নিজস্ব প্রতিবেদক:
টেকসই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য শুধু নির্বাচন বা সরকার পরিবর্তন যথেষ্ট নয় উল্লেখ করে বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি গণতান্ত্রিক চর্চা, সহনশীলতা এবং শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান। তিনি আরও বলেন, গণতন্ত্র এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর ইচ্ছা ও মতামতের ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালিত হয় এবং তা অবশ্যই নিয়মভিত্তিক হতে হবে।
মির্জা ফখরুল বলেন, গণতন্ত্র কেবল রাজনৈতিক স্লোগান নয়; এটি একটি সংস্কৃতি। মানুষের চিন্তা, আচরণ ও রাজনৈতিক চর্চার প্রতিটি স্তরে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতিফলন থাকতে হবে। অন্যথায় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ে তোলা সম্ভব নয়। একভাবে চিন্তা করে অন্যভাবে কাজ করলে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয় না।রাজনৈতিক সংবাদ
বাংলাদেশে গণতন্ত্রের বিকাশ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর দেশে কখনোই দীর্ঘ সময় ধরে নিরবচ্ছিন্ন গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় থাকেনি। শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান গণতান্ত্রিক চর্চার সূচনা করেছিলেন, পরে খালেদা জিয়াও সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখার চেষ্টা করেন। তবে বিভিন্ন সময়ে তা বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
তিনি অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগ গণতন্ত্রের কথা বললেও বাস্তবে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করেছে এবং গত ১৫ বছরে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই সরকারকে ব্যর্থ আখ্যা দেয়া বা ক্ষমতা ছাড়ার দাবি তোলা গণতান্ত্রিক আচরণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সংসদে আলোচনা ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রাজনৈতিক মতপার্থক্যের সমাধান হওয়া উচিত। রাস্তায় নেমে চাপ সৃষ্টি বা ‘মব’ তৈরির সংস্কৃতি গণতন্ত্রকে দুর্বল করে।
সহনশীলতার ওপর জোর দিয়ে বিএনপির মহাসচিব বলেন, গণতন্ত্রের অন্যতম ভিত্তি হলো ভিন্নমতকে সম্মান করা। নিজের সঙ্গে মতের মিল না থাকলেও অন্যের বক্তব্য প্রকাশের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা বাড়লে টেকসই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।
গণমাধ্যম প্রসঙ্গে মির্জা ফখরুল বলেন, সাংবাদিকদের নিরপেক্ষভাবে সত্য তুলে ধরতে হবে। তবে তিনি স্বীকার করেন, দেশের সংবাদমাধ্যমের মালিকানা কাঠামো ও আর্থিক বাস্তবতা সাংবাদিকতার স্বাধীনতার পথে বড় বাধা। অনেক মালিক ব্যবসায়িক বা আর্থিক কারণে সরকারের ওপর নির্ভরশীল থাকেন, ফলে সমালোচনামূলক সংবাদ প্রকাশে সংকোচ তৈরি হয়।
তিনি বলেন, বর্তমানে সরকারের পক্ষ থেকে সরাসরি চাপ না থাকলেও অনেক সংবাদকর্মী নিজেরাই আত্মনিয়ন্ত্রণ বা আত্মসংযমের পথে হাঁটেন। এ প্রবণতা থেকে বেরিয়ে এসে সত্য প্রকাশের সাহস দেখাতে হবে। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের পেশাগত অধিকার রক্ষায় আরও ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সংবাদমাধ্যমে কর্মপরিবেশ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করে মির্জা ফখরুল বলেন, অনেক সাংবাদিককে কোনো নোটিশ ছাড়াই চাকরি থেকে বাদ দেয়া হয়, ন্যূনতম বেতন বা চাকরির নিরাপত্তাও অনেক ক্ষেত্রে নেই। অথচ এসব বিষয়ে সাংবাদিক সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে জোরালো প্রতিবাদ খুব কমই দেখা যায়। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হলে সাংবাদিক ও মালিকদের মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রসঙ্গ টেনে বিএনপির মহাসচিব বলেন, বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়া অত্যন্ত শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে উঠেছে। একটি ছোট ভিডিও বা বিভ্রান্তিকর তথ্য মুহূর্তের মধ্যে একজন মানুষের দীর্ঘদিনের অর্জনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে দিতে পারে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এ বিষয়ে বিধিনিষেধ আরোপ করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশেও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান সরকার একটি কঠিন রূপান্তরকালীন পরিস্থিতির মধ্যে দায়িত্ব পালন করছে। দীর্ঘদিনের নানা অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকট রাতারাতি দূর করা সম্ভব নয়। জ্বালানি, বিদ্যুৎ, ব্যাংকিং খাতসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে সমস্যাগুলো তৈরি হয়েছে, সেগুলোর সমাধানে সময় প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন।











