নিজস্ব প্রতিবেদক:
দেশের উপকূলীয় এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধে ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে বিপর্যয়ের শঙ্কা বাড়াচ্ছে। বর্তমানে খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলায় মোট ২০২২.৫৭ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের মধ্যে ১০৭.৩৫ কিলোমিটারই ঝুঁঁকিপূর্ণ। তার মধ্যে প্রায় ৫২ কিলোমিটার ভাঙনের মুখে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। জোয়ারের অতিরিক্ত চাপে প্রতিনিয়ত নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে পুরনো ও দুর্বল বাঁধগুলো। বাঁধ ভেঙে লবণাক্ত পানি প্রবেশ করায় ধ্বংসের মুখে পড়ছে ফসলি জমি, মৎস্য ঘের ও বসতভিটা। আর ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, কালবৈশাখী, লঘুচাপ বা যেকোনো সামুদ্রিক ঝড়ে বাঁধ ভেঙে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার শঙ্কাও তীব্র থাকে। ভুক্তভোগী উপকূলবাসী এবং পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, ঘূর্ণিঝড় ও উচ্চ জোয়ারের চাপে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলে বেড়িবাঁধ ভেঙে বারবার সহায়-সম্বল হারাচ্ছে মানুষ। উপকূলের মানুষকে রক্ষা করতে সরকারের প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে দুর্যোগের ঝুঁকিতে মানুষের স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়া জরুরি। প্রবল ঝড় ও জলোচ্ছ্বাস থেকে টিকতে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ জরুরি। আর টেকসই করতে বাঁধের মধ্যে শক্তিশালী কংক্রিটের দেয়াল অথবা কনক্রিটের ব্লক নির্মাণ প্রয়োজন। বর্তমানে সাতক্ষীরা জেলার বিভিন্ন পয়েন্টে মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে প্রায় ২৬ কিলোমিটারেরও বেশি বাঁধ। তাছাড়া খুলনার কয়রা পাইকগাছাসহ বিভিন্ন নদীতীরবর্তী অরক্ষিত প্রায় ১৬ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ। আর বাগেরহাটের শরণখোলা ও মোরেলগঞ্জসহ উপকূলীয় অংশে ঝুকিপূর্ণ প্রায় ১০ কিলোমিটার বাঁধ।
সূত্র জানায়, ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের ভয়ে খুলনার পাইকগাছা, কয়রা, বাগেরহাটের মোড়েলগঞ্জ, শরণখোলা, সাতক্ষীরার শ্যামনগর, আশাশুনির মানুষ আতঙ্কিত ও শঙ্কিত। তাদের দাবি দ্রুত টেকসই বাঁধ নির্মাণ। প্রতিবছরই ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাসে খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরাসহ উপকূলীয় জেলাগুলোতে ভেঙে যায় বেড়িবাঁধ ভেঙে। তাতে ফসল নষ্টের পাশাপাশি পানিবন্দি হয়ে পড়ে লাখ লাখ মানুষ। একশ্রেণির প্রভাবশালী উপকূলীয় অঞ্চলে বেড়িবাঁধ কেটে পাইপ স্থাপনের মাধ্যমে নদীর নোনাপানি ঢ়ুকিয়ে চিংড়ি চাষ করে। তাছাড়া বেড়িবাঁধের নিচ দিয়ে পাইপ ঢ়ুকিয়ে নদী থেকে বালু উত্তোলনের পর সৃষ্ট ছিদ্র ভরাট করে না। ফলে কিছুদিন যেতে না যেতেই বেড়িবাঁধের অবস্থা হতে থাকে ভঙ্গুর ও নাজুক। ফলে নদীতে জোয়ারের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পেলেই ওসব স্থানে ভাঙনের সৃষ্টি হয় এবং লোকালয়ে লবণাক্ত পানি প্রবেশ করে। লবণাক্ত পানিতে প্লাবিত এলাকায় দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হয়। ফসলি জমিতে টানা কয়েক বছর ফসল হয় না। তাছাড়া বাধাগ্রস্ত হয় মিঠাপানির মাছ ও অন্যান্য প্রকৃতিবান্ধব কীটপতঙ্গের বংশবিস্তারও। তাছাড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের স্লুইচ গেট দীর্ঘদিন সংস্কার না করায় কিছু কিছু এলাকায় আর পানির সরবরাহ হচ্ছে না। ফলে বৃষ্টির পানি আটকে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয় এবং অনেক সময় বাঁধ ভেঙে পানি বের হয়ে আসে। ষাটের দশকে নির্মাণ করা উপকূলের ওই বাঁধ বিভিন্ন সময়ে সংস্কার করা হলেও বর্তমানে জিও ব্যাগ ও বালুর বস্তার রিং দিয়ে কোনো রকমে টিকিয়ে রাখা হয়েছে। নদীতে পলি পড়ে পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রায়ই ওসব নড়বড়ে বাঁধ উপচে লোকালয়ে প্রবেশ করে পানি।
এদিকে বেড়িবাঁধ প্রসঙ্গে খুলনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী উজ্জ্বল কুমার সেন জানান, খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলায় মোট বেড়িবাঁধ ২০২২.৫৭ কিলোমিটার। তার মধ্যে ঝুঁঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ ১০৭.৩৫ কিলোমিটার। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাস্তবায়িত আর বাস্তবায়নাধীন বাঁধের দৈর্ঘ্য ৩৫.২২৯ কিলোমিটার। অবশিষ্ট ঝুঁঁকিপূর্ণ বাঁধের দৈর্ঘ্য ৭২.১২১ কিলোমিটার। তার মধ্যে খুলনা জেলায় বেড়িবাঁধের মোট দৈর্ঘ্য ১০১৩.৪০০ কিলোমিটার। ঝুঁঁকিপূর্ণ বাঁধের দৈর্ঘ্য ৪১.৭৭৮ কিলোমিটার। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাস্তবায়িত বা বাস্তবায়নাধীন বাঁধের দৈর্ঘ্য ১৯.৬০৯ কিলোমিটার, অবশিষ্ট ঝুঁঁকিপূর্ণ বাঁধের দৈর্ঘ্য ২২.১৬৯ কিলোমিটার। বাগেরহাট জেলার বেড়িবাঁধের মোট দৈর্ঘ্য ৩৩৮ কিলোমিটার। ঝুঁঁকিপূর্ণ বাঁধের দৈর্ঘ্য ১১.৮৪৭ কিলোমিটার। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাস্তবায়িত/বাস্তবায়নাধীন বাঁধের দৈর্ঘ্য ০.৯০০ কিলোমিটার। অবশিষ্ট ঝুঁঁকিপূর্ণ বাঁধের দৈর্ঘ্য ১০.৯৪৭ কিলোমিটার। সাতক্ষীরা জেলার বেড়িবাঁধের মোট দৈর্ঘ ৬৭১.১৭০ কিলোমিটার। ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধের দৈর্ঘ্য ৫৩.৭২৫ কিলোমিটার। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাস্তবায়িত/বাস্তবায়নাধীন বাঁধের দৈর্ঘ্য ১৪.৭২০ কিলোমিটার। অবশিষ্ট ঝুঁঁকিপূর্ণ বাঁধের দৈর্ঘ্য ৩৯.০০৫ কিলোমিটার।











