নিজস্ব প্রতিবেদক:
রাষ্ট্রদ্রোহের মামলায় ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ক্যান্টনমেন্ট থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রাকিবুল হাসানকে আরও দুই দিনের রিমান্ডে নেওয়ার অনুমতি দিয়েছেন আদালত। আগের পাঁচ দিনের রিমান্ড শেষে নতুন করে তিন দিনের রিমান্ড আবেদন করা হলে আদালত দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ইসরাত হাসান এ আদেশ দেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির গুলশান জোনাল টিমের পরিদর্শক মো. জেহাদ হোসেন রাকিবুলকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নতুন করে রিমান্ডের আবেদন করেন। আবেদনে বলা হয়, আগের দফায় জিজ্ঞাসাবাদে রাকিবুল মামলার তদন্তের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। এসব তথ্য যাচাই এবং মামলার তদন্ত এগিয়ে নিতে তাকে আরও জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন।
তদন্তকারীরা বলছেন, রাকিবুলের নামে ছড়িয়ে পড়া একটি ৪ মিনিট ২৯ সেকেন্ডের অডিও সংরক্ষণ করে ডিভিডিতে ধারণ করা হয়েছে এবং সেটি জব্দ করা হয়েছে। ওই অডিওর কণ্ঠস্বর রাকিবুলের কি না, তা যাচাই করতে তার কণ্ঠের নমুনা নেওয়া হবে। পরে অডিওতে থাকা কণ্ঠের সঙ্গে তার কণ্ঠের তুলনামূলক পরীক্ষা করা হবে।
এ ছাড়া অডিওতে রাকিবুল যাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন বলে দাবি করা হচ্ছে, সেই ব্যক্তিকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের জন্য রাকিবুলকে নিয়ে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালানোর প্রয়োজন রয়েছে বলেও রিমান্ড আবেদনে উল্লেখ করা হয়।
আদালতে রাকিবুলের পক্ষে আইনজীবী মোরশেদ হোসেন শাহীন রিমান্ডের বিরোধিতা করে জামিন আবেদন করেন। তিনি বলেন, এর আগে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হলেও ওই রিমান্ডে তদন্তে কী অগ্রগতি হয়েছে বা কী তথ্য পাওয়া গেছে, তা আগের রিমান্ড আবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি। ফলে নতুন করে রিমান্ডের প্রয়োজনীয়তাও স্পষ্ট নয়।
আইনজীবী আরও বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি অডিওকে কেন্দ্র করে মামলাটি করা হয়েছে। অভিযোগ যদি শুধু অডিও প্রকাশ বা প্রচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে সেটি সাইবার আইনের বিষয় হতে পারে। কিন্তু মামলাটি রাষ্ট্রদ্রোহের ধারায় করা হয়েছে, যেখানে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার মতো অভিযোগের বিষয় রয়েছে। অথচ মামলার অভিযোগে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার কোনো সুনির্দিষ্ট কর্মকাণ্ডের কথা উল্লেখ নেই বলে দাবি করেন তিনি।
জামিন পেলে রাকিবুল পালিয়ে যাবেন না এবং তদন্তে সহযোগিতা করবেন বলেও আদালতে জানান তার আইনজীবী।
মামলার নথি ও তদন্ত সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ১৬ সেপ্টেম্বর রাতে একটি অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। অডিওটি রাকিবুল হাসানের বলে দাবি করা হলেও এখনো তার কণ্ঠের বিষয়টি তদন্তে নিশ্চিত হয়নি। অডিওতে শেখ হাসিনা ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশে ফিরতে পারেন, পুলিশের সক্ষমতা ও মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি, পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক অবস্থান, বিভিন্ন কর্মকর্তার পদায়ন এবং পদায়ন ঘিরে আর্থিক লেনদেনের মতো বিভিন্ন বিষয়ে কথোপকথন রয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
অডিওতে এমন কথাও রয়েছে বলে তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন যে, রাস্তায় থাকা পুলিশ দুর্বল এবং শেখ হাসিনা ডিসেম্বর মাসে দেশে ফিরলে পুলিশ কিছু করতে পারবে না। এ ছাড়া পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের একটি অংশ বিএনপির দিকে ঝুঁকে আছে, আর মাঠপর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তারা সে অবস্থানে নেই বলেও কথোপকথনে দাবি করা হয়েছে।
অডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর রাকিবুলকে ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসির পদ থেকে প্রত্যাহার করে ডিএমপি। এ জন্য ডিএমপির এক আদেশে প্রশাসনিক কারণের কথা উল্লেখ করা হয়। পরে বিষয়টি তদন্তে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির সামনে রাকিবুলকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় এবং তাকে ডিবি কার্যালয়েও নেওয়া হয়।
এরপর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পর ক্যান্টনমেন্ট থানার পরিদর্শক সুব্রত দেবনাথ রাষ্ট্রদ্রোহের মামলাটি করেন। মামলায় রাকিবুলসহ অজ্ঞাতনামা কয়েকজনকে আসামি করা হয়।
২৪ সেপ্টেম্বর মামলায় রাকিবুলকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। ওই দিন তাকে সাত দিনের রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করা হলে আদালত পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। পাঁচ দিনের রিমান্ড শেষে মামলাটি ডিএমপির ডিবির কাছে হস্তান্তর করা হয়। এরপর তদন্ত কর্মকর্তা নতুন করে তিন দিনের রিমান্ড আবেদন করলে আদালত দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
এদিকে ২৪ সেপ্টেম্বর ডিএমপি ক্যান্টনমেন্ট থানায় নতুন ওসি হিসেবে পরিদর্শক মোহাম্মদ গিয়াস উদ্দিনকে দায়িত্ব দেয়।
তদন্তে এখন মূলত ছড়িয়ে পড়া অডিওটির কণ্ঠ রাকিবুলের কি না, অডিওতে থাকা অপর ব্যক্তির পরিচয় কী এবং কথোপকথনের সঙ্গে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলার অভিযোগের সম্পর্ক কী, তা যাচাই করা হচ্ছে।











