নিজস্ব প্রতিবেদক:
বরিশালের হিজলায় মেঘনা নদীতে মা ইলিশ রক্ষার অভিযানের সময় জেলেদের সঙ্গে নৌ-পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় নৌ-পুলিশের ছোড়া গুলিতে আকতার হোসেন হাওলাদার নামে এক জেলে নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া চার জেলে গুলিবিদ্ধ হন এবং তাদের বিভিন্ন ক্লিনিকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
তবে অভিযানের কথা স্বীকার করছে না নৌ-পুলিশ। অপরদিকে প্রত্যক্ষদর্শী জেলেরা বলছেন, নৌ-পুলিশই অভিযানের সময় গুলি চালিয়েছে। এতে ওই জেলের বুক ঝাঁঝরা হয়ে যায় এবং স্পিডবোটে এসে অভিযান চালিয়েছে তারা।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) ভোররাত ৫টার দিকে হিজলা উপজেলার গৌরবদী ইউনিয়নের শাওড়া অরাকুল মাছঘাট-সংলগ্ন মেঘনা নদীতে এ ঘটনা ঘটে। নিহত আকতার হোসেন হাওলাদার (৪০) ওই উপজেলার মেমানিয়া ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের চর মেমানিয়া গ্রামের সুলতান হাওলাদারের ছেলে। বৃহস্পতিবার দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত নিহতের লাশ হিজলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রয়েছে বলে জানিয়েছে নৌ-পুলিশ।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী জেলে আব্দুল ব্যাপারী জানিয়েছেন, বুধবার রাতে মেঘনা নদীতে ইলিশ শিকার করতে যান জেলেরা। শিকার শেষে ফেরার পথে বৃহস্পতিবার ভোরে শাওড়া অরাকুল মাছঘাট-সংলগ্ন মেঘনা নদীতে জেলেদের আটক করা নিয়ে তাদের সঙ্গে নৌ-পুলিশের সংঘর্ষ হয়। এ সময় নৌ-পুলিশের অভিযানিক দল এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়ে। এতে আকতারসহ পাঁচজন গুলিবিদ্ধ হন। পরে আকতারকে বরিশাল হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যান। গুলিবিদ্ধ অপর জেলেদের গোপনে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
নাম প্রকাশ না করা শর্তে উপজেলা প্রশাসনের এক কর্মকর্তা জানান, ‘মেঘনা নদীতে মা ইলিশ রক্ষায় অভিযান চালাচ্ছিলেন নৌ-পুলিশের সদস্যরা। এ সময় জেলেদের সঙ্গে অভিযানিক দলের সংঘর্ষ হয়। আত্মরক্ষার্থে অভিযানিক দলের ছোড়া গুলি জেলে আকতারের বুকে লাগে। পাশাপাশি আরও চার জেলে গুলিবিদ্ধ হন। পরে গুলিবিদ্ধ আকতারকে বরিশাল শের-ই বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে মৃত্যু হয়। বর্তমানে তার মরদেহ হিজলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রাখা হয়েছে। ঘটনার পর আহত জেলেরা আত্মগোপনে চলে যান। যে যার মতো করে চিকিৎসা নিচ্ছেন বলে শুনেছি আমরা।’
আহত জেলেদের বরাত দিয়ে নিহত আকতারের বোন সাথী আক্তার বলেন, ‘আকতারসহ অন্য জেলেরা বুধবার রাতে মাছ শিকারের জন্য মেঘনা নদীতে যান। বৃহস্পতিবার ভোরে অরাকুল মাছঘাট সংলগ্ন এলাকায় কোস্টগার্ড এবং নৌ-পুলিশের গুলিতে আমার ভাই আহত হন। প্রথমে হিজলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ও পরে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে মৃত্যু হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই মৃত্যু নিয়ে আমাদের পরিবারের পক্ষ থেকে কোনও প্রকার অভিযোগ নেই। কারণ এতে আরও হয়রানি বাড়বে আমাদের। তাই আমরা ভাইয়ের লাশ ময়নাতদন্ত ছাড়াই দাফন করতে চাই।’
নাম প্রকাশ না করে কোস্টগার্ড দক্ষিণ জোনের গণমাধ্যম শাখার দায়িত্বে থাকা এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ঘটনার সময় মেঘনায় কোস্টগার্ডের কোনও অভিযান ছিল না।
অপরদিকে বরিশাল অঞ্চলের নৌ-পুলিশের দায়িত্বপ্রাপ্ত এক কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, নৌ-পুলিশেরও কোনও অভিযান ছিল না।
হিজলা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা কেএম মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘গুলিতে জেলে নিহতের বিষয়টি আজ সকালে জানতে পেরেছি। তবে বুধবার রাতে আমাদের কোনও দল মেঘনা নদীতে অভিযানে যায়নি। আমাদের স্পিডবোট দুই দিন ধরে বিকল থাকায় ছোট ট্রলার নিয়ে গত দুই দিন সীমিত পরিসরে অভিযান চালানো হয়েছে। হয়তো অন্য জেলার অভিযানিক দল সেখানে অভিযান চালিয়েছে।’
মেমোনিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আফসার উদ্দিন বলেন, ‘বৃহস্পতিবার ভোরে কয়েকজন জেলে আমাকে খবর দিয়েছেন যে, মেঘনা নদীতে এক জেলেকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় ফেলে রাখা হয়েছে। খবর পেয়ে গিয়ে ওই জেলেকে উদ্ধার করি। এরপর পুলিশকে খবর দিলে পুলিশ এসে তাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। তবে কে বা কারা গুলি করেছে, সে বিষয়টি এখনও নিশ্চিত হতে পারিনি আমরা।’
হিজলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সোলায়মান হোসেন বলেন, ‘পুরো বিষয়টি তদন্তাধীন আছে। পাশাপাশি জেলের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে।’
হিজলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইলিয়াস সিকদার জানিয়েছেন, তিনি বিভিন্ন মাধ্যমে জানতে পেরেছেন চাঁদপুর নৌ-পুলিশের গুলিতে এক জেলে নিহত হয়েছেন। তার মরদেহ হাসপাতালে। এর বেশি কিছু তিনি জানেন না।
তবে চাঁদপুর নৌ-পুলিশের পুলিশ সুপার মোশফিকুর রহমান জানিয়েছেন, ওই এলাকায় বুধবার রাতে কিংবা আজ সকালে আমাদের কোনও অভিযান পরিচালিত হয়নি। এলাকাটি আমাদের অধীনস্থ নয়।











