নিজস্ব প্রতিবেদক:
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে। নতুন নেতৃত্ব ঘোষণার প্রস্তুতিও এখন শেষ পর্যায়ে। সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ শীর্ষ পদগুলো ঘিরে সংগঠনের ভেতরে চলছে শেষ মুহূর্তের হিসাব-নিকাশ, আলোচনা ও তদবির। দলীয় একাধিক সূত্রের দাবি, সবকিছু ঠিক থাকলে যেকোনো সময় নতুন কমিটি ঘোষণা হতে পারে। তবে একটি সূত্র জানিয়েছে, আগস্টের কার্যক্রম শেষ করে সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে নতুন কমিটি ঘোষণার সম্ভাবনা রয়েছে।
২০২৪ সালের ১ মার্চ মো. রাকিবুল ইসলাম রাকিবকে সভাপতি এবং নাছির উদ্দীন নাছিরকে সাধারণ সম্পাদক করে ছাত্রদলের সাত সদস্যের আংশিক কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হয়েছিল। একই বছরের ১৫ জুন ৩৯ জন সহসভাপতি ও ১১১ জন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকসহ মোট ২৬০ সদস্যের আংশিক পূর্ণাঙ্গ কমিটি অনুমোদন দেওয়া হয়। দুই বছরের নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০২৬ সালের ১ মার্চ।
বর্তমান কমিটির সময়ে ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ, বিভিন্ন পাবলিক ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, জেলা, মহানগর ও মেডিকেল কলেজসহ শতাধিক সাংগঠনিক ইউনিট পুনর্গঠন করা হয়েছে। নতুন কমিটি গঠনে এবার আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা, সাংগঠনিক দক্ষতা, রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে দলীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে।
বিএনপির এক জ্যেষ্ঠ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “আগস্টে বিভিন্ন ইস্যু আছে, নয়তো নতুন কমিটি আগস্টেই হতো। তবে এই কমিটির কার্যক্রম আগস্টেই শেষ হচ্ছে। কমিটির তালিকা তারেক রহমানের টেবিলে। আশা করি সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে কমিটি হবে। বিষয়টি খুব গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।”
সভাপতি পদে আলোচনায় যারা
ছাত্রদলের নতুন সভাপতি কে হচ্ছেন, তা নিয়ে একাধিক নেতার নাম ঘুরছে। বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির সিনিয়র সহসভাপতি আবু আফসান মোহাম্মদ ইয়াহইয়া, সাংগঠনিক সম্পাদক আমান উল্লাহ আমান, সহসভাপতি ডা. তৌহিদুর রহমান আউয়াল, এজাজুল কবির রুয়েল, মনজুরুল আলম রিয়াদ, খোরশেদ আলম সোহেলসহ কয়েকজনকে নিয়ে আলোচনা রয়েছে।
এ ছাড়া আনোয়ার পারভেজ, ইব্রাহিম খলিল, মমিনুল ইসলাম জিসান, কাজী জিয়া উদ্দিন বাসিত, রাজু আহমেদ, শরীফ প্রধান শুভ, মোস্তাফিজুর রহমান, ফারুক হোসেনসহ আরও কয়েকজনের নামও শীর্ষ নেতৃত্বের আলোচনায় রয়েছে।
আবু আফসান মোহাম্মদ ইয়াহইয়া বর্তমানে ছাত্রদলের সিনিয়র সহসভাপতি। এর আগে তিনি সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় থাকার পাশাপাশি ২০২২ সালের ২৪ মে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে হামলায় আহত হওয়ার তথ্যও রয়েছে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গে।
২০২৩ সালে বিএনপির অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে গ্রেপ্তার হয়ে কারাবরণ করেন ইয়াহইয়া। ২৮ অক্টোবরের পর বিএনপির হরতাল-অবরোধ কর্মসূচিতে ঢাকা মহানগর উত্তর ও পশ্চিম এলাকায় ছাত্রদলের সমন্বয়ের দায়িত্বও পালন করেন তিনি। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় শাহবাগ, বাংলামোটর, সায়েন্সল্যাব, ধানমন্ডি ও মোহাম্মদপুর এলাকায় আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
অন্যদিকে সাংগঠনিক সম্পাদক আমান উল্লাহ আমানও সভাপতি পদের আলোচনায় রয়েছেন। এর আগে তিনি কেন্দ্রীয় সংসদের যুগ্ম সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ২৮ অক্টোবর-পরবর্তী আন্দোলনে গ্রেপ্তার হয়ে দুই মাস কারাগারে ছিলেন। পরে রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সংগঠনকে সক্রিয় করা এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ইতিবাচক ছাত্ররাজনীতি নিয়ে কর্মসূচিতে অংশ নেন।
সহসভাপতি এজাজুল কবির রুয়েলও আলোচনায় রয়েছেন। এর আগে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা ও গ্রেপ্তারের তথ্য রয়েছে।
সাধারণ সম্পাদক পদেও একাধিক নাম
সভাপতির পাশাপাশি সাধারণ সম্পাদক পদ নিয়েও চলছে জোর আলোচনা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সভাপতি গণেশ চন্দ্র রায় সাহস, সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন, কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রাজু আহমেদ, মমিনুল ইসলাম জিসান, ইব্রাহিম খলিল, মোস্তাফিজুর রহমান ও ফারুক হোসেনের নাম আলোচনায় রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে থেকেও কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে আসার সম্ভাবনায় কয়েকজনের নাম রয়েছে। তাঁদের মধ্যে কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি ডা. তৌহিদুর রহমান আউয়াল, কাজী জিয়া উদ্দিন বাসিত, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শাহরিয়ার হক মজুমদার শিমুল এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক এম. রাজীবুল ইসলাম তালুকদার বিন্দুর নাম উল্লেখ করা হচ্ছে।
ডা. তৌহিদুর রহমান আউয়াল এর আগে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, ১ নম্বর সহসাংগঠনিক সম্পাদক ও সহস্বাস্থ্য সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে তিনটি মামলা এবং গ্রেপ্তারের তথ্য রয়েছে। বর্তমানে তিনি সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজে এফসিপিএস অধ্যয়ন করছেন।
শীর্ষ পদে নিজের প্রত্যাশা সম্পর্কে বাংলা ট্রিবিউনকে তৌহিদুর রহমান আউয়াল বলেন, “কমিটি গঠন একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। ছাত্রদলের যারা পদপ্রত্যাশী, তারা সকলেই যোগ্য। এর মধ্য থেকে আমাদের সাংগঠনিক অভিভাবক তারেক রহমান যাদের নির্বাচন করবেন, আমরা সবাই তাঁকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করবো। আমাদের মাঝে নেতৃত্বের সুস্থ প্রতিযোগিতা আছে। তবে কোনো অসুস্থ প্রতিদ্বন্দ্বিতা নেই।”
কাজী জিয়া উদ্দিন বাসিতের নামও শীর্ষ নেতৃত্বের আলোচনায় রয়েছে। ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় থাকার কারণে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা, গ্রেপ্তার ও কারাভোগের তথ্য রয়েছে। ২০১৫ সালের অবরোধের সময় একটি নির্মাণাধীন ভবন থেকে পুলিশ তাঁকে ফেলে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। পরে দীর্ঘ সময় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি।
শেষ সিদ্ধান্ত বিএনপির হাইকমান্ডের
নতুন কমিটি নিয়ে পদপ্রত্যাশী নেতাদের মধ্যে তৎপরতা বাড়লেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বিএনপির হাইকমান্ডই নেবে। পদপ্রত্যাশীদের অতীত রাজনৈতিক ভূমিকা, আন্দোলন-সংগ্রামে অংশগ্রহণ, সাংগঠনিক দক্ষতা, গ্রহণযোগ্যতা ও বিভিন্ন বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়ার পর শীর্ষ দুই পদসহ গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো নির্ধারণ করা হতে পারে।
পদপ্রত্যাশী নেতাদের বক্তব্যেও একই সুর। তাঁরা বলছেন, আন্দোলন-সংগ্রামে পরীক্ষিত ও ত্যাগী নেতাদের হাতে নেতৃত্ব দেওয়া হলে সংগঠন আরও শক্তিশালী হবে। তবে শেষ পর্যন্ত তারেক রহমান যাঁদের দায়িত্ব দেবেন, তাঁদের নেতৃত্ব মেনে নিয়েই সংগঠনের জন্য কাজ করার কথা জানিয়েছেন তাঁরা।
এদিকে নতুন নেতৃত্ব নিয়ে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যেও কৌতূহল তৈরি হয়েছে। কারা সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হচ্ছেন, সেটিই এখন সংগঠনের ভেতরে সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্ন। কমিটি ঘোষণার সঙ্গে শেষ হবে দীর্ঘ অপেক্ষা, শুরু হবে ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্বের যাত্রা।











