নিজস্ব প্রতিবেদক:
দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পরিস্থিতির আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। তিনি বলেছেন, বর্তমান সংকটে মানুষের ভোগান্তির বিষয়টি সরকার গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থার ৮৮ শতাংশ ইতোমধ্যে পুনরুদ্ধার হয়েছে, বাকি ১২ শতাংশও দ্রুত স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এবং এক ব্রিফিংয়ে প্রতিমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, বর্তমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পরিস্থিতির কারণে মানুষের যে কষ্ট হচ্ছে, সরকার সে বিষয়ে সমব্যথী। জনদুর্ভোগের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে দুঃখ প্রকাশ করে তিনি বলেন, চলতি মাসের মধ্যেই পরিস্থিতিতে দৃশ্যমান ও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হবে বলে তিনি আশাবাদী।
গ্যাস সরবরাহে সংকটের বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী জানান, দেশের দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের (এফএসআরইউ) একটি গত ২১ জুলাই নষ্ট হয়ে যায়। সেটি ১৫ আগস্ট মেরামত করা হলেও সরবরাহ ব্যবস্থা এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। এ কারণে এলএনজি কার্গো আমদানির সময়সূচি নতুন করে নির্ধারণ করতে হয়েছে।
তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থার ৮৮ শতাংশ পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। বাকি ১২ শতাংশ ঘাটতি দ্রুত কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা চলছে।
প্রতিমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দুটি এফএসআরইউ থেকে স্বাভাবিক সময়ে গড়ে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব। বর্তমানে সরবরাহ হচ্ছে প্রায় ৭০০ থেকে ৭৭০ মিলিয়ন ঘনফুট পর্যন্ত। দুটি এফএসআরইউ পূর্ণ সক্ষমতায় চালু করা গেলে সরবরাহ আবার ১ হাজার থেকে ১ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুটে উন্নীত হবে বলে আশা করছেন তিনি।
বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রেও কয়েকটি কারণে চাপ তৈরি হয়েছে। প্রতিমন্ত্রী জানান, রক্ষণাবেক্ষণের কারণে পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ রয়েছে। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিটও পূর্ণ সক্ষমতায় চলছে না।
এর অন্যতম কারণ কয়লা সরবরাহে বাধা। বঙ্গোপসাগর কিছুটা উত্তাল থাকায় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য কয়লাবাহী লাইটারেজ জাহাজ মোংলায় আনা যাচ্ছে না। আবহাওয়া স্বাভাবিক হলে কয়লা সরবরাহ সহজ হবে এবং পায়রা ও রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদনে ফিরতে পারবে বলে আশা করছেন প্রতিমন্ত্রী।
পায়রা ও রামপাল পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হওয়ার পাশাপাশি জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক হলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। এতে শিল্পকারখানা ও গৃহস্থালি গ্রাহকদের ভোগান্তিও কমবে বলে মনে করছেন তিনি।
আদানির বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়েও কথা বলেন অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। তিনি জানান, অতিবৃষ্টির কারণে তাদের কয়লা সরবরাহে সমস্যা হয়েছে। বর্তমানে দিনের বেলায় প্রায় ৯০০ মেগাওয়াট এবং সন্ধ্যার পর ১ হাজার ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। স্বাভাবিক সময়ে গড়ে ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যেত।
আদানি কর্তৃপক্ষ প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে সৃষ্ট সমস্যার বিষয়ে ছবি ও প্রয়োজনীয় নথি সরকারকে দিয়েছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। তাদের দেওয়া ব্যাখ্যাকে যৌক্তিক মনে হলেও পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ পাওয়ার জন্য প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
এদিকে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকারকে বেশি দামে এলএনজি কিনতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, দীর্ঘমেয়াদি ও মধ্যমেয়াদি চুক্তির আওতায় যেসব সরবরাহকারীর কাছ থেকে এলএনজি নেওয়া হতো, তাদের সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ফলে প্রয়োজন মেটাতে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কিনতে হচ্ছে, যেখানে দাম তুলনামূলক বেশি।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, দেশের প্রয়োজন মেটাতে বছরে প্রায় ১১৫টি এলএনজি কার্গো প্রয়োজন হয়। এর মধ্যে সাধারণত ১০০ থেকে ১০৫টি কার্গো দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় নেওয়া হতো। বর্তমান সংকটের কারণে সেই সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় স্পট মার্কেটের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে।
তিনি বলেন, “বাধ্য হচ্ছি। উপায় নেই।” মানুষের কষ্ট ও শিল্পকারখানার ভোগান্তি বিবেচনায় নিয়ে বেশি দাম হলেও সরকার এলএনজি সংগ্রহ করছে, যাতে সংকট দীর্ঘায়িত না হয়।
কাতারের সঙ্গে বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহের চুক্তি রয়েছে উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যেদিন থেকে সরবরাহ স্বাভাবিক হবে, সেদিন থেকেই সরবরাহও স্বাভাবিক হয়ে যাবে।
জ্বালানি নিরাপত্তা শক্তিশালী করতে ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট স্থাপনের উদ্যোগের কথাও জানান অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। এ বিষয়ে সৌদি আরবের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশের ক্রুড অয়েল পরিশোধনের সক্ষমতা দ্বিগুণ হবে। তখন বছরে প্রায় ৪৫ লাখ মেট্রিক টন ক্রুড অয়েল পরিশোধন করা সম্ভব হবে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। দীর্ঘমেয়াদে এ প্রকল্প দেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রতিমন্ত্রী জানান, ডিপিপি অনুযায়ী প্রকল্পটি ২০৩০ সালে চালু হওয়ার কথা রয়েছে। তবে নির্ধারিত সময়ের আগেই কাজ শেষ করার চেষ্টা করা হবে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। রুফটপ সোলার ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়ে অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নিজেদের প্রয়োজন মেটানোর পর অতিরিক্ত সৌরবিদ্যুৎ গ্রিডে দিতে পারলে সরকার তা ভালো দামে কিনে নেবে।
সব মিলিয়ে গ্যাস সরবরাহের ঘাটতি পূরণ, পায়রা ও রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন বাড়ানো, আদানির কাছ থেকে স্বাভাবিক পরিমাণ বিদ্যুৎ পাওয়ার চেষ্টা এবং এলএনজি আমদানি অব্যাহত রাখার মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে সরকার। প্রতিমন্ত্রীর প্রত্যাশা, আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে এসব উদ্যোগের প্রভাবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পরিস্থিতিতে উল্লেখযোগ্য উন্নতি দেখা যাবে।











