নিজস্ব প্রতিবেদক:
সারের জন্য ফুঁসে উঠছে দেশের কৃষক। আমনের ভরা মৌসুমে প্রয়োজনীয় সার না পেয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে কৃষকরা সারের জন্য রাস্তা অবরোধ, আন্দোলনসহ নানা কর্মসূচি পালন করছে। এমনকি কোথাও কোথাও সার ডিলারের গুদামের বেড়া ও দরজা ভেঙে কৃষকরা সার নিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটছে। অথচ সরকারি দফতরগুলোর দাবি, দেশে ইউরিয়া ও নন-ইউরিয়া সারের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে এবং সরবরাহ করা হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। বরং আমন চাষের জন্য অধিকাংশ কৃষকই প্রয়োজনীয় সার সরকার-নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দাম দিয়ে কিনতে বাধ্য হচ্ছে। আবার কোথাও কোথাও রয়েছে সারের সরবরাহ ঘাটতিও। সারের ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতায় সারা দেশেই কৃষকদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। কৃষি মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, অতিসম্প্রতি কুড়িগ্রামে এক সার ডিলারের গুদাম থেকে বিক্ষুব্ধ কৃষকরা অন্তত দেড়শ বস্তা সার নিয়ে গেছে। একই দিনে চাহিদামতো সার না পাওয়ার অভিযোগে ভূরুঙ্গামারীতে সড়ক অবরোধ করে কৃষকরা প্রতিবাদ জানায়। এমনকি তারা কিছুক্ষণউপজেলা কৃষি কর্মকর্তাকেও অবরুদ্ধ করে রাখে। তারও দু’সপ্তাহ আগে ভূরুঙ্গামারীতে সার লুটের ঘটনা ঘটে। কৃষকরা সরবরাহ না পেয়েই গুদাম ভেঙে সার নিয়েছিলো। ওই ঘটনা ঘটার পর কৃষি মন্ত্রণালয় সারা দেশে নজরদারি বাড়িয়েছে। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকেও উচ্চ পর্যায়ের কমিটি করা হয়েছে। এখন অবৈধভাবে সার মজুদের জন্য অনেক ডিলারকে করা হচ্ছে জেল-জরিমানাও। কিন্তু তাতে পরিস্থিতির আশানুরূপ উন্নতি ঘটছে না। বরং ডিলারদের কারসাজিতে এখনো কৃষকরা অসহায়। সেজন্যই বেশির ভাগ জায়গাতেই সার বিতরণ নিয়ে বিশৃঙ্খলা হচ্ছে এবং বেমি দামেই কৃষককে সার কিনতে হচ্ছে।
সূত্র জানায়, বর্তমানে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) কাছে সার রয়েছে ৩ লাখ ৩২ হাজার মেট্রিক টন। তা থেকে চলতি মাসের বরাদ্দে ১ লাখ মেট্রিক টন ব্যবহৃত হলে মজুদ ২ লাখ ৩২ হাজার মেট্রিক টনে নেমে আসবে। তাতে সামনের মাসেও ঘাটতির আশঙ্কা নেই। পাশাপাশি কৃষি মন্ত্রণালয় বেসরকারিভাবে ৫ লাখ টন ডিএপি আমদানির একটি সারসংক্ষেপ তৈরি করেছে। গত ৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিএডিসির কাছে মাত্র ১ লাখ ৪১ হাজার মেট্রিক টন ডিএপি সার মজুদ ছিলো। ওই সার দিয়ে শুধু চলতি মাসের চাহিদাই পূরণ করা সম্ভব। আগামী মাস থেকে তৈরি হওয়া বাড়তি চাহিদা সামাল দেয়ার পরিস্থিতি নেই। অথচ আগামী মাসে প্রায় দেড় লাখ টন ডিএপি সারের চাহিদা রয়েছে। কিন্তু ওই চাহিদা পূরণের জন্য সরকারের কাছে রয়েছে মাত্র ৪১ হাজার মেট্রিক টন সার। তবে মরক্কো থেকে ৩০ হাজার মে টন সার নিয়ে একটি জাহাজ আসছে। সময়মতো ওই জাহাজের সার সরবরাহ চেইনে যুক্ত হলে ৭০ হাজার টনে মজুদ দাঁড়াবে। তাছাড়া মরক্কো থেকে সমপরিমাণে দুটি লটের ডিএপি সারও কেবল জাহাজীকরণ করা শুরু হয়েছে। কিন্তু তা আসতে ৪০ থেকে ৪৫ দিন বা তারও বেশি সময় লাগবে। ফলে দুই লটের সার অক্টোবরে মাসের সরবরাহ চেইনে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা কম। ফলে আগামী অক্টোবর মাসে ডিএপি সারের বড় সরবরাহ সংকট তৈরির শঙ্কা রয়েছে। আর তার প্রভাব অন্য সারগুলোর দামেও পড়তে পারে।
সূত্র আরো জানায়, প্রতি বছর সরকারিভাবে প্রতি বছর দেশে আমদানি করা হয় সাড়ে ৯ লাখ টন নন-ইউরিয়া সার। ওই সমপরিমাণ সার আমদানির এবারও দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। কিন্তু গত আগস্টে দেয়া দরপত্রে চূড়ান্ত অনুমোদন না পাওয়া বেসরকারি খাতের আমদানিকারকরা ডিএপি, এমওপি এবং টিএসপি আমদানির এলসি খোলা শুরু করতে পারেনি। অথচ এ বছর সরকার আমদানি করবে ৫ লাখ টন ডিএপি, ২ লাখ টন টিএসপি এবং আড়াই লাখ টন এমওপি সার। আগামী অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশে পিক সিজনে ১০ লাখ মেট্রিক টনের বেশি চাহিদা রয়েছে শুধু ডিএপি সারেরই। কিন্তু আমদানি দেরি হওয়ায় সারের এ সংকট পিক সিজনেও থাকতে পারে। মূলত বেসরকারি আমদানি প্রক্রিয়া বিলম্ব হওয়ায় সারের সঙ্কট তীব্র হচ্ছে। যদিও ইতিপূর্বে প্রতি বছরই এপ্রিল থেকে মে মাসের মধ্যে সার আমদানির দরপত্র আহ্বান এবং জুনের মধ্যে কার্যাদেশ দেয়া হতো। কারণ বেসরকারি আমদানির মাধ্যমে আসা সার দেশের সরবরাহ চেইনে যুক্ত হতে সময় লেগে যায় ৮০ থেকে ৯০ দিন। কিন্তু এবার ওই রীতি পাল্টে যাওয়ায় সারের মজুদ পরিস্থিতি নাজুক হয়েছে।
এদিকে কৃষি বিভাগ সংশ্লিষ্টদের মতে, বেসরকারিভাবে সার আমদানি বিলম্বের কারণেই সার ব্যবস্থাপনার জটিলতা বাড়ায় সারাদেশেই কৃষকদের বেশি দামে সার কিনতে হচ্ছে। এমনকি এখনো সার আমদানির কার্যাদেশ হয়নি। অথচ মার্চ এপ্রিলে দরপত্র ডেকে দ্রুত কার্যাদেশ দিলে এখন সরকারের হাতে ডিএপি, টিএসপি সারের সংকট হওয়ার সুযোগ থাকতো না। পাশাপাশি ডিলার নিয়োগের নীতিমালা বাস্তবায়ন করতে গিয়েও আরো বেকায়দায় পড়েছে সরকার। ফলে সারা দেশে সার ব্যবস্থাপনায় সংকট সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
অন্যদিকে ভুক্তভোগী কৃষকদের মতে, বর্তমানে টিএসপি ও ডিএপি সারের সংকট রয়েছে। কৃষকরা গত আগস্ট মাসে ইউরিয়া ও এমওপি সার চাহিদা অনুযায়ী পেলেও অনেক কৃষকই টিএসপি ও ডিএপি সার সংগ্রহ করতে পারেনি। ফলে ওই সার দুটি ছাড়াই কৃষকরা আমনের আবাদ করছে। তাতে কৃষকদের মধ্যে ফলন বিপর্যয়ের আশঙ্কা বাড়ছে। চলতি সেপ্টেম্বর মাসেও টিএসপি ও ডিএপি সার পাওয়া যাচ্ছে না। অভিযোগ উঠেছে, ভরা মৌসুমে ডিলাররা সারের কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে। এলাকায় সারবাহী ট্রাক ঢুকার আগেই ডিলাররা বেশি দামে তা বাইরে বিক্রি করে দিচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ জানান, দেশে সারের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। একটি সিন্ডিকেট সারা দেশে অরাজকতা তৈরি করছে। তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। সারা দেশে মনিটরিং জোরদার করা হয়েছে।











