নিজস্ব প্রতিবেদক:
ঢাকার হযরত শাহজালাল (রা.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের এপ্রোন এলাকায় দীর্ঘ ১১ বছর ধরে পরিত্যক্ত অবস্থায় পরে রয়েছে ১২টি উড়োজাহাজ। পরিত্যক্ত ওসব উড়োজাহাজ বিমানবন্দরের বিশাল জায়গা দখল করে রেখেছে। তাতে ব্যাঘাত ঘটছে বিমানবন্দরের অপারেশনাল কর্মকাণ্ডে। পরিত্যক্ত উড়োজাহাজের মালিক বেসরকারি ৪টি কোম্পানির কাছে বেবিচকের পাওনা ৪ হাজার কোটি টাকা। দীর্ঘদিনেও ওই টাকা আদায় করা যাচ্ছে না। এমনকি উড়োজাহাজগুলো বিক্রি করতে দেশি-বিদেশি ক্রেতাও মিলছে না। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে পরিত্যক্ত বিমানগুলোকে বেবিচক বাজেয়াপ্ত করেছে। বর্তমানে ওই উড়োজাহাজগুলো চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এখন উড়োজাহাজ হিসেবে সেগুলো বিক্রি করতে উপযুক্ত ক্রেতা না পাওয়ায় বেবিচক ওজনে বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বেসরকারি ৪টি কোম্পানির ১২টি উড়োজাহাজগুলো বন্ধ হওয়ার পর থেকেই শাহজালাল বিমানবন্দরের রানওয়ের পাশে পড়ে রয়েছে। আর বছরের পর বছর ধরে উড়োজাহাজ পার্ক করে রাখায় নিয়মানুযায়ী বেবিচকের পার্কিং ফি এবং তার ওপর অতিরিক্ত সারচার্জ যুক্ত হতে থাকে। তার বকেয়া এবং চক্রবৃদ্ধি হারের সারচার্জ মিলিয়ে বর্তমানে ওই চার কোম্পানির কাছে বেবিচকের মোট পাওনার পরিমাণ প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা দাঁড়িয়েছে। তার মধ্যে এককভাবে জিএমজি এয়ারলাইন্সের কাছেই ৩ হাজার কোটি টাকার বেশি বেবিচকের পাওনা রয়েছে। তাছাড়া ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের কাছে বকেয়া প্রায় ৪০০ কোটি টাকা এবং বাকি টাকা রিজেন্ট ও অ্যাভিয়েন চ্যার্টারের বকেয়া।
সূত্র জানায়, বিমানবন্দরে পরিত্যক্ত উড়োজাহাজগুলোর বকেয়া আদায়ের লক্ষ্যে নিলামে বিক্রির চেষ্টা করেও কোনো ক্রেতা পাচ্ছে না বেবিচক। অথচ ওই উড়োজাহাজগুলোর কারণে দীর্ঘদিন ধরেই ব্যাহত হচ্ছে বিমানবন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম। তাছাড়া উড়োজাহাজগুলো কার্গো ভিলেজের সমপ্রসারণ কাজে বড় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। পরিত্যক্ত উড়োজাহাজগুলোর মধ্যে ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের ৮টি, রিজেন্ট এয়ারওয়েজের দুটি, জিএমজি এয়ারলাইন্সের একটি ও অ্যাভিয়েন চ্যার্টারে একটি উড়োজাহাজ। অভিযোগ রয়েছে, কোম্পনির কর্ণধাররা প্রভাব খাটিয়ে অ্যাপ্রোন এলাকার জায়গা দখলে নিয়ে উড়োজাহাজগুলো রেখেছে। অথচ শাহজালাল বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল চালুর পর কার্গো হ্যান্ডলিং ও অন্যান্য লজিস্টিক সুবিধা সমপ্রসারণের জন্য জরুরি হয়ে পড়েছে ওই জায়গাটি দ্রুত খালি করা। উড়োজাহাজগুলো দখল করে রেখেছে বিমানবন্দরের এক লাখ ৯২ হাজার ১০০ বর্গফুট এলাকা। যা বিমানবন্দরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অপারেশনাল এলাকা। সেখান থেকেই বিমানবন্দরের কার্গো কার্যক্রম পরিচালিত হয় এবং উড়োজাহাজ পার্কিংও করতে হয়। কিন্তু জায়গা বেদখলের কারণে বিমানবন্দরের নিয়মিত ও অনিয়মিত উড়োজাহাজ পার্কিংয়ের সমস্যা হচ্ছে এবং ব্যাহত হচ্ছে রপ্তানি পণ্য ওঠানামাও। বর্তমানে কার্গো পরিচালনায় চাপ বাড়ায় বিমানবন্দরের সক্ষমতাও পুরোপুরি ব্যবহার করা যাচ্ছে না। অ্যাপ্রোনের জায়গা দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকায় সরকার সম্ভাব্য রাজস্ব থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে। ভবিষ্যতে রপ্তানি কার্যক্রম বাড়লে আরো তীব্র হতে পারে ওই সমস্যা। যদিও প্রচলিত আইন অনুযায়ী বাতিল হয়ে গেছে পরিত্যক্ত ওই উড়োজাহাজগুলোর নিবন্ধনও।
সূত্র আরো জানায়, বিমানবন্দর থেকে পরিত্যক্ত উড়োজাহাজ সরাতে বেবিচক বাংলাদেশ বিমান বাহিনী ও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের সহযোগিতা চেয়েছে। কিন্তু দেশে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী উড়োজাহাজ মূল্যায়নে সক্ষম কোনো বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান নেই। আর বিদেশি প্রতিষ্ঠান দিয়ে মূল্যায়ন করলে যে ব্যয় হবে, তা সম্ভাব্য বিক্রয়মূল্যের চেয়েও বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ অবস্থায় উড়োজাহাজগুলোর ভিত্তিমূল্য নির্ধারণ ছাড়াই আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বানের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। আশা করা হচ্ছে উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক দরপত্র হলে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান প্রতিযোগিতামূলকভাবে অংশ নেবে। ফলে বাজারভিত্তিক মূল্য পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে। তাতে তৈরি হবে সরকারের জন্য সর্বোচ্চ দর নিশ্চিত করার সুযোগ।
এদিকে বেসরকারি বিমান পরিবহন সংস্থাগুলো একসময় দেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রুটে দাপটের সঙ্গে ব্যবসা করেছে। কিন্তু পরবর্তীতে ওই কোম্পানিগুলো আর্থিক লোকসান, অব্যবস্থাপনা ও ঋণে জর্জরিত হয়ে কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। জিএমজি এয়ারলাইন্স ২০১২ সালে তাদের ফ্লাইট অপারেশন স্থগিত করে। তারপর ২০১৬ সালে বন্ধ হয়ে যায় ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ এবং ২০২০ সালের মার্চে করোনাকালীন সংকটের শুরুতে রিজেন্ট এয়ারওয়েজ বন্ধ হয়। ওসব বিমান কোম্পানিকে তাদের উড়োজাহাজগুলো সরিয়ে নেয়ার জন্য বেবিচক একাধিকবার চিঠি দিলেও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এমনকি বিগত ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে ওই প্রতিষ্ঠানগুলোকে ৩০ দিনের চূড়ান্ত নোটিশ দেয়া হলেও কাজ হয়নি। নোটিশে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে উড়োজাহাজ অপসারণ না করলে সেগুলো বাজেয়াপ্ত করে নিলামে বিক্রির কথা বলা হয়। পরে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্স, বন্ধক গ্রহণকারী ব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংককে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করা হয়।
অন্যদিকে পরিত্যক্ত উড়োজাহাজগুলো বাজেয়াপ্ত ও নিলামে বিক্রির মাধ্যমে বকেয়া আদায়ের লক্ষ্যে বেবিচক প্রক্রিয়া শুরু করে। বিগত ২০২১ সালের শেষের দিকে ও ২০২২ সালজুড়ে বেবিচক উড়োজাহাজগুলো নিলামের জন্য আন্তর্জাতিক ও দেশীয় দরপত্র আহ্বান করে। কিন্তু একাধিকবার নিলামের চেষ্টা হলেও কোনো উপযুক্ত ক্রেতা পাওয়া যায়নি। কারণ উড়োজাহাজগুলো ১০ থেকে ১১ বছর ধরে রোদ-বৃষ্টিতে খোলা আকাশের নিচে পড়ে থাকায় নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ হয়নি। ফলে সেগুলোর ইঞ্জিন, এভিয়নিক্স সিস্টেম, ককপিটের যন্ত্রপাতি এবং ল্যান্ডিং গিয়ার নষ্ট ও মরিচা ধরে অকেজো হয়ে গেছে। পুনরায় উড্ডয়নের উপযোগী করা অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক নয়। তাছাড়া উড়োজাহাজগুলোর বেশিরভাগই পুরনো মডেলের (ড্যাশ-৮, এমডি-৮৩, বোয়িং ৭৩৭-৩০০)। এই মডেলগুলোর ব্যবহার বিশ্বব্যাপী এখন সীমিত। তাছাড়া মালিকানাধীন কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে ব্যাংকঋণ ও অন্যান্য পাওনাদারের মামলা থাকায় কোনো ক্রেতাই আইনি ঝামেলা এড়াতে সেগুলো কিনতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। এ প্রেক্ষিতে গত ১৬ জুলাই বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো চিঠিতে বেবিচক বলেছে, ক্রেতা না পেলে উড়োজাহাজগুলো ওজন দিয়ে বড় কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করা ছাড়া উপায় নেই। এখন মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশনার অপেক্ষায় আছে বেবিচক। একই সঙ্গে চলছে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের খোঁজও।
এ প্রসঙ্গে বেবিচক সদস্য (পরিচালনা ও পরিকল্পনা) এয়ার কমডর আবু সাঈদ মেহবুব খান জানান, দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা উড়োজাহাজগুলো বিমানবন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করছে। সেগুলো ভিত্তিমূল্য নির্ধারণ ছাড়াই আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে নিলামে তোলার অনুমোদন চাওয়া হয়েছে। মূল্য নির্ধারণে যে ব্যয় হবে, বিক্রি করে সেই অর্থ আদায় হবে কি না, তা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে। বাস্তবে সেগুলো এখন স্ক্র্যাপে পরিণত হয়েছে।
একই প্রসঙ্গে বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক জানান, উড়োজাহাজগুলো বিক্রির জন্য দীর্ঘদিন ধরেই চেষ্টা করা হচ্ছে। বিষয়টি মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হয়েছে। তাছাড়া উড়োজাহাজ কোম্পানিগুলোর কাছে বিশাল অর্থ পাবে বেবিচক। ওসব উড়োজাহাজের জন্য বিমানবন্দরে কাজের ব্যাঘাত ঘটছে।











