ঢাকা শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬
বিজ্ঞাপন 📢 Google AdSense — 728 × 90 Leaderboard Placement

দেশ ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় জাতীয় ঐক্যের তাগিদ প্রধানমন্ত্রীর

প্রকাশিত: 7 November 2026, 1:34 pm
ফন্ট:

নিজস্ব প্রতিবেদক:

দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব সুরক্ষায় জাতীয় ঐক্য সুদৃঢ় করার জোর আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, ভবিষ্যতে কেউ যাতে দেশের মানুষের অধিকার কেড়ে নিতে না পারে এবং বাংলাদেশকে কোনো তাবেদার রাষ্ট্রে রূপান্তর করতে না পারে—সেটিই ৭ নভেম্বরের মূল অঙ্গীকার হওয়া উচিত। এই অঙ্গীকার বাস্তবায়নে জাতীয় ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি।

শনিবার (৭ নভেম্বর) ঐতিহাসিক জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে রাজধানীর বনানী আর্মি স্টেডিয়ামে আয়োজিত এক বিশাল সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা ও সশস্ত্র বাহিনীর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে এই বিশেষ অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হয়।

বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের আর্থসামাজিক, ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জাতীয় সংহতি বজায় রাখতে হলে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক সিপাহি-জনতার ঐক্যবদ্ধ বিপ্লবের যে চেতনা, তাকে অন্তরে লালন ও ধারণ করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, দেশপ্রেমিক, স্বাধীনতাপ্রিয় ও গণতন্ত্রকামী মানুষের কাছে ৭ নভেম্বর এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও গৌরবের দিন। ১৯৭৫ সালের এই দিনে সিপাহি ও জনগণ এক হয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ববিরোধী সব চক্রান্ত নস্যাৎ করে দিয়েছিল। দেশের ইতিহাসে এই দিনটি ছিল প্রকৃত শত্রু ও মিত্র চেনার দিন।

প্রেক্ষাপট তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭৫ সালের নভেম্বরের শুরুতে দেশে চরম চক্রান্ত ঘনীভূত হয়েছিল। সেই ধারায় ২ নভেম্বর মধ্যরাতে তৎকালীন সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল জিয়াউর রহমানকে পরিবারসহ গৃহবন্দি করা হয়। তবে স্বাধীনতার ঘোষককে বন্দি বানিয়ে দেশবিরোধী যেসব চক্রান্ত শুরু হয়েছিল, সিপাহি-জনতা রাজপথে নেমে তা প্রতিহত করে। ফলে ৭ নভেম্বর হয়ে ওঠে জাতীয় ঐক্যের চেতনার আলোকবর্তিকা।

তারেক রহমান বলেন, যারা বাংলাদেশকে অন্য দেশের তাবেদার বানিয়ে রাখতে চেয়েছিল, জনগণের রাজনৈতিক-গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নিয়ে একদলীয় শাসন কায়েম করতে চেয়েছিল এবং বীরত্ব ও সম্মানের প্রতীক সশস্ত্র বাহিনীর মর্যাদা ভূলুণ্ঠিত করতে চেয়েছিল—১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতার বিপ্লবে তাদের চূড়ান্ত পরাজয় ঘটেছিল। সেদিন অপশক্তি পরাজিত হলেও তাদের ষড়যন্ত্র থমকে থাকেনি।

ষড়যন্ত্রের ধারাবাহিকতা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেই অপশক্তি পরবর্তীতে মহাজোট গঠন করে দেশকে আবার তাবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করেছিল। বিডিআর পিলখানায় পরিকল্পিত হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে সেনাবাহিনীর মর্যাদা ধ্বংস করা হয়েছিল। মানুষের অধিকার কেড়ে নিয়ে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল চরম ফ্যাসিবাদী শাসন। তবে হাজারো শহীদের আত্মত্যাগ ও ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ২০২৪ সালে সেই পরাজিত অপশক্তির পুনরায় পতন ঘটেছে এবং দেশ ফ্যাসিবাদমুক্ত হয়েছে।

সংগ্রামে আত্মত্যাগকারীদের স্মরণ করে তারেক রহমান বলেন, দীর্ঘ ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন ও ২০২৪ সালের রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানে যারা শহীদ হয়েছেন এবং আহত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, আজকের এই দিনে তাদের অমর অবদান গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করা হচ্ছে।

৭১ ও ২৪-এর আন্দোলনের তুলনা করে তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের যুদ্ধ ছিল স্বাধীনতা অর্জনের, আর ২০২৪ সালের সংগ্রাম ছিল অর্জিত স্বাধীনতা রক্ষার। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট যেভাবে দেশ রক্ষায় সর্বস্তরের মানুষ রাজপথে নেমে এসেছিল, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরও ঠিক একইভাবে সিপাহি-জনতা ঐক্যবদ্ধ হয়ে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করেছিল।

তারেক রহমান জোর দিয়ে বলেন, সময়ের পরিক্রমায় প্রমাণিত হয়েছে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর ছিল বাংলাদেশের ভবিষ্যতের পথরেখা নির্ধারণের দিন। যতবার দেশ এই ঐতিহাসিক পথরেখা থেকে সরে গেছে, ততবারই দেশের সার্বভৌমত্ব ও জনগণের অধিকার হুমকির মুখে পড়েছে।

জাতীয় পরিচয়ের সংজ্ঞায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান কিংবা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী—সব নাগরিকের একটাই যৌথ ও গর্বের পরিচয়, ‘আমরা বাংলাদেশি’। এই পরিচয়ই আমাদের একতাবদ্ধ করেছে এবং ৭ নভেম্বরেই এই বাংলাদেশি পরিচয়ের সুদৃঢ় ভিত্তি রচিত হয়েছিল।

তিনি দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, বাংলাদেশ যতদিন থাকবে, ৭ নভেম্বরের সিপাহি-জনতার বিপ্লবের তাৎপর্য ততদিন প্রাসঙ্গিক থাকবে। এই বিপ্লবের প্রকৃত নায়ক এ দেশের দেশপ্রেমিক সিপাহি ও সাধারণ জনগণ।

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অবদান স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ৭ নভেম্বরে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান যেভাবে দেশের সার্বভৌমত্বের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন, ১৯৭১ সালেও একইভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে রণাঙ্গনে বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করেছেন। ঐতিহাসিক এই দিনে স্বাধীনতার ঘোষকের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান তিনি।

ইতিহাস চর্চার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, ইতিহাস কেবল অতীত স্মরণ নয়, এটি জাতির আত্মপরিচয় ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ গড়ার প্রেরণা। অনুষ্ঠানে হাজার হাজার কিশোর-তরুণ যেভাবে নির্মোহভাবে ৭ নভেম্বরের প্রেক্ষাপট তুলে ধরেছে, তা প্রশংসনীয়। ইতিহাসসচেতন তরুণ সমাজ ঐক্যবদ্ধ থাকলে বাংলাদেশ কখনো দিক হারাবে না।

তারেক রহমান আরও বলেন, যে দেশের তরুণ সমাজ জাতীয়তাবোধে অনুপ্রাণিত নয়, সেখানে সংহতি সুদৃঢ় হয় না। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৭৫-এর ৭ নভেম্বর, ১৯৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন কিংবা ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান—প্রতিটি ক্ষেত্রে তরুণরা প্রমাণ করেছে যে দেশের স্বার্থের প্রশ্নে তারা আপস করে না। তাদের কাছে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’।

তরুণদের দায়িত্ব ও সরকারের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতার পতাকা সমুন্নত রেখে তা অর্থবহ করা প্রতিটি প্রজন্মের কাজ। বিশেষ করে তরুণদের দায়িত্ব একটি নিরাপদ, মানবিক ও মর্যাদাপূর্ণ দেশ গঠনে আত্মনিয়োগ করা। আর অভিভাবকদের কাজ হলো তারুণ্যের বিকাশ ঘটাতে উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করা। বর্তমান সরকার একটি সমৃদ্ধ ও মর্যাদাপূর্ণ ভবিষ্যৎ তৈরিতে সম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

উল্লেখ্য, আড়ম্বরপূর্ণ এই আয়োজনে বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোরের (বিএনসিসি) ৩ হাজার ক্যাডেট এবং বাংলাদেশ স্কাউটসের ৫০০ সদস্য অংশ নেন। অনুষ্ঠানে সেনাপ্রধান, বিমানবাহিনী প্রধান, মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, সংসদ সদস্য, সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও কূটনীতিকরা উপস্থিত ছিলেন।

মন্তব্য করুন