তি বাতিলের বিষয়টি অগ্রাধিকার পেতে পারে। আর যেসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রয়োজন রয়েছে, সেগুলোর নির্ধারিত চার্জ, বৈদেশিক মুদ্রার সঙ্গে মূল্য সমন্বয় এবং অর্থ পরিশোধের কাঠামো পুনর্বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে যেকোনো সমঝোতার আগে বকেয়া বিল, ঋণের দায়, ঋণদাতাদের সম্মতি, ক্ষতিপূরণ এবং বিকল্প বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যয় হিসাব করা জরুরি। অন্যথায় ব্যয় কমানোর উদ্যোগ থেকেই নতুন আর্থিক দায় তৈরি হতে পারে।

পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা

বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তি পুনর্বিন্যাসে পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য প্রাসঙ্গিক হতে পারে। ২০২৪ সালের অক্টোবরে দেশটি মোট ২ হাজার ৪৬৩ মেগাওয়াট সক্ষমতার পাঁচটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে আগাম চুক্তি সমাপ্তির বিষয়ে সমঝোতা করে। সংশ্লিষ্ট ঘোষণায় এসব চুক্তির অবশিষ্ট মেয়াদে ৪১১ বিলিয়ন পাকিস্তানি রুপি সাশ্রয়ের কথা বলা হয়েছিল। এটি পুরো চুক্তির অবশিষ্ট সময়ের সম্ভাব্য সাশ্রয়, বার্ষিক সাশ্রয় নয়।

এরপর ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে পাকিস্তানের মন্ত্রিসভা আরও ১৪টি স্বতন্ত্র বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশোধিত চুক্তি অনুমোদন করে। এ ক্ষেত্রে বছরে ১৩৭ বিলিয়ন পাকিস্তানি রুপি সাশ্রয়ের প্রাক্কলন দেওয়া হয়েছিল। দুটি ঘোষণা ভিন্ন সময়ের এবং ভিন্ন ধরনের সাশ্রয়ের হিসাব তুলে ধরে। তাই এগুলোকে সরাসরি যোগ করে মোট সাশ্রয়ের পরিমাণ নির্ধারণ করা ঠিক হবে না।

পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা আরও দেখিয়েছে, চুক্তি সংশোধন মানেই সব ধরনের ক্যাপাসিটি পেমেন্ট বাতিল করা নয়। দেশটির নিশাত পাওয়ারের সংশোধিত ব্যবস্থায় ইকুইটি বিনিয়োগের মুনাফার একটি অংশ নির্দিষ্ট পারিশ্রমিক হিসেবে রাখা হয়েছিল এবং অতিরিক্ত প্রাপ্যতার একটি অংশ উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছিল। অর্থাৎ, সেখানে সম্পূর্ণ ক্যাপাসিটি পেমেন্ট তুলে দেওয়ার পরিবর্তে মিশ্র পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়েছিল। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও চুক্তির নাম পরিবর্তনের চেয়ে প্রকৃত মূল্য নির্ধারণের কাঠামো, দায় এবং অর্থ পরিশোধের শর্ত পুনর্বিবেচনা করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

ডলারের সঙ্গে মূল্য সমন্বয়ে বাড়ছে ব্যয়

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে ডলারের সঙ্গে সংযুক্ত ব্যয় একটি বড় আর্থিক ঝুঁকি তৈরি করেছে। টাকার অবমূল্যায়নের ফলে ডলারে নির্ধারিত স্থির অর্থ পরিশোধের দায়ও দেশীয় মুদ্রায় বেড়েছে। ২০২১ সালের জুনের শেষে প্রতি ডলারের বিনিময় হার ছিল ৮৪ টাকা ৮০ পয়সা, যা ২০২৫ সালের জুনের শেষে বেড়ে ১২২ টাকা ৭৭ পয়সায় দাঁড়ায়। ফলে ডলারে অপরিবর্তিত কোনো দায়ের টাকায় মূল্য বেড়েছে প্রায় ৪৪ দশমিক ৮ শতাংশ। এর সঙ্গে মূল্যস্ফীতির সমন্বয় যুক্ত হলে ব্যয় আরও বাড়তে পারে, অথচ এতে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ পাওয়া যায় না।

এ কারণে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর চুক্তি পুনর্বিন্যাসের সময় অযৌক্তিক ডলার-নির্ভর মূল্য সমন্বয় কমানো বা বাতিল করার বিষয়টি গুরুত্ব পাওয়া উচিত। বিশেষ করে যেসব ব্যয় প্রকৃতপক্ষে দেশীয় মুদ্রায় হয়, সেগুলোর বিপরীতে ডলারের ভিত্তিতে অর্থ পরিশোধের শর্ত থাকলে তা বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক চাপ বাড়াতে পারে।

সিএলসির একটি চুক্তির উদাহরণে দেখা যায়, প্রথম ১০ বছরের ক্যাপাসিটি ট্যারিফে ডলারে নির্ধারিত কিছু উপাদান টাকায় রূপান্তর করে হিসাব করা হয়। মূল্যস্ফীতির সমন্বয় অপরিবর্তিত ধরে ১০৮ মেগাওয়াট সক্ষমতার ভিত্তিতে করা একটি উদাহরণমূলক হিসাবে, আগের বিনিময় হারে বার্ষিক ক্যাপাসিটি চার্জ দাঁড়ায় ১২৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা। পরবর্তী বিনিময় হারে একই হিসাবের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ১৭৬ কোটি ২০ লাখ টাকা। অর্থাৎ, শুধু বিনিময় হার পরিবর্তনের কারণে বার্ষিক ব্যয় বেড়েছে ৫১ কোটি ৪০ লাখ টাকা, যার বিপরীতে অতিরিক্ত কোনো উৎপাদন সক্ষমতা পাওয়া যাচ্ছে না। তবে এটি চুক্তির শর্তের ভিত্তিতে করা মডেল হিসাব, সিএলসির প্রকৃত বিলের তথ্য নয়।

চুক্তিতে ডলারে নির্ধারিত ব্যয়ের সঙ্গে আন্তর্জাতিক মূল্যস্ফীতির সমন্বয় যুক্ত থাকলে বিনিময় হারজনিত ব্যয়ের পাশাপাশি অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) উচিত প্রতিটি কেন্দ্রের ঋণ কাঠামো, প্রকৃত বৈদেশিক ব্যয় এবং দেশীয় মুদ্রায় হওয়া ব্যয় নিরীক্ষা করা। এরপর দেশীয় ব্যয়ের অংশে টাকাভিত্তিক মূল্য নির্ধারণের জন্য আলোচনা করা যেতে পারে। তবে কোনো প্রতিষ্ঠানের মালিকানা দেশীয় হলেই তার সব অর্থায়ন টাকায় হয়েছে, এমন ধরে নেওয়া যাবে না। একইভাবে, বর্তমান বিনিময় হার ধরে মূল্য রূপান্তর স্থির করলেও আগের ব্যয়বৃদ্ধি নিজে থেকে দূর হবে না। প্রকৃত সাশ্রয়ের জন্য ভিত্তিমূল্য ও অর্থ পরিশোধের শর্ত নিয়ে নতুন সমঝোতা প্রয়োজন হতে পারে।

চুক্তি ব্যবস্থাপনায় সতর্কতা জরুরি

চুক্তি পুনর্বিন্যাসের ক্ষেত্রে শুধু মূল্য নির্ধারণ নয়, চুক্তির অন্যান্য শর্তও সতর্কভাবে পর্যালোচনা করতে হবে। সিএলসির চুক্তির ১৩.২(j) ধারায় নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে নির্ধারিত তারিখের পর ১০ কর্মদিবসের বেশি সময় যোগ্য বিল অপরিশোধিত থাকলে বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম স্থগিত করার সুযোগ রয়েছে। ওই স্থগিতাবস্থায়ও ক্যাপাসিটি পেমেন্ট চালু থাকতে পারে। ধারাটিতে স্থগিতাদেশের আগে পৃথক নোটিশ দেওয়ার স্পষ্ট বাধ্যবাধকতা নেই বলে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি, বিলম্বে কোনো শর্ত প্রয়োগ করা হলে তা থেকে সংশ্লিষ্ট অধিকার পরিত্যাগ হয়েছে—এমন দাবি ঠেকানোর ব্যবস্থাও রয়েছে।

এ কারণে কৌশলগতভাবে বিল পরিশোধ বন্ধ রাখা দর-কষাকষির কার্যকর পদ্ধতি নাও হতে পারে। বরং বিপিডিবির উচিত বিল, বিরোধপূর্ণ দাবি, পরিশোধের রেকর্ড, পরীক্ষিত উৎপাদন সক্ষমতা এবং পরিচালনসংক্রান্ত তথ্য যাচাই করে আলোচনায় বসা। এতে প্রকৃত দায় নির্ধারণ এবং আইনি জটিলতা এড়ানো সহজ হবে।

বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর চুক্তির অবশিষ্ট মেয়াদ অনুযায়ীও আলাদা কৌশল গ্রহণ করা যেতে পারে। যেসব কেন্দ্রের চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার কাছাকাছি, সেগুলোর ক্ষেত্রে নবায়ন না করা অথবা শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণ অনুযায়ী অর্থ পরিশোধের ভিত্তিতে সীমিত মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। মাঝারি মেয়াদ অবশিষ্ট থাকা কেন্দ্রগুলোর ক্ষেত্রে নির্ধারিত অর্থ পরিশোধ কমানো বা আগাম চুক্তি সমাপ্তির আর্থিক সুবিধা যাচাই করা প্রয়োজন। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির ক্ষেত্রে অর্থায়ন ও ট্যারিফ কাঠামো পুনর্বিন্যাসের সুযোগ খতিয়ে দেখা যেতে পারে।

প্রাথমিক চুক্তির শর্ত অনুযায়ী সিএলসির মেয়াদ ২০৩২ সালের ফেব্রুয়ারি এবং সামিট গাজীপুর-২-এর মেয়াদ ২০৩৩ সালের মে মাসে শেষ হওয়ার কথা। তবে পরবর্তী সংশোধনী এবং বর্তমান চুক্তিগত অবস্থার তথ্য যাচাই করে এসব মেয়াদ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি স্থায়ী ব্যয় কমাতে হবে

কমসংখ্যক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে বেশি সময় চালিয়ে উৎপাদন বাড়ানো কিছু ক্ষেত্রে কার্যকর হতে পারে। কিন্তু যেসব কেন্দ্রের জন্য চুক্তি অনুযায়ী নির্ধারিত চার্জ দিতে হয়, সেগুলো চালানো বন্ধ করলেই সেই ব্যয় কমে যায় না। দুটি কেন্দ্রের উৎপাদন একটির মধ্যে স্থানান্তর করা হলেও উভয় কেন্দ্রের ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হলে মোট ব্যয় অপরিবর্তিত থাকতে পারে। আবার শুধু স্থির ব্যয়কে বেশি ইউনিট বিদ্যুতের মধ্যে ভাগ করে দেখানোর জন্য ব্যয়বহুল ফার্নেস অয়েলচালিত কেন্দ্র চালানোও যুক্তিযুক্ত নয়। বিদ্যুৎ উৎপাদনের সিদ্ধান্ত নিতে হবে প্রকৃত অতিরিক্ত পরিচালন ব্যয়, সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা এবং গ্রিডের সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় নিয়ে।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হলে এই হিসাব উল্লেখযোগ্যভাবে বদলে যেতে পারে। দুটি ইউনিটের প্রতিটির নিট উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ১ হাজার ৮০ মেগাওয়াট ধরে এবং পরিণত পর্যায়ে ৮৫ শতাংশ সক্ষমতায় পরিচালনার একটি অনুমান অনুযায়ী, কেন্দ্রটি বছরে প্রায় ১৬ দশমিক ১ টেরাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে। তবে এটি একটি সম্ভাব্য পরিচালন পরিস্থিতির হিসাব, বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরুর সময়সূচি নয়। একই সঙ্গে এই উৎপাদন সক্ষমতা পাওয়া গেলেই সমপরিমাণ তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ করা যাবে, এমন নিশ্চয়তাও নেই। নির্ভরযোগ্য উৎপাদন, সঞ্চালনব্যবস্থার প্রস্তুতি এবং প্রয়োজনীয় রিজার্ভ সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে।

পিক আওয়ারে ব্যাটারি হতে পারে বিকল্প

প্রতিদিনের স্বল্প সময়ের সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে ব্যাটারি সংরক্ষণব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হয়ে উঠছে। আন্তর্জাতিক নবায়নযোগ্য জ্বালানি সংস্থার (আইআরইএনএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বৃহৎ গ্রিডভিত্তিক বিদ্যুৎ সংরক্ষণব্যবস্থার স্থাপিত ব্যয় ৯৩ শতাংশ কমে প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টায় ১৯২ ডলারে নেমেছে। অন্যদিকে, ব্লুমবার্গএনইএফের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে স্থির বিদ্যুৎ সংরক্ষণে ব্যবহৃত ব্যাটারি প্যাকের দাম ৪৫ শতাংশ কমে প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টায় ৭০ ডলারে দাঁড়ায়।

তবে এই দুটি হিসাব এক ধরনের নয়। ব্যাটারি প্যাকের দাম সাধারণত স্থাপন, অবকাঠামো ও প্রকল্প বাস্তবায়নের সব ব্যয় অন্তর্ভুক্ত করে না। তা সত্ত্বেও ব্যাটারির ব্যয় হ্রাস বাংলাদেশকে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সংরক্ষণ প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের সুযোগ দিচ্ছে।

দিনের নির্দিষ্ট কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য প্রয়োজন এমন ফার্নেস অয়েলচালিত কেন্দ্রের ক্ষেত্রে সারা বছরের জন্য প্রচলিত দীর্ঘমেয়াদি ক্যাপাসিটি পেমেন্টের ব্যবস্থা নতুন করে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। প্রয়োজনীয় পিক আওয়ারের বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাটারি, চাহিদা ব্যবস্থাপনা এবং অন্যান্য নির্ভরযোগ্য উৎসের সমন্বয়ে নিশ্চিত করা যায় কি না, তা যাচাই করা উচিত।

উদাহরণ হিসেবে, ২ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতার একটি ব্যাটারি বহর থেকে ব্যবহারযোগ্য ৮ হাজার মেগাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়া গেলে তা চার ঘণ্টার সর্বোচ্চ চাহিদা মেটাতে পারে। তবে এর জন্য পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ দিয়ে ব্যাটারি চার্জ করার ব্যবস্থা এবং উপযুক্ত সঞ্চালন সক্ষমতা প্রয়োজন হবে। ব্যাটারিতে চার্জ ও ডিসচার্জের সময় কিছু বিদ্যুৎ ক্ষতি হয়; এর পাশাপাশি অর্থায়ন ব্যয় ও ব্যাটারির কর্মক্ষমতা কমে যাওয়ার বিষয়ও রয়েছে। ফলে দীর্ঘস্থায়ী বিদ্যুৎ ঘাটতির সমাধান হিসেবে শুধু ব্যাটারি স্থাপন যথেষ্ট নয়।

জরুরি পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রস্তুত সক্ষমতা বজায় রাখার প্রয়োজন থাকতে পারে। তবে এ ধরনের সক্ষমতার জন্য অর্থ পরিশোধ করতে হলে তা বাস্তব নির্ভরযোগ্যতার চাহিদার ভিত্তিতে নির্ধারণ করতে হবে। মূল্য হতে হবে প্রতিযোগিতামূলক এবং কার্যসম্পাদনের শর্ত থাকতে হবে কঠোর ও প্রয়োগযোগ্য। একই সঙ্গে নতুন ব্যাটারি বা বিকল্প ব্যবস্থার প্রকৃত সরবরাহ ব্যয়ের সঙ্গে পুরোনো বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যয় তুলনা করতে হবে। বিকল্প ব্যবস্থা চালু হলেও পুরোনো চুক্তির স্থায়ী চার্জ বহাল থাকলে প্রত্যাশিত সাশ্রয় অর্জন করা সম্ভব হবে না।

সব মিলিয়ে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের ব্যয় পুনর্বিন্যাসের ক্ষেত্রে সরকারের দর-কষাকষির সক্ষমতা বাড়াতে পারে। তবে শুধু নতুন বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করলেই সংকটের সমাধান হবে না। প্রয়োজন হবে স্বচ্ছ ও তথ্যনির্ভর চুক্তি পর্যালোচনা, অপ্রয়োজনীয় দায় থেকে সমঝোতার ভিত্তিতে বেরিয়ে আসা, প্রয়োজনীয় কেন্দ্রগুলোর অর্থ পরিশোধের শর্ত সংশোধন এবং অযৌক্তিক ডলার-নির্ভর মূল্য সমন্বয় কমানো। বিদ্যুৎ খাতের সংস্কারের সাফল্য নির্ভর করবে নতুন উৎপাদন সক্ষমতাকে কতটা কার্যকরভাবে কম ব্যয়, নির্ভরযোগ্য সরবরাহ এবং জনস্বার্থের সঙ্গে যুক্ত করা যায়, তার ওপর।

লেখক : ব্যবস্থাপনা পরিচালক, এনার্জিস পাওয়ার কর্পোরেশন লিমিটেড