নিজস্ব প্রতিবেদক:
লোকোমোটিভ সঙ্কটে ব্যাহত হচ্ছে রেলপথে জ্বালানি তেল সরবরাহ। অথচ রেলপথের ওপর নির্ভরশীল দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার একটি বড় অংশ। আমদানিকৃত জ্বালানি তেল চট্টগ্রাম থেকে চারটি রুট জ্বালানি পরিবহনের জন্য প্রতিদিন অন্তত দুটি ট্রেনের প্রয়োজন। জ্বালানিবাহী ট্রেনের চাহিদা প্রতি মাসে গড়ে ৫৮টি থাকলেও গত পাঁচ মাসে মাত্র ৪৫টি জ্বালানিবাহী ট্রেন চলেছে। ফলে দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের সঙ্কট তৈরি হয়েছে। আর রেলপথে জ্বালানি পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় পুরোপুরি সচল করা যাচ্ছে না দেশের প্রধান সরবরাহ রুটগুলো। বিদ্যমান অবস্থায় রাষ্ট্রায়ত্ত তিন বিপণন প্রতিষ্ঠান পদ্মা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড, মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেড ও যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড রংপুর ও সিলেট অঞ্চলের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। বিপিসি এবং বাংলাদেশ রেলওয়ে সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, জ্বালানি তেল সরবরাহে সিলেট ডিপোতে প্রতি মাসে ৩০টি, শ্রীমঙ্গলে ১২টি, রংপুরে ১০টি ও ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট ডিপোতে ৬টি জ্বালানিবাহী ট্রেন পরিচালনার প্রয়োজন হয়। কিন্তু মে মাসের প্রথম ৭ দিনে সম্ভব হয়নি সিলেট, রংপুর ও ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট ডিপোয় একটি ট্রেনও চালানো। ওই সময়ে কেবল শ্রীমঙ্গল ডিপোতে একটি ট্রেন পরিচালিত হয়েছে। ফলে জ্বালানি বিতরণ কোম্পানিসহ বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রয়োজনীয় জ্বালানির অভাবে দেশের সার্বিক বিদ্যুৎ খাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এ পরিস্থিতিতে অনেক ক্ষেত্রেই ডিলার ও এজেন্টদের অনুমতি দিতে হচ্ছে নির্ধারিত ডিপোর পরিবর্তে বিকল্প ডিপো থেকে জ্বালানি সংগ্রহের। তাতে অঞ্চল ভেদে তৈরি হচ্ছে জ্বালানি মজুদ ও সরবরাহে ভারসাম্যহীনতা। এমনকি কিছু এলাকায় সরবরাহ সঙ্কটও দেখা দিচ্ছে।
সূত্র জানায়, জ্বালানি তেল পরিবহনে প্রতি মাসে ৫৮টি জ্বালানিবাহী ট্রেনের প্রয়োজন হলেও গত পাঁচ মাসে মাত্র ৪৫টি ট্রেন পরিবহন করেছে। এ পরিস্থিতিতে সিলেট অঞ্চলের চাহিদা ভৈরব ডিপোর মাধ্যমে এবং বাঘাবাড়ি ও পার্বতীপুর ডিপোর ওপর নির্ভর করে রংপুর অঞ্চলের চাহিদা পূরণ করতে হচ্ছে। তাতে বেড়ে যাচ্ছে জ্বালানি তেল বিপণন কোম্পানি, ডিলার ও এজেন্টদের পরিবহন ব্যয় এবং সময়। মূলত লোকোমোটিভ সঙ্কটের কারণেই একাধিক জ্বালানিবাহী ও কনটেইনারবাহী ট্রেন চট্টগ্রামে আটকে থাকছে। বিগত ২৫ মে থেকে সিলেটগামী একটি জ্বালানিবাহী ট্রেন লোডিং সম্পন্ন হওয়ার পরও যাত্রা করতে পারেনি। একইভাবে ২৩ মে থেকে শ্রীমঙ্গলগামী এবং ২৭ মে থেকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টগামী জ্বালানিবাহী ট্রেন চট্টগ্রামের সিজিপিওয়াই ইয়ার্ডে অপেক্ষমাণ রয়েছে।
সূত্র আরো জানায়, দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের লোকোমোটিভ সঙ্কট চলছে। ফলে প্রতি মাসেই বাতিল হচ্ছে ৭০০-৮০০ ট্রেনের যাত্রা। একই সঙ্গে লোকোমোটিভ বিকল হওয়া এবং সময়মতো সরবরাহ না পাওয়ার কারণেও ট্রেনের যাত্রা শুরু ও গন্তব্যে পৌঁছতে বিলম্ব হচ্ছে। যদিও পণ্যবাহী ট্রেনের ক্ষেত্রে যাত্রীবাহী ট্রেনের মতো নির্দিষ্ট সময়সূচি মেনে চলার বাধ্যবাধকতা নেই। তবে জ্বালানিবাহী ট্রেনের লোকোমোটিভ বরাদ্দে রেলওয়ের উদাসীনতা রয়েছে। স্টেকহোল্ডাররা বহুবার রেলপথে পণ্য পরিবহন বাড়ানোর জন্য তাগিদ দিলেও লোকোমেটিভ সঙ্কটে কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারছে না রেলওয়ে। তাতে দেশের আমদানি-রফতানি বাণিজ্য, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। পাশাপাশি উল্লেখযোগ্যভাবে কমছে রেলওয়ের নিজস্ব রাজস্ব আয়ও।
এদিকে রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি তেল বিপণন কোম্পানি সংশ্লিষ্টদের মতে, রেলপথে জ্বালানি পরিবহন সবচেয়ে সাশ্রয়ী ও কার্যকর পদ্ধতি। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ব্রিটিশ আমল থেকেই বিভিন্ন ডিপোয় সরাসরি ওয়াগনে জ্বালানি পরিবহন করে সরবরাহের ব্যবস্থা চালু রয়েছে। কিন্তু বর্তমান লোকোমোটিভ সংকটের কারণে বিকল্প পথে অধিক খরচ ও সময় ব্যয় করে জ্বালানি পরিবহন করতে হচ্ছে। যদিও চাহিদা অনুযায়ী ট্রেন সরবরাহ নিশ্চিত করতে নিয়মিত চিঠিপত্র ও বৈঠকের মাধ্যমে রেলওয়ের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। রেলওয়ে পর্যাপ্ত লোকোমোটিভ সরবরাহ করতে পারলে দেশের সামগ্রিক জ্বালানি ব্যবস্থাপনা আরো সহজ ও কার্যকর হতো।
অন্যদিকে রেলওয়ে সংশ্লিষ্টদের মতে, পণ্যবাহী ট্রেন চলাচলের জন্য ভালোমানের লোকোমোটিভের প্রয়োজন হয় না। পথে বিকল হলেও দীর্ঘ সময় অপেক্ষায় রেখে গন্তব্যে পৌঁছানোর সুযোগ রয়েছে। আবার নির্ধারিত সময়ের মধ্যে গন্তব্যে পৌঁছানোর বাধ্যবাধকতা না থাকায় কম গতিসম্পন্ন লোকোমোটিভ দিয়েও পণ্যবাহী ট্রেন চলাচলের সুযোগ রয়েছে। তারপরও নিয়মিত চাহিদার বিপরীতে পণ্য খাতে লোকোমোটিভ সরবরাহ দিতে অপারগতা জানিয়ে আসছে রেলওয়ে।
সার্বিক বিষয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন জানান, প্রায় এক দশক ধরে রেলওয়ে লোকোমোটিভ সংকটে ভুগছে। যে কারণে চাহিদা অনুযায়ী যাত্রীবাহী ও পণ্যবাহী ট্রেন পরিচালনা সম্ভব হচ্ছে না। দীর্ঘদিন নতুন লোকোমোটিভ আমদানি না হওয়ায় দ্রুত এ সংকট কাটিয়ে ওঠাও কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে নতুন লোকোমোটিভ সংগ্রহ এবং বিদ্যমান লোকোমোটিভ ওভারহোলিংয়ের মাধ্যমে সংকট মোকাবেলার চেষ্টা চলছে। ভবিষ্যতে জ্বালানির মতো গুরুত্বপূর্ণ পণ্য পরিবহনে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া হবে।











