নিজস্ব প্রতিবেদক:
ভারতে অবস্থান করা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ বিভিন্ন মামলায় অভিযুক্তদের দেশে ফিরিয়ে বিচারের আওতায় আনতে চায় সরকার। একই সঙ্গে গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ বা কারও মুখ বন্ধ করার কোনো নীতি সরকারের নেই বলে জানিয়েছেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী আন্দালিভ রহমান পার্থ। তিনি বলেছেন, সরকারের সমালোচনা গ্রহণ করাই গণতান্ত্রিক মানসিকতার বড় পরীক্ষা।
মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) সচিবালয়ে তথ্য অধিদফতরের সম্মেলন কক্ষে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তথ্যমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরানোর বিষয়ে জানতে চাইলে আন্দালিভ রহমান পার্থ বলেন, ভারতে অবস্থান করা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ বিভিন্ন মামলায় অভিযুক্তদের দেশে ফিরিয়ে আইনের আওতায় বিচার নিশ্চিত করা সরকারের মূল দাবি। জুলাই গণঅভ্যুত্থানসহ আগের বিভিন্ন ঘটনায় অভিযুক্তদেরও সঠিক বিচারের আওতায় আনার কথা বলেন তিনি।
শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থানের বিষয়ে তিনি বলেন, “ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় দেখেছি, শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থানের বিষয়টি আদালতের মাধ্যমে সমাধান করতে চায় ভারত সরকার।”
তথ্যমন্ত্রী বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও এর আগের বিভিন্ন অপরাধেরও বিচার হবে। তার ভাষায়, “জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও এর আগের সকল অপরাধেরও বিচার হবে।”
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে সরকারের অবস্থান তুলে ধরে আন্দালিভ রহমান পার্থ বলেন, সরকার কাউকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায় না এবং কোনো গণমাধ্যম বন্ধ করার মানসিকতাও নেই।
তিনি বলেন, “গণতন্ত্রে বিশ্বাস করা আসলে একটি মানসিকতার বিষয়। এটা শুধু কোনো সিস্টেম বা কাঠামোর বিষয় নয়। আপনি আপনার বিরুদ্ধে সংবাদ বা সমালোচনা গ্রহণ করতে পারবেন কি না, এটাই গণতান্ত্রিক মানসিকতার বড় পরীক্ষা।”
তথ্যমন্ত্রীর দাবি, গত ১৭ বছরে সরকারের সমালোচনা গ্রহণের মানসিকতার ঘাটতি ছিল। অনেক ক্ষেত্রে এমন ধারণা তৈরি হয়েছিল যে সরকার কোনো টেলিভিশন চ্যানেলের অনুমোদন দিলে সেই চ্যানেলকে সরকারের পক্ষে কথা বলতে হবে।
বর্তমান সরকারের অবস্থান এর চেয়ে ভিন্ন জানিয়ে তিনি বলেন, গত ছয় মাসে সরকার বা প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। তথ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সঙ্গে প্রথম বৈঠকেই তিনি বলেছিলেন, “আমরা কাউকে নিয়ন্ত্রণ করবো না, কারও মুখ বন্ধ করবো না।”
গণমাধ্যমকে গণতন্ত্রের অন্যতম স্তম্ভ উল্লেখ করে পার্থ বলেন, গণমাধ্যমের উপস্থিতির কারণেই সরকার জবাবদিহির মধ্যে থাকে। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের বস্তুনিষ্ঠভাবে সংবাদ প্রকাশের আহ্বান জানান তিনি।
তার মতে, সরকারের সমালোচনা অবশ্যই করা যাবে। তবে দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
বর্তমান সময়কে সরকারের জন্য অত্যন্ত কঠিন বলে উল্লেখ করেন আন্দালিভ রহমান পার্থ। তিনি বলেন, দীর্ঘ ১৭ বছর পর এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থার দায়িত্ব বর্তমান সরকার পেয়েছে, যেখানে প্রশাসনিক ব্যবস্থার পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানও দীর্ঘদিন ধরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
“স্বাধীনতার পর সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছি। গত ১৭ বছরে করাপ্টেড সিস্টেমের পর স্বাভাবিক সময়ে সরকার দায়িত্ব নেয়নি। আর আমরা সেনসেটিভ সময় পার করছি,” বলেন তিনি।
দেশের বিভিন্ন স্থানে বিচ্ছিন্ন অপরাধের খবর প্রকাশের ক্ষেত্রেও গণমাধ্যমকে বাস্তবতার বিষয়টি বিবেচনায় রাখার আহ্বান জানান তথ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, বাংলাদেশে প্রায় সাড়ে চার হাজার ইউনিয়ন ও ৩৬ হাজার ওয়ার্ড রয়েছে। প্রতিদিন কোথাও না কোথাও ছোটখাটো অপরাধ ঘটতে পারে। কিন্তু এসব ঘটনাকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হলে যেন পুরো দেশ অচল হয়ে পড়েছে, তাহলে মানুষের মধ্যে বাস্তবতার তুলনায় বড় ধরনের নেতিবাচক ধারণা তৈরি হতে পারে।
তবে সরকারের সমালোচনার অধিকার গণমাধ্যমের রয়েছে বলেও তিনি স্পষ্ট করেন।
সরকারি মালিকানাধীন বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) ও সংসদ টেলিভিশনে শুধু সরকারদলীয় মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের বক্তব্য প্রচারের পরিবর্তে বিরোধী দলের বক্তব্যও আনুপাতিক হারে প্রচারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানান তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী।
তিনি বলেন, সংসদের বিরোধী দল এবং সংসদের বাইরে থাকা রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্যও আনুপাতিক হারে প্রচার করতে হবে। সরকারের পক্ষে বা বিপক্ষে নয়, জনগণের পক্ষে বলা বক্তব্য তুলে ধরাই গণতন্ত্রের অংশ বলেও তিনি মন্তব্য করেন। মঙ্গলবার থেকেই এ সিদ্ধান্ত কার্যকরে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
ইয়াসের খান চৌধুরী বলেন, বর্তমান সময়ে দেশের গণমাধ্যম অতীতের তুলনায় অনেক বেশি স্বাধীনতা ভোগ করছে। গত ছয় মাসে গোয়েন্দা সংস্থার কোনো কর্মকর্তা গণমাধ্যমে ফোন করে সংবাদ বন্ধ করতে বলেছেন কি না, কিংবা সরকারের মদদে গুম বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে কি না, এসব বিষয়ও মূল্যায়নের মধ্যে আনা যেতে পারে।
সরকারের ইতিবাচক কাজগুলোও সংবাদে তুলে ধরার আহ্বান জানান তিনি। ভালো কাজের স্বীকৃতি পেলে সরকার আরও ভালো কাজ করতে উৎসাহিত হবে বলে মন্তব্য করেন প্রতিমন্ত্রী।
তবে সরকার ও রাষ্ট্রকে আলাদা করে দেখার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, সরকারের সমালোচনা করা যাবে এবং এ স্বাধীনতা অব্যাহত থাকবে। কিন্তু রাষ্ট্রের ক্ষতি হয় এমন কার্যক্রম বা রাষ্ট্রদ্রোহী কোনো বিষয় প্রচারের ক্ষেত্রে গণমাধ্যমকে দায়িত্বশীল হতে হবে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কিশোরগঞ্জে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনে স্থানীয় আলেম-ওলামাদের বাধার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তথ্যমন্ত্রী বলেন, কোনো কনসার্ট বাতিল হওয়ার পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। নিরাপত্তাঝুঁকি থাকলেও এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা বলে জানা হবে বলেও জানান তিনি।
আন্দালিভ রহমান বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে বাধা বা বিঘ্ন সৃষ্টির কোনো মানসিকতা নেই। দেশে বর্তমানে অনেক কনসার্ট ও বড় সাংস্কৃতিক আয়োজন হচ্ছে। তবে কোনো নির্দিষ্ট স্থানে নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কা থাকলে সেটি আলাদাভাবে বিবেচনা করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, গত ৪০ থেকে ৫০ বছর ধরে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে একটি গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে। বাংলাদেশে এ ধরনের ঘটনা আগেও ঘটেছে। তবে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দেশে সাংস্কৃতিক সহাবস্থান রয়েছে এবং আইন অনুযায়ী এসব বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ যে অবস্থায় ছিল, সেখান থেকে বর্তমান সরকারের সময়ে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের চর্চা বাড়ানো এবং তা সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে বলেও জানান তিনি।











