ভারতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনে যাচ্ছেন না তারেক রহমান

নিজস্ব প্রতিবেদক:

ভারতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকসের ১৮তম শীর্ষ সম্মেলনে বাংলাদেশের কোনো প্রতিনিধি অংশ নেবে না বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। তিনি বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ব্রিকসে আমন্ত্রণ জানানো হলেও তা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে। তবে অনুকূল পরিবেশ তৈরি হলে ভারতের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর দ্বিপক্ষীয় সফর হতে পারে।

 

বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬) রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে রোহিঙ্গা বিষয়ক আন্তর্জাতিক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। একই দিনে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে তিনি সরকারের অবস্থান ও কূটনৈতিক উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন।

 

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর ব্রিকসের ১৮তম শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এবারের সম্মেলনের আয়োজক ভারত। বাংলাদেশ ব্রিকসের সদস্য নয়। তবে বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সম্মেলনের আউটরিচ সেশনে অংশ নেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।

 

হুমায়ুন কবির বলেন, বাংলাদেশ সরকারের কাউকে আনুষ্ঠানিকভাবে ব্রিকস সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। প্রধানমন্ত্রীকে যে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, সেটি বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়। শেষ পর্যন্ত ওই আমন্ত্রণে সাড়া দিচ্ছেন না প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

 

তবে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর সফরের সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। অনুকূল পরিবেশ তৈরি হলে তারেক রহমান ভারত সফরে যেতে পারেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

 

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে শক্ত অবস্থানের কথা

 

রোহিঙ্গা সংকট নিয়েও এদিন সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন হুমায়ুন কবির। তিনি বলেন, বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছায়, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসন চায়। প্রত্যাবাসন বলতে শুধু সীমান্ত পার হয়ে মিয়ানমারে ফিরে যাওয়াকে বোঝায় না। সেখানে নিরাপত্তা, অধিকার, মর্যাদা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে আস্থা নিয়ে বসবাসের পরিবেশ নিশ্চিত হওয়াও এর অংশ।

 

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গাদের টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমারে উপযুক্ত পরিস্থিতি তৈরি করতে হবে। ভেরিফিকেশনের নামে মিয়ানমার সরকার যেন সময়ক্ষেপণ না করে, সে বিষয়েও তিনি সতর্ক করেন।

 

তিনি জানান, রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছে। এ সংকট সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আরও সক্রিয়ভাবে এগিয়ে আসার আহ্বানও জানান তিনি।

 

হুমায়ুন কবির বলেন, বাংলাদেশ জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ১০ লাখের বেশি মিয়ানমারের নাগরিককে আশ্রয় দিয়েছে। এতে দেশের অর্থনীতি, পরিবেশ, জনসেবা, স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও জাতীয় নিরাপত্তার ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। এরপরও বাংলাদেশ মানবিক দায়িত্ব পালন করেছে।

 

তিনি বলেন, মানবিক সহায়তার এই দায়িত্বকে সীমাহীন দায়িত্ব হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশ সৃষ্টি করেনি এবং এটি বাংলাদেশ একা সমাধানও করতে পারবে না। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে শুধু সংহতি প্রকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে অর্থায়ন, কূটনৈতিক উদ্যোগ ও দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্বের মাধ্যমে সংকট সমাধানে এগিয়ে আসতে হবে।

 

‘নির্বাচিত সরকার থাকায় শক্ত অবস্থানে বাংলাদেশ’

 

মিয়ানমারের সঙ্গে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে আলোচনায় বাংলাদেশের আগের অবস্থান দুর্বল ছিল বলেও মন্তব্য করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। এর কারণ হিসেবে তিনি দেশে গণতান্ত্রিক সরকার না থাকার কথা উল্লেখ করেন।

 

মালয়েশিয়ায় আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের একটি অংশকে ২৯ সেপ্টেম্বর থেকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরুর প্রসঙ্গ তুলে বাংলাদেশ একইভাবে প্রত্যাবাসন শুরু করতে পারছে না কেন, এমন প্রশ্নের জবাবে হুমায়ুন কবির বলেন, মালয়েশিয়ায় গণতান্ত্রিক সরকার রয়েছে এবং সেখানে নির্বাচনের একটি প্রক্রিয়া ছিল। বিপরীতে বাংলাদেশে দীর্ঘদিন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ছিল না।

 

তার ভাষ্য, আগের সরকারের জনগণের ম্যান্ডেট ছিল না এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের কারণে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও সেই সরকারের গ্রহণযোগ্যতা ছিল না। ফলে মিয়ানমারের সঙ্গে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে আলোচনার সময় বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী ছিল না।

 

হুমায়ুন কবির বলেন, এখন জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় রয়েছে। তাই মিয়ানমারের সঙ্গে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে বাংলাদেশ শক্ত অবস্থান থেকে আলোচনা করতে পারবে।

 

তিনি বলেন, মিয়ানমার সরকারও কোনো না কোনোভাবে বাংলাদেশের নির্বাচনে বিজয়ী সরকারকে অভিনন্দন জানিয়েছে। জনগণের বিপুল ম্যান্ডেট নিয়ে একটি সরকার ক্ষমতায় এসেছে, মিয়ানমারকে সেটি উপলব্ধি করতে হবে এবং সেই সরকারকে সম্মান করতে হবে।

 

এককভাবে সমাধান সম্ভব নয়

 

রোহিঙ্গা সংকটকে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা উদ্বেগের অন্যতম বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। তার মতে, এই সংকট সমাধানে কোনো একক পক্ষের পক্ষে সবকিছু করা সম্ভব নয়। একাধিক সংস্থা ও দেশের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

 

তিনি বলেন, মানবিক সহায়তা বাস্তুচ্যুতির পরিণতি মোকাবিলা করতে পারে। কিন্তু এই সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য রাজনৈতিক সমাধান প্রয়োজন। তাই মিয়ানমারের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনাও এমন পরিস্থিতি তৈরির দিকে কেন্দ্রীভূত করতে হবে, যাতে রোহিঙ্গারা নিরাপদ ও টেকসইভাবে রাখাইন রাজ্যে ফিরে যেতে পারে।

 

রোহিঙ্গা সংকটের নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা দেওয়া সম্ভব নয় বলেও জানান হুমায়ুন কবির। তবে সংকটের জরুরি পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে কূটনীতির মাধ্যমে দ্রুত কাজ করার কথা বলেন তিনি।

 

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার রোহিঙ্গা সংকটকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে বলেও জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। সরকারের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে যত দ্রুত সম্ভব সংকটটির সমাধান চায় বাংলাদেশ।

 

তিনি বলেন, নির্দিষ্ট করে আগামীকালই সমস্যার সমাধান হবে, এমন কথা বলা সম্ভব নয়। তবে সরকার সংকটটির সমাধানে আত্মবিশ্বাসী এবং একটি পারস্পরিক গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছানোর চেষ্টা করবে।

 

জাতিসংঘে গুরুত্ব বাড়ানোর উদ্যোগ

 

রোহিঙ্গা সংকটকে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক আলোচনায় আবারও গুরুত্বের কেন্দ্রে নিয়ে আসতে জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশনে বাংলাদেশের সভাপতিত্বকে কাজে লাগানোর কথা জানান হুমায়ুন কবির।

 

তিনি বলেন, বিশ্বের প্রধান বহুপক্ষীয় ফোরাম জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বাংলাদেশের সভাপতিত্বের সুযোগ কাজে লাগিয়ে রোহিঙ্গা সংকটের গুরুত্ব তুলে ধরা হবে।

 

এ জন্য চীন, সৌদি আরব, যুক্তরাষ্ট্র, আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোসহ গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় অংশীদার এবং জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে বাংলাদেশ কাজ করবে। এসব অংশীদারের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের টেকসই ও শান্তিপূর্ণ প্রত্যাবাসনের পথ তৈরি করতে চায় সরকার।

 

সেমিনারে পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম ও ইউএনএইচসিআরের বাংলাদেশে রিপ্রেজেন্টেটিভ ইভো ফ্রেইজেনও বক্তব্য দেন।

 

রোহিঙ্গা সংকট শুধু বাংলাদেশের সমস্যা নয় উল্লেখ করে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ইতোমধ্যে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে বড় মানবিক দায়িত্ব পালন করেছে। এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়েরও দায়িত্ব নিতে হবে।

 

তার আহ্বান, আন্তর্জাতিক অংশীদারদের শুধু সংহতি প্রকাশ না করে অর্থায়ন ও সক্রিয় কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে সংকট সমাধানে এগিয়ে আসতে হবে। কারণ রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার পাশাপাশি পুরো অঞ্চল এবং এর বাইরেও প্রভাব ফেলতে পারে।