পোশাক রপ্তানিতে বাড়ছে বহুমুখী সংকট, প্রতিযোগিদের দাপটে পিছিয়ে বাংলাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক:

বিশ্বজুড়ে তৈরি পোশাকের চাহিদা বাড়লেও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রত্যাশিত প্রবৃদ্ধি অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে বাংলাদেশ। প্রথাগত পণ্যনির্ভরতা, অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সংকটসহ বিভিন্ন কারণে প্রতিযোগী দেশগুলোর কৌশলগত অগ্রগতির কারণে দেশের প্রধান এই রপ্তানি খাতটি পিছিয়ে পড়ছে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) সামপ্রতিক বৈশ্বিক বাণিজ্য পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় দেখা গেছে, বিশ্বজুড়ে মোট পণ্য ও সেবা বাণিজ্য এবং সার্বিক পোশাক আমদানি বৃদ্ধি পেলেও গত বছর বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ছিল এক শতাংশেরও নিচে, যা মাত্র দশমিক ৮৯ শতাংশে ঠেকেছে। অথচ একই সময়ে প্রধান প্রতিযোগী দেশ ভিয়েতনামের পোশাক রপ্তানি প্রবৃদ্ধি সাড়ে ১০ শতাংশ, ভারতের সাড়ে ৫ শতাংশ, কম্বোডিয়ার প্রায় ১৭ শতাংশ, পাকিস্তানের ৬ শতাংশ এবং ইন্দোনেশিয়ার প্রবৃদ্ধি ছিল ৫ শতাংশ। টানা দুই বছর ধরে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির পরিমাণ প্রায় ৩৮ বিলিয়ন ডলারের ঘরেই থমকে রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী, সার্বিক প্রবৃদ্ধির এমন ধীরগতির কারণে বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের মোট অংশীদারি পূর্বের ৭ শতাংশ থেকে কমে বর্তমানে ৬ দশমিক ৭৬ শতাংশে নেমে এসেছে। চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক সংঘাতের ফলে বিশ্ববাজারে চীনের একক বাজার অংশীদারি সাড়ে ৩১ শতাংশ থেকে কমে সাড়ে ২৭ শতাংশে নেমে এলেও সেই খালি হওয়া বাজার দখলের সুযোগটি বাংলাদেশ কাজে লাগাতে পারেনি, বরং ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো আগ্রাসী কৌশলে নিজেদের বাজার জোরদার করেছে। কেবল সামগ্রিক বিশ্ব বাজারেই নয়, বরং বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রধান স্তম্ভ ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারেও তৈরি পোশাক পাঠাতে গিয়ে বড় ধরনের ধাক্কা খাচ্ছেন দেশীয় উদ্যোক্তারা। জানা গেছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাটের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, চলতি ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ১৬ দশমিক ৪৩ শতাংশ কমে ৮ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ইউরোতে নেমে এসেছে, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ১০ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন ইউরো। অর্থাৎ মাত্র ছয় মাসের ব্যবধানে ইউরোপের একক বাজারেই বাংলাদেশের আয় কমেছে প্রায় ১ দশমিক ৭০ বিলিয়ন ইউরো। সূত্র মতে, এই সময়ে বৈশ্বিক গড় অনুযায়ী ইইউর পোশাক আমদানি কমার হার ছিল ৯ দশমিক ৭০ শতাংশ, যার তুলনায় বাংলাদেশের রপ্তানি পতনের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি করা প্রতি কেজি পোশাকের গড় ইউনিট মূল্য প্রায় ৮ দশমিক ৯৪ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। বিপরীতে প্রধান প্রতিযোগী দেশ ভিয়েতনাম একই বাজারে তাদের পণ্যের গড় মূল্যে ১৩ দশমিক ৪৩ শতাংশ ইতিবাচক বৃদ্ধি দেখতে পেয়েছে। এতে একদিকে রপ্তানিকারকদের মুনাফায় বড় ধস নামছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে দেশীয় পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান হুমকির মুখে পড়ছে। বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের এই ধীরগতির পেছনে পণ্য বৈচিত্র্যের অভাব এবং প্রথাগত কটন বা তুলানির্ভর উৎপাদন ব্যবসাকেই মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কেন্দ্রের (আইটিসি) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্ববাজারের বড় অংশ দ্রুত সিনথেটিক, স্পোর্টসওয়্যার ও ম্যান-মেইড ফাইবারের (এমএমএফ) দিকে ধাবিত হলেও বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানির প্রায় ৭২ দশমিক ৭ শতাংশই এখনও তুলাভিত্তিক, যেখানে বৈশ্বিক গড় হলো মাত্র ৪১ দশমিক ৬ শতাংশ। বিপরীতে অন্য প্রতিযোগী দেশগুলোর মধ্যে ভিয়েতনামের প্রায় ৩৫ শতাংশ, কম্বোডিয়ার ৪২ শতাংশ এবং চীনের ২৯ শতাংশ রপ্তানি আসে ম্যান-মেইড ফাইবার বা নন-কটন পণ্য থেকে। তুলাভিত্তিক পোশাকে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক দক্ষতা থাকলেও পরিবর্তনশীল বিশ্ববাজারে উচ্চমূল্যের সিনথেটিক ও টেকনিক্যাল পোশাকে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ, আধুনিক প্রসেসিং প্রযুক্তি এবং দক্ষ জনবলের অভাবেই দেশীয় শিল্প পিছিয়ে পড়ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, সাধারণ কটন পণ্যে কেবল কম খরচে বেশি উৎপাদনের মানসিকতা থেকে বের হয়ে এসে মূল্য সংযোজন বা ভ্যালু অ্যাডিশনের প্রতিযোগিতায় না গেলে ভবিষ্যতে তৈরি পোশাক খাতের টেকসই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়বে। পণ্যের গাঠনিক সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সংকট ও পরিচালনাগত অনিশ্চয়তাও আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থায় বড় আঘাত হানছে। তথ্য বিশ্লেষণ করে জানা যায়, দেশে দীর্ঘদিন ধরে বিরাজমান তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে কারখানাগুলোতে নিয়মিত উৎপাদন চালানো এবং নির্ধারিত সময়ে জাহাজী করণ নিশ্চিত করা অসম্ভব হয়ে উঠছে। জ্বালানি সংকটে উৎপাদন ব্যয় বহুগুণ বেড়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক দামে পণ্য সরবরাহ করা কঠিন হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী, স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের আসন্ন উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা ও বাণিজ্যিক সুযোগ-সুবিধা কী হবে, তা নিয়ে বিদেশি প্রকিউরমেন্ট এজেন্টদের মনে সংশয় তৈরি হয়েছে। এর সুবাদে ভারত ও ভিয়েতনাম বিভিন্ন দেশের সাথে দ্বিপাক্ষিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির (এফটিএ) মাধ্যমে অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা আদায় করে নিচ্ছে। একই সাথে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে অতিরিক্ত শুল্কের মুখে পড়ে চীনের উৎপাদকেরা তাদের উদ্বৃত্ত পণ্য কম দামে ইউরোপের বাজারে পাঠাতে শুরু করায় বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের বাজার টিকিয়ে রাখার লড়াই চরম রূপ নিয়েছে। বিদ্যমান এই বহুমুখী সংকট কাটিয়ে উঠতে হলে সাময়িক নগদ সহায়তার ওপর নির্ভর না করে দীর্ঘমেয়াদি ও সুনির্দিষ্ট জাতীয় রূপরেখা বাস্তবায়নের পরামর্শ দিচ্ছেন দেশের অর্থনীতিবিদ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিশ্লেষকেরা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিরবচ্ছিন্ন প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহ সুনিশ্চিত করা, আন্তর্জাতিক বন্দরগুলোর পরিচালনা দক্ষতা বাড়ানো, আর্থিক খাতের সংস্কার এবং এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী বাণিজ্য সুবিধা ধরে রাখতে কার্যকর আন্তর্জাতিক কূটনীতি পরিচালনা করা এখন সময়ের দাবি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতিযোগী দেশ ভিয়েতনাম বা কম্বোডিয়ার মতো সুবিধাজনক অবস্থান তৈরি করতে হলে ম্যান-মেইড ফাইবারের কাঁচামাল আমদানি সহজ করা এবং এর প্রসেসিং, ডাইং ও ফিনিশিং খাতে বড় অংকের দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে হবে। বাণিজ্যিক ঝুঁকি এড়াতে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা একবার বাংলাদেশ থেকে বিকল্প কোনো দেশে অর্ডার সরিয়ে নিলে তা পুনরায় ফেরত আনা অত্যন্ত কঠিন। তাই প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন, নন-কটন পণ্যে বৈচিত্র্য আনা এবং নীতিগত সহায়তার সমন্বিত উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলেই কেবল বাংলাদেশ বর্তমানের এই কঠিন পতন সামলে বিশ্ব পোশাক বাজারে পুনরায় শক্তিশালী অবস্থান পুনরুদ্ধার করতে পারবে।