নিজস্ব প্রতিবেদক:
দেশে অসংক্রামক রোগের বিস্তার ঘটাচ্ছে কৃষিতে ব্যবহৃত উচ্চঝুঁকির বালাইনাশক। বর্তমানে অসংক্রামক রোগে দেশে ৬৫-৭৫ শতাংশ মানুষের মৃত্যু ঘটছে। তাছাড়া প্রতি বছরই অসংখ্য মানুষ ক্যানসার, কিডনি রোগ, ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হচ্ছে। পাশাপাশি বিকলাঙ্গ শিশুও জন্ম নিচ্ছে। উচ্চঝুঁকির ১৭টি বালাইনাশক দেশে অবাধে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। তাতে পরিবেশ দূষিত হওয়ার পাশাপাশি অসংক্রামক রোগের বিস্তার ঘটছে। যদিও বিগত ১৯৬০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত দেশে মোট ১৯টি বালাইনাশক নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু তারপরও থেমে নেই উচ্চঝুঁকির ১৭টি বালাইনাশকের ব্যবহার। ১ হাজার ৭৪১টি ব্র্যান্ড নামে নিবন্ধিত ওসব বালাইনাশক বাজারে বিক্রি হচ্ছে। কৃষি বিভাগ এবং পিটাক সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, কীটনাশকের ব্যবহার এদেশে ১৯৫০-এর দশকে শুরু হয়। ১৯৫৬ সালে যেখানে ৩ মেট্রিক টন কীটনাশক আমদানি করা হয়েছিল, সেখানে ২০২৪ ও ২০২৫ সালে তা ৪০ হাজার টন ছাড়িয়ে গেছে। বালাইনাশক আমদানিতে সরকার ব্যাপক ছাড় দেয়ায় বর্তমানে দেশে ৩২৭টি মলিকুল বা ভ্যারিয়েন্টের পণ্য ব্যবহৃত হচ্ছে। আর ৭ হাজার ৪০৫টি ব্র্যান্ড নামে নিবন্ধিত ওসব বালাইনাশক কৃষিতে ব্যবহার হচ্ছে। দেশে বালাইনাশকের দিয়ে থাকে নিবন্ধন কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্ভিদ সংরক্ষণ উইং। যদিও বিগত ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর থেকে ওই বিভাগ প্যারাকোয়াট ও গ্লাইফোসেট নামের দুটি বালাইনাশকের বিভিন্ন ব্র্যান্ডের পুনঃনিবন্ধন এবং নতুন নিবন্ধন বন্ধ রেখেছে। তবে যাদের ব্র্যান্ডের নিবন্ধনের মেয়াদ রয়েছে তারা এখনো বাজারে ওই পণ্য বিক্রি করছে। তার বাইরে ঝুঁকিপূর্ণ আরো ১৫টি বালাইনাশকের ব্যবহার বন্ধে এখনো গ্রহণ করা হয়নি কার্যকর কোনো সিদ্ধান্ত।
সূত্র জানায়, দেশে আমদানি করা বড় বড় অনেক প্রতিষ্ঠানের বালাইনাশকেই মাত্রাতিরিক্ত ভারী ধাতুর উপস্থিতি পরীক্ষায় ধরা পড়েছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ল্যাবরেটরিতে বিগত ২০১৯ সালে পরীক্ষা করে নিশ্চিত হয়। ঝুঁকিপূর্ণ ওসব বালাইনাশক মাটি, পানি ও পরিবেশ দূষিত করছে। সেজন্যই বিভিন্ন গবেষণায় কৃষিপণ্য এবং মানুষের শরীরে সীসাসহ নানা ধরনের ভারী ধাতুর উপস্থিতি শনাক্ত হচ্ছে। আর তাতে সব মিলিয়ে মানবদেহে অসংক্রামক রোগের বিস্তার বাড়ছে। যদিও বালাইনাশক পরীক্ষা করার পর নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ কৃষি মন্ত্রণালয় ও চট্টগ্রাম বন্দরকে চিঠি দিয়ে আমদানি করা পণ্য পরীক্ষার ওপর বাধ্যবাধকতা আরোপের নির্দেশনা দেয়। কিন্তু ব্যবসায়ীদের চাপে বিষয়টি ৬ মাস স্থগিতের সুপারিশ করা হয়েছিলো। তারপর বিষয়টি নিয়ে কেউই আর উদ্যোগ নেয়নি।
সূত্র আরো জানায়, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের ল্যাবে বিগত ২০১৬ সাল থেকে ফল, সবজি, পান, শুঁটকি মাছসহ বিভিন্ন পণ্যে বালাইনাশকের অবশিষ্টাংশ পরীক্ষা করা হচ্ছে এবং রপ্তানিযোগ্য পণ্যের জন্য রিপোর্ট দেয়া হচ্ছে। তাতে দেখা গেছে, গত পাঁচ বছরে সবজির প্রায় ১০ শতাংশ, ফলের ৪ শতাংশ এবং পান ও শুঁটকি মাছে বিপজ্জনক মাত্রায় বালাইনাশকের অবশিষ্টাংশ রয়েছে। ওই ল্যাবটিতে ৩২৭টি কেমিক্যাল পেস্টিসাইড মলিকুল থাকলেও ৭০টির বেশি পরীক্ষার সক্ষমতা নেই। কারণ কারিগরি দক্ষ জনবল ও আর্থিক বরাদ্দের অভাব রয়েছে। তাছাড়া ৭৩তম বালাইনাশক কারিগরি উপদেষ্টা কমিটির সভায় দুটি বালাইনাশকের নতুন করে নিবন্ধন না দেয়ার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছিল। একই সঙ্গে ওই সভায় আন্তর্জাতিক মানদন্ড অনুযায়ী বিধিমালা তৈরি, সমস্যা সমাধানে নিয়মিত পিটাক সভার আয়োজন, বিপজ্জনক বালাইনাশক বাজার থেকে প্রত্যাহারে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ, খুচরা বিক্রয়কেন্দ্র পরিদর্শন, বন্দরে বালাইনাশক পরীক্ষা এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি, গবেষণা করে ভারী ধাতু দূষণের উৎস খুঁজে দেখার মতো বেশ কিছু সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছিলো। সভার সিদ্ধান্তে বলা হয়েছিলো, বিপজ্জনক বালাইনাশকগুলোর তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে সেগুলো পর্যায়ক্রমে বাজার থেকে প্রত্যাহারের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তবে কখন কীভাবে এ কাজ করা হবে তা নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তাছাড়া বালাইনাশকের বাজারে প্রভাবশালী অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তারা চায় না ক্ষতিকর বালাইনাশক বন্ধের ব্যাপারে দ্রুত সিদ্ধান— আসুক। সেজন্য চাইলেও উপদেষ্টা কমিটি কঠোর কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারছে না। এমনকি ব্যবসায়ীদের চাপে অনেক বিষয়ে পিটাকে কোনো আলোচনাই হয় না। আবার কোনো কঠোর সিদ্ধান্ত নেয়া হলে পরবর্তী সময় বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এদিকে এ বিষয়ে ৯০তম পিটাক সভায় বর্তমান কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ জানান, আমদানি করো বালাইনাশক দেশে ঢোকার আগে বন্দরে গুণগত মান পরীক্ষা এবং তাতে কোনো ভেজাল বা ক্ষতিকারক ভারী ধাতুর সংমিশ্রণ আছে কি না তা যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি। অন্যদিকে এ ব্যাপারে কৃষি বিভাগ বলছে, ওই ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষার উপযোগী ল্যাবরেটরি বা অবকাঠামো এখনো দেশে তৈরি করা হয়নি।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের নির্বাহী চেয়ারম্যান এবং পিটাকের সভাপতি ড. মো. আবদুছ ছালাম জানান, জাতীয় জীববৈচিত্র্য কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে ২৫ শতাংশ বিপজ্জনক বালাইনাশক ধাপে ধাপে কমিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।











