অনলাইন ডেস্ক:
উরুগুয়ের সাবেক প্রেসিডেন্ট ও বিশ্ব রাজনীতির ব্যতিক্রমী চরিত্র হোসে ‘পেপে’ মুজিকা আর নেই। দীর্ঘ এক বছরেরও বেশি সময় ধরে খাদ্যনালির ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করে ৮৯ বছর বয়সে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন তিনি। চলতি মে মাসের শুরুতে তাকে প্যালিয়েটিভ কেয়ারে নেওয়া হয়েছিল। মৃত্যুর আগে তিনি জানিয়ে গিয়েছিলেন, নিজের খামারে পোষা কুকুরের পাশে তাকে সমাহিত করতে।
২০১০ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত উরুগুয়ের প্রেসিডেন্ট ছিলেন মুজিকা। তিনি তার বেতনের বেশির ভাগ অংশ দান করতেন দাতব্য সংস্থায়। থাকতেন রাজধানী মন্টেভিডিওর উপকণ্ঠে নিজ খামারে। সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ ছিল একটি ১৯৮৭ সালের পুরনো ভক্সওয়াগন বিটল গাড়ি। স্যান্ডেল পরে সরকারি অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়া, সাধারণ জীবনযাপন এবং ভোগবাদের সমালোচনা তাকে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি এনে দেয় ‘বিশ্বের দরিদ্রতম প্রেসিডেন্ট’ হিসেবে।
মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেওয়া মুজিকা তার রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন ন্যাশনাল পার্টির সদস্য হিসেবে। ১৯৬০-এর দশকে সহ-প্রতিষ্ঠা করেন টুপামারোস ন্যাশনাল লিবারেশন মুভমেন্ট (এমএলএন-টি)—একটি বামপন্থী গেরিলা সংগঠন। এই সংগঠন হামলা, অপহরণ ও মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের মতো চরমপন্থী কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিল, যদিও মুজিকা বরাবরই দাবি করেছেন, তিনি কখনও কাউকে হত্যা করেননি।
এই সময়ে তাকে চারবার আটক করা হয়। ১৯৭০ সালে তাকে ছয়বার গুলি করা হয়েছিল। তিনি দুবার কারাগার থেকে পালান। একবার টানেল খুঁড়ে পালান ১০৫ বন্দির সঙ্গে। ১৯৭৩ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের পর তাকে ‘নয়জন জিম্মি’র মধ্যে রাখা হয় এবং নির্জন কারাবাসে ১৪ বছরের বেশি সময় কাটান।
১৯৮৫ সালে উরুগুয়ে গণতন্ত্রে ফিরে এলে তিনি মুক্তি পান। পরে সক্রিয় রাজনীতিতে ফিরে এসে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পান। তার শাসনামলে সামাজিক ন্যায়বিচার, শ্রমিক অধিকার, পরিবেশ ও গণতন্ত্র নিয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখেন। একবার বলেছিলেন, “রাজনীতির বাইরে বই পড়া ও জমিতে কাজ করতে আমার ভালো লাগত। এটা পেয়েছিলাম মায়ের কাছ থেকে।”
উরুগুয়ের প্রেসিডেন্ট ইয়ামান্দু ওরসি এক শোকবার্তায় বলেন, “পেপে মুজিকা ছিলেন প্রেসিডেন্ট, রাজনৈতিক কর্মী, নেতা ও বন্ধু। তাকে আমরা মিস করব।”
বলিভিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট ইভো মোরালেস স্মরণ করেছেন তার ‘অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞা’কে।
ব্রাজিল সরকার বলেছে, তিনি ছিলেন “আমাদের সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মানবতাবাদী”।
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের ভাষায়, “মুজিকা একটি উন্নত বিশ্বের স্বপ্নে বাঁচতেন।”
গুয়াতেমালার বার্নার্ডো আরেভালো বলেছেন, “তিনি নম্রতা ও মহত্ত্বের প্রতীক।”
২০২০ সালে রাজনীতি থেকে অবসর নেন মুজিকা। এরপরও তার ছোট খামারটি পরিণত হয় বামপন্থী রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক ও অনুসারীদের তীর্থস্থানে। ভোগবাদের বিরুদ্ধে তার অবস্থান স্পষ্ট ছিল। তিনি বলেছিলেন, “আমরা এমন সমাজ গড়ে তুলেছি, যেখানে কাজ করার সময় আছে, কিন্তু বাঁচার সময় নেই।”
মুজিকার স্ত্রী লুসিয়া তোপোলানস্কি এখনও জীবিত। গেরিলা আন্দোলনের সময় তাদের পরিচয়। এই দম্পতির কোনো সন্তান নেই। মৃত্যুর আগে তিনি জানিয়ে গিয়েছিলেন— পোষা কুকুরের পাশে তার খামারেই সমাহিত হতে চান।











