নিজস্ব প্রতিবেদক:
বিপুলসংখ্যক ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) নির্বাচন কমিশনের (ইসি) বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইতিমধ্যে ওসব যন্ত্র ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এখন ইসি চাইলেও ওসব ইভিএম ধ্বংসও করতে পারছে না। বরং ওই যন্ত্রগুলো বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরির (বিএমটিএফ) ওয়্যারহাউস এবং বিভিন্ন জেলায় গুদামে রেখে প্রতি মাসে মোটা টাকা ভাড়া গুনতে হচ্ছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বেশি দামে দেড় লাখ ইভিএম কেনা হয়েছিল। কিন্তু এখন সেগুলো কোনো কাজেই লাগছে না। যদিও ২০২৪ সালে নতুন নির্বাচন কমিশনারের দায়িত্ব পাওয়ার পর পড়ে থাকা ইভিএমের বিষয়ে করণীয় ঠিক করতে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিলো। কিন্তু ওই কমিটি এখনো প্রতিবেদন জমা দেয়নি। নির্বাচন কমিশন (ইসি) সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, ইসি ইভিএমের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় ধ্বংস করতে পুড়ে ফেলতে চায়। কিন্তু তা সম্ভব হচ্ছে না। কারণ ইভিএম কেনাকাটায় দুর্নীতির অভিযোগ থাকায় দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্ত চলছে। তাছাড়া মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের নিরীক্ষা (অডিট) আপত্তিও রয়েছে। যন্ত্রগুলো পুড়িয়ে ফেললে নতুন ঝামেলা সৃষ্টির আশঙ্কায় ইসি সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। তাছাড়া ইভিএমগুলো পোড়াতে হলে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নিতে হবে। কারণ ইভিএম যন্ত্রে ব্যাটারি, সার্কিট বোর্ড, মেমরি চিপ থাকে। উন্মুক্ত পরিবেশে সেগুলো পোড়ালে বায়ুদূষণ হয়। যা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। ওসব যন্ত্র ল্যান্ডফিলে না ফেলে যত্রতত্র ফেললে মাটিও দূষিত হয়।
সূত্র জানায়, দেশের ৪১টি জেলা নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ে বিগত ২০২২ সাল থেকে ৭০ হাজার ইভিএম যন্ত্র সংরক্ষিত রয়েছে। সেজন্য প্রতি মাসে ভাড়া দিতে হচ্ছে। বিগত ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ইভিএম কেনার জন্য তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ৩ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্প নেয়। ইসি তখন পর্যায়ক্রমে দেড় লাখ ইভিএম কেনে। প্রতিটি ইভিএম কেনা হয় ২ লাখ ৩৫ হাজার টাকায়, যা ভারতের তুলনায় প্রায় ১১ গুণ বেশি। তাছাড়া ২০২৩ সালে নতুন করে আরো দুই লাখ ইভিএম যন্ত্র কেনার উদ্যোগ নেয়া হয়। তাতে ৮ হাজার ৭১১ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছিল। তবে দেড় লাখ ইভিএম কেনার সময় সেগুলো কোথায় রাখা হবে সে বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা রাখা হয়নি। এমনকি অর্থ বরাদ্দও রাখা হয়নি। ফলে বর্তমানে দেড় লাখ সেট ইভিএমের মধ্যে ৭০ হাজার মাঠপর্যায়ের ৪১ জেলায় বেসরকারি গুদামে রাখা হয়েছে। যেখানে প্রতি মাসে ৩৩ লাখ টাকা করে ভাড়া দিতে হচ্ছে। বাকি ৮০ হাজার ইভিএম যন্ত্র বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরির (বিএমটিএফ) আধুনিক ওয়্যারহাউসে সংরক্ষিত আছে। বিগত ২০১৯ সাল থেকে এসব যন্ত্র সেখানে রাখা হচ্ছে। বিএমটিএফের ওয়্যারহাউস ব্যবহার করায় তারা মাসিক প্রায় এক কোটি টাকা করে ভাড়া চেয়েছে। পাঁচ বছরে ওয়্যারহাউস ব্যবহার করায় বিএমটিএফ নির্বাচন কমিশনের কাছে ৭২ কোটি টাকা ভাড়া দাবি করেছে। ওই বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি চালাচালি করেও সুরাহা হয়নি। ফলে দিন দিন বাড়ছে বকেয়া ভাড়ার পরিমাণ।
সূত্র আরো জানায়, দেশের জেলা নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ে যেসব ইভিএম যন্ত্র সংরক্ষিত রয়েছে তার জন্য প্রতি মাসে ভাড়া দিতে হচ্ছে। তার মধ্যে জামালপুর জেলা নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ে সবচেয়ে বেশি ভাড়া দেয়া হচ্ছে। সেখানে বেসরকারি একটি গুদামে আড়াই হাজার ইভিএম রাখা হয়েছে। প্রতি মাসে ১ লাখ ৩৭ হাজার টাকা ভাড়া দিতে হচ্ছে। তাছাড়া মানিকগঞ্জ জেলা নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ের মাধ্যমেও একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের গুদামে সাড়ে তিন হাজার ইভিএম রাখা হয়েছে। সেজন্য প্রতি মাসে ১ লাখ ২৯ হাজার ৭৫০ টাকা ভাড়া দিতে হচ্ছে।
এদিকে দেড় লাখ ইভিএম সংরক্ষণে পরিকল্পনা কমিশনের কাছে ৪০ কোটি টাকা চেয়েছিল নির্বাচন কমিশন। তবে পরিকল্পনা কমিশন ওই টাকা দেয়নি। আর ইভিএমগুলোর কন্ট্রোল ইউনিট, মনিটর, ব্যাটারি ও ক্যাবলগুলো এখন অকার্যকর হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) তৈরি ইভিএম ২০১১ সালে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে একটি ওয়ার্ডে প্রথম ব্যবহার করা হয়। পরে ছোট আকারে ইভিএম ব্যবহার শুরু হয়। ২০১৩ সালে রাজশাহী সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ইভিএমে সমস্যা ধরা পড়ায় পরে ইভিএম ব্যবহার করা হয়নি। তারপর কে এম নূরুল হুদা নেতৃত্বাধীন কমিশন দায়িত্ব নেয়ার পর নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের উদ্যোগ নেয়। বিএমটিএফ কমিশনের জন্য ইভিএম তৈরি করে। এখন রাজনৈতিক দলগুলোও নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারে বিপক্ষে। আর নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনও তাদের প্রতিবেদনে ইভিএম ব্যবহার না করার সুপারিশ করেছিল। তাছাড়া গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) থেকেও ইভিএমের অংশ বাদ দিয়েছে নির্বাচন কমিশন।
অন্যদিকে এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ের অতিরিক্ত সচিব কে এম আলী নেওয়াজ জানান, দুদকের মামলা থাকার কারণে ইভিএমগুলো পোড়ানো যাচ্ছে না। নিরীক্ষা আপত্তি থাকায় কমিটি তাদের প্রতিবেদন জমা দিতে পারছে না। এখন ইভিএমগুলো গুদামে পড়ে রয়েছে। ওসব ইভিএম এখন আর নির্বাচনে ব্যবহার করা যাবে না।











