রাজস্ব আদায়ে ৮৭ হাজার ৫২৭ কোটি টাকা ঘাটতি, প্রবৃদ্ধি ১২ শতাংশ

নিজস্ব প্রতিবেদক:

সদ্য শেষ হওয়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারেনি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। কাস্টমস, ভ্যাট ও আয়কর, এই তিন প্রধান খাত মিলিয়ে বছরটিতে ৪ লাখ ১৫ হাজার ৪৭৩ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে। অথচ সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা। ফলে অর্থবছর শেষে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৮৭ হাজার ৫২৭ কোটি টাকা।

 

তবে লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হলেও আগের অর্থবছরের তুলনায় রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এনবিআরের মোট রাজস্ব আদায় হয়েছিল ৩ লাখ ৭০ হাজার ৮৭৫ কোটি ৮ লাখ টাকা। সেই হিসাবে সদ্য শেষ হওয়া অর্থবছরে আদায় বেড়েছে ১২ দশমিক ০৩ শতাংশ।

 

মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) এনবিআরের গবেষণা ও পরিসংখ্যান অনুবিভাগ প্রকাশিত ‘২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুন শেষের রাজস্ব আহরণের চিত্র’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

 

২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল ৪ লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকা। পরে সংশোধিত বাজেটে তা বাড়িয়ে ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা করা হয়। কিন্তু অর্থবছর শেষে সেই লক্ষ্যের তুলনায় ৮৭ হাজার ৫২৭ কোটি টাকা কম রাজস্ব আদায় হয়েছে।

 

এর আগে থেকেই অর্থনীতিবিদ ও বিভিন্ন সংগঠন রাজস্ব আদায়ের এই লক্ষ্যকে উচ্চাভিলাষী বলে আসছিলেন। তাদের যুক্তি ছিল, লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে রাজস্ব আদায়ে প্রায় ৪৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন হবে, যা অতীতে দেখা যায়নি। সাধারণত ভালো পরিস্থিতিতেও রাজস্ব প্রবৃদ্ধি ১০ থেকে ১৫ শতাংশের মধ্যে থাকে।

 

অর্থবছরের শেষ মাস জুনেও লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় হয়নি। ওই মাসে সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৬০ হাজার ৯১৫ কোটি টাকা। এর বিপরীতে আদায় হয়েছে ৫৪ হাজার ৫২৩ কোটি টাকা। ফলে শুধু জুনেই ঘাটতি হয়েছে ৬ হাজার ৩৯২ কোটি টাকা। তবে আগের বছরের একই মাসের তুলনায় জুনে রাজস্ব আদায় বেড়েছে ২৬ দশমিক ৫৪ শতাংশ।

 

খাতভিত্তিক হিসাবে বিদায়ী অর্থবছরে সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি এসেছে আয়কর খাত থেকে। কোম্পানি কর, ভ্রমণ কর ও উৎসে করসহ এ খাত থেকে মোট ১ লাখ ৪৫ হাজার ৬২০ কোটি টাকা আদায় হয়েছে।

 

২০২৪-২৫ অর্থবছরে আয়কর খাত থেকে আদায় হয়েছিল ১ লাখ ২৯ হাজার ৯০ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। ফলে এক বছরে এ খাতে রাজস্ব আদায় বেড়েছে ১২ দশমিক ৮০ শতাংশ।

 

রাজস্ব আদায়ের সবচেয়ে বড় উৎস ভ্যাট খাত থেকেও আয় বেড়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট থেকে আদায় হয়েছে ১ লাখ ৫৭ হাজার ৭৩৪ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরে এ খাতে আদায় হয়েছিল ১ লাখ ৪১ হাজার ৫৭৬ কোটি টাকা। ফলে ভ্যাট আদায়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১১ দশমিক ৮০ শতাংশ।

 

অন্যদিকে আমদানি ও রপ্তানি শুল্ক থেকে বিদায়ী অর্থবছরে আদায় হয়েছে ১ লাখ ১২ হাজার ১১৯ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ খাতে আদায় হয়েছিল ১ লাখ ৯৮ কোটি টাকা। এতে কাস্টমস খাতে রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১১ দশমিক ৯০ শতাংশ।

 

তবে কাস্টমসের বিস্তারিত হিসাবে দেখা যায়, আমদানি পর্যায়ে ভ্যাট আদায়ে ১১ দশমিক ৯০ শতাংশ এবং সম্পূরক শুল্কে ৪ দশমিক ১৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। বিপরীতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও মূল আমদানি শুল্ক থেকে এনবিআরের আদায় আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৬ দশমিক ৯৮ শতাংশ কমেছে।

 

রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ঘাটতি থাকলেও তিন প্রধান খাতেই আগের বছরের তুলনায় আদায় বেড়েছে। তবে সামগ্রিক রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অনেকটাই কম থাকায় সরকারের অর্থ ব্যবস্থাপনায় বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

 

২০২৬-২৭ অর্থবছরে এনবিআরকে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এই লক্ষ্য পূরণ করতে হলে বিদায়ী অর্থবছরের আদায়ের তুলনায় ৪৫ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে।

 

অর্থাৎ, সদ্য শেষ হওয়া অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়ার পর নতুন অর্থবছরে এনবিআরের সামনে আরও বড় রাজস্ব আদায়ের চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।