রংপুর লংমার্চে বিশৃঙ্খলা চাই না, বাধা না দেওয়ার আহ্বান গোলাম পরওয়ারের

নিজস্ব প্রতিবেদক:

১১ দলীয় ঐক্যের ঢাকা থেকে রংপুর অভিমুখী লংমার্চ শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে হবে বলে জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেছেন, কর্মসূচিতে কোনো ধরনের অস্থিতিশীলতা, বিশৃঙ্খলা বা ভাঙচুরের পরিকল্পনা নেই। একই সঙ্গে কর্মসূচিতে ইচ্ছাকৃতভাবে বাধা দিয়ে দেশের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নষ্ট না করতে সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

 

বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) দুপুরে রাজধানীর মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে ১১ দলীয় ঐক্যের শীর্ষ নেতাদের বৈঠক শেষে প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেন গোলাম পরওয়ার। আগামী শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) অনুষ্ঠেয় ঢাকা থেকে রংপুর লংমার্চের প্রস্তুতি ও বাস্তবায়ন নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়। বৈঠকে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির শফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে জোটের শীর্ষ নেতারা অংশ নেন। এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামসহ অন্য নেতারাও বৈঠকে ছিলেন।

 

গোলাম পরওয়ার বলেন, লংমার্চের বিষয়ে সরকার, প্রশাসন, পুলিশ, ট্রাফিক, গোয়েন্দা সংস্থা, সিভিল সোসাইটি এবং কর্মসূচির পথের সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারদের লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। তাঁদের এই নিয়মতান্ত্রিক কর্মসূচিতে সহযোগিতা করার আহ্বানও জানানো হয়েছে।

 

তিনি বলেন, “আমাদের কর্মসূচি হবে নন-ভায়োলেন্ট, নিয়মতান্ত্রিক। অস্থিতিশীলতা, বিশৃঙ্খলা, ভাঙচুর, এই জাতীয় কোনো চিন্তা বা কর্মসূচি আমাদের ১১ দলের মধ্যে নেই। আমাদের গোটা কর্মসূচি হবে শান্তিপূর্ণ।”

 

কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে কর্মসূচিতে বাধা দিয়ে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করলে তা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়ে গোলাম পরওয়ার বলেন, শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক কর্মসূচিকে বাধাগ্রস্ত করে দেশের জন্য কোনো ভুল বার্তা দেওয়া বা কর্মসূচিকে নস্যাৎ করার চেষ্টা না করাই ভালো। তিনি বলেন, “আমরা যেহেতু কোনো বিশৃঙ্খলা চাই না, হতে দেব না, অহেতুক কেন আপনি পায়ে পাড়া দিয়ে গন্ডগোল করে শান্ত দেশকে অশান্ত করে তুলবেন?”

 

১৯ সেপ্টেম্বরের কর্মসূচিতে যা থাকছে

 

গোলাম পরওয়ার জানান, ১৯ সেপ্টেম্বর সকাল ৭টায় রাজধানীর ঐতিহাসিক মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে লংমার্চের উদ্বোধনী জনসভা শুরু হবে। সভা চলবে সকাল ৮টা পর্যন্ত। এরপর সুশৃঙ্খল গাড়িবহর রংপুরের উদ্দেশে যাত্রা করবে।

 

মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ থেকে গাজীপুর ও টঙ্গী হয়ে প্রথম পথসভা হবে গাজীপুর বাইপাসের ভোগড়া এলাকায়। এরপর টাঙ্গাইলের নগর জালফৈ মোড়ে দ্বিতীয় পথসভা হওয়ার কথা রয়েছে। যমুনা সেতু পার হয়ে সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুল মোড়েও পথসভা হবে। সেখানে দুপুরের দিকে পৌঁছানোর আশা করা হচ্ছে এবং জোহরের নামাজ আদায়ের সুযোগ রাখা হবে।

 

এরপর লংমার্চ যাবে গাইবান্ধার পলাশবাড়ীর দিকে। সেখানে সন্ধ্যা বা মাগরিবের সময়ের দিকে পথসভা হতে পারে। তবে পথে পরিস্থিতির কারণে সময়সূচিতে কিছুটা পরিবর্তন হতে পারে বলে জানিয়েছেন গোলাম পরওয়ার। সবশেষে রংপুর জেলা স্কুল মাঠে গিয়ে কর্মসূচি শেষ হবে।

 

লংমার্চের গাড়িবহরে বিভিন্ন জেলার নেতাকর্মীদের যুক্ত হওয়ার সুযোগ থাকবে। গাড়িবহরের শেষে বিভিন্ন জেলা থেকে আসা অংশগ্রহণকারীদের গাড়ি যুক্ত হবে। বহরে সাংস্কৃতিক বিভাগের সংগীত পরিবেশনের গাড়িও থাকবে। এর পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবক, নিরাপত্তা, মেডিকেল ও অ্যাম্বুলেন্স টিম, আইটি টিম এবং মিডিয়া টিম দায়িত্ব পালন করবে।

 

গোলাম পরওয়ার বলেন, “সবগুলোরই একটা সুশৃঙ্খল গাড়িবহরের মধ্য দিয়ে আমাদের এই লংমার্চের বহর ইনশাআল্লাহ যাত্রা করবে।”

 

লংমার্চের পথ ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চের চেয়ে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দীর্ঘ হবে বলেও জানান তিনি। এ কারণে পথে আলাদা করে রান্না করা খাবারের ব্যবস্থা রাখা সম্ভব হবে না। অংশগ্রহণকারীদের নিজেদের গাড়িতে শুকনা খাবার, পানি, ওষুধপত্রসহ প্রয়োজনীয় জিনিস সঙ্গে রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে। পথে খাবারের কোনো ব্যবস্থা থাকবে না বলে জানান তিনি।

 

গণভোটের রায় নিয়ে সরকারের সমালোচনা

 

প্রেস ব্রিফিংয়ে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলেন গোলাম পরওয়ার। তাঁর দাবি, গণভোটের গণরায় প্রত্যাখ্যানের কারণে দেশে বড় ধরনের রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছে।

 

তিনি বলেন, গণভোটে প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষের ‘হ্যাঁ’ ভোটের রায় প্রত্যাখ্যান করার নজির নেই। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, নির্বাচনের পর একটি সরকার গণভোট বা রেফারেন্ডামের রায় বাতিল বা প্রত্যাখ্যান করতে পারে, এমন নজির পৃথিবীর ইতিহাসে নেই।

 

গোলাম পরওয়ারের বক্তব্য অনুযায়ী, সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে জনগণের আকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। তিনি সরকারের উদ্দেশে বলেন, “আমরা সরকারকে অনুরোধ করব, সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরকে কাজে লাগিয়ে কখনোই জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে যাবেন না।”

 

তিনি অভিযোগ করেন, সংখ্যাগরিষ্ঠতার শক্তি ব্যবহার করে সরকার বিভিন্ন ক্ষেত্রে জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে খর্ব করছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচন এবং এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের নির্বাচনে অযোগ্য করার প্রসঙ্গও তিনি তোলেন।

 

এ প্রসঙ্গে গোলাম পরওয়ার বলেন, সংখ্যাগরিষ্ঠতার ক্ষমতা প্রয়োগ করতে গিয়ে কেউ যেন কর্তৃত্ববাদী চরিত্রের দিকে না যায়। তাঁর ভাষায়, অতীতে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ক্ষমতা দেখাতে গিয়ে অনেকেই কর্তৃত্ববাদী ও ফ্যাসিবাদী চরিত্র অর্জন করেছিলেন। “এখান থেকে আমরা সরকারকে ফিরে আসতে বলব,” বলেন তিনি।

 

সংবিধান সংস্কার নিয়েও বক্তব্য

 

সংবিধান নিয়ে গোলাম পরওয়ার বলেন, তাঁরা সংবিধান সংশোধনের পরিবর্তে সংস্কারের পক্ষে। ঐকমত্য কমিশনে সংবিধান সংস্কার নিয়ে যেসব সিদ্ধান্ত ও অঙ্গীকার হয়েছিল, সেগুলো বাস্তবায়নের দাবি জানান তিনি।

 

তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সংবিধানের মৌলিক কাঠামোয় পরিবর্তনের মতো বিষয়ে সাধারণ সংসদের পরিবর্তে সংবিধান সংস্কার পরিষদের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। এ বিষয়ে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপও কামনা করেন তিনি।

 

সময় থাকতে সরকারকে সংশোধনের পথ থেকে সরে এসে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে গোলাম পরওয়ার সতর্ক করেন, তা না হলে দেশে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে।

 

তিনি জানান, সংবিধান সংস্কারের দাবিতে ২০ সেপ্টেম্বর দুপুর ১২টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবে ১১ দলের পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলন করা হবে। সেখানে জোটের শীর্ষ নেতারা এ বিষয়ে বিস্তারিত বক্তব্য দেবেন।

 

১১ দলীয় ঐক্যের পক্ষ থেকে এর আগে জানানো হয়েছে, ১৯ সেপ্টেম্বরের ঢাকা থেকে রংপুর লংমার্চে বিভিন্ন জেলার নেতাকর্মীদের অংশগ্রহণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। কর্মসূচির ঘোষিত পথেও একাধিক পথসভা আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।