নিজস্ব প্রতিবেদক:
খুলনার রূপসা ঘাটে যাত্রী পারাপারে অতিরিক্ত অর্থ আদায় এবং রূপসা সেতুর অ্যাপ্রোচ সড়ক নির্মাণে দুর্নীতির অভিযোগে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি বলেছেন, কয়েকজন রাজনৈতিক ব্যক্তি বা গডফাদারের কারণে পুরো দলের বদনাম সরকার মেনে নেবে না। এমনকি তার দলের কেউ জড়িত থাকলেও ছাড় দেওয়া হবে না।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) খুলনা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে আইনশৃঙ্খলা, জননিরাপত্তা, মাদক ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, সুশাসন এবং জেলার উন্নয়ন কর্মকাণ্ড নিয়ে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় এসব কথা বলেন আইনমন্ত্রী।
রূপসা ঘাটের অনিয়মের প্রসঙ্গ তুলে মো. আসাদুজ্জামান বলেন, নদী পার হওয়ার পর যাত্রীদের ব্যাগ পারাপারের জন্যও আলাদা টাকা নেওয়া হচ্ছে। বিষয়টি জানতে পেরে তিনি জেলা প্রশাসককে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। সম্ভব হলে পরবর্তী দিন থেকেই সেখানে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার কথাও জানান তিনি।
রূপসা সেতুর অ্যাপ্রোচ সড়ক নির্মাণের দুর্নীতির অভিযোগকে ‘মহাদুর্নীতি’ হিসেবে উল্লেখ করেন আইনমন্ত্রী। তিনি বলেন, ৩ দশমিক ৭৫ কিলোমিটার সড়কটির কাজ ৯৫ শতাংশের বেশি শেষ হয়েছে দেখিয়ে চতুর্থবার প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছিল।
তার তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে টেন্ডার হওয়া প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় ছিল প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ কোটি টাকা। পরে সেই ব্যয় বেড়ে ২৮০ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর প্রধানমন্ত্রী এটিকে শুধু দুর্নীতি নয়, ‘মহাদুর্নীতি’ বলে মন্তব্য করেন। পরে মন্ত্রিসভা সচিবের নেতৃত্বে তদন্ত করা হয়। তদন্তে রূপসা ঘাট এলাকায় সড়ক নির্মাণকে কেন্দ্র করে বড় ধরনের দুর্নীতির চিত্র পাওয়া গেছে বলে জানান তিনি।
আইনমন্ত্রী বলেন, “রূপসা ঘাটে পাঁচ-দশজন ব্যক্তির লাভবান হওয়ার জন্য পুরো দলের বদনাম সরকার মেনে নেবে না।” প্রশাসনকে আইনগতভাবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশও দেন তিনি।
ক্রসফায়ারের পথে যাবে না সরকার
সন্ত্রাস ও অপরাধ দমনে সরকার ক্রসফায়ারের পথে যাবে না বলেও স্পষ্ট করেছেন আইনমন্ত্রী। তিনি বলেন, সন্ত্রাস দমনে প্রচলিত আইন রয়েছে। প্রয়োজন হলে সেই আইন আরও কঠোর করা হবে। তবে কোনোভাবেই বেআইনি পথে যাওয়া হবে না।
মো. আসাদুজ্জামান বলেন, “সন্ত্রাস দমনের জন্য ক্রসফায়ার করতে হবে, নট নেসেসারি। সন্ত্রাস দমনের জন্য আমাদের যে আইন আছে, সেটাই যথেষ্ট। সে আইনকে যদি সংশোধন করে কোনো কঠিন প্রক্রিয়া আনতে হয়, আমরা সেটাও করব। বাট বেআইনি পথে আমরা হাঁটব না।”
তিনি আরও বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের পদক্ষেপ হবে আইনি প্রক্রিয়া ও মানবাধিকারের ভিত্তিতে।
জামিনে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের অভিযোগ নাকচ
জামিনের বিষয়ে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের অভিযোগও নাকচ করেন আইনমন্ত্রী। তার দাবি, বিচার বিভাগ স্বাধীন এবং সরকার বিচার বিভাগে হস্তক্ষেপ করে না।
তিনি বলেন, টেলিফোন করে কাউকে জামিন দেওয়া বা জামিন না দেওয়ার নির্দেশ দেওয়ার প্রশ্নই আসে না। সরকারি কৌঁসুলিরা আইনগতভাবে জামিনের বিরোধিতা করার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবেন।
সাংবাদিকদের উদ্দেশে মন্ত্রী বলেন, কোনো মামলায় সরকারি কৌঁসুলির কার্যালয় মৃদু আপত্তি জানালে বা আপত্তি না তুললে তথ্য দিয়ে সংবাদ প্রকাশ করতে হবে।
“আমাকে তথ্য দেবেন, নিউজ করবেন। বাকিটা ইতিহাস হবে, বাকিটা আমি দেখব। সেখানে আমরা কোনো কম্প্রোমাইজ করব না”, বলেন তিনি।
মাদক নিয়ন্ত্রণে ডোপ টেস্টের ওপর গুরুত্ব
মাদক নিয়ন্ত্রণে ডোপ টেস্ট চালুর অভিজ্ঞতাও তুলে ধরেন আইনমন্ত্রী। তিনি জানান, শৈলকূপা ও ঝিনাইদহে এই পদ্ধতি কার্যকরভাবে কাজ করছে। মাদকাসক্ত বা মাদকের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার সন্দেহে আটক ব্যক্তির ঘটনাস্থলেই পরীক্ষা করা হচ্ছে। পরীক্ষায় ফল পজিটিভ হলে বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে সামারি ট্রায়ালের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
মাদক পাচার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে পরিকল্পিতভাবে দেশে মাদক ঢোকানো হচ্ছে। সীমান্তের ওপারে বসে ইয়াবা চোরাকারবারিরা নানা পরিকল্পনা করছে। এমনকি ড্রোন ব্যবহার করেও বিভিন্ন এলাকায় মাদক পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
রাষ্ট্রযন্ত্রে পচন ধরেছিল: আইনমন্ত্রী
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে গত ১৭ বছরে রাষ্ট্রযন্ত্রে পচন ধরেছিল বলে মন্তব্য করেন মো. আসাদুজ্জামান। তার দাবি, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত এবং ৩০ হাজার মানুষ পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত অনেকেই এখনো চাকরিতে বহাল রয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
আইনমন্ত্রী বলেন, রাষ্ট্রযন্ত্রের ‘আবর্জনা পরিষ্কার’ করতে সরকারকে সময় দিতে হবে। সরকারের ছয় মাসের কার্যক্রম নিয়ে সমালোচনার জবাবে তিনি বলেন, পরিবর্তন ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হচ্ছে।
সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে তিনি মন্ত্রীদের জ্বালানি বরাদ্দ ৩০ শতাংশ কমানো এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রটোকল কমানোর বিষয় উল্লেখ করেন। কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষিঋণ মওকুফসহ বিভিন্ন কল্যাণমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
এ ছাড়া সাইবার সুরক্ষা ও অনলাইন নিরাপত্তার জন্য অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে আইন প্রণয়নের উদ্যোগের কথা জানান আইনমন্ত্রী। মাদক ও জুয়া সংক্রান্ত আইনের শক্তিশালী প্রয়োগ নিশ্চিত করার কথাও বলেন তিনি।
মতবিনিময় সভায় জাতীয় সংসদের হুইপ রকিবুল ইসলাম বকুল, খুলনা-৪ আসনের সংসদ সদস্য এস কে আজিজুল বারী হেলাল, খুলনা-১ আসনের সংসদ সদস্য আমীর এজাজ খান, বিভাগীয় কমিশনার মো. আবদুল্লাহ হারুন, রেঞ্জ ডিআইজি মো. মোস্তাফিজুর রহমান, পুলিশ কমিশনার মো. সাজ্জাদুর রহমান, পুলিশ সুপার সরকার ওমর ফারুক, কেসিসি প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু, কেডিএ চেয়ারম্যান এস এম শফিকুল আলম, ওয়াসার চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, জেলা পরিষদ প্রশাসক এস এম মনিরুল হাসান বাপ্পীসহ প্রশাসনের কর্মকর্তা, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, সুশীল সমাজ ও গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে সকাল ৯টায় খুলনা জেলা জজ আদালতের সম্মেলন কক্ষে বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন আইনমন্ত্রী। সেখানে মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করে আদালতের মামলা জট কমানোর জন্য বিচারকদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।











