নিজস্ব প্রতিবেদক:
বাংলাদেশের প্রবীণ রাজনীতিবিদ, সাবেক স্পিকার, সাবেক ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি এবং বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার আর নেই। রোববার (১২ জুলাই) ভোর ৪টা ১৮ মিনিটে রাজধানীর শ্যামলীর বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯৪ বছর। তাঁর মৃত্যুতে রাজনৈতিক, আইন ও সংসদীয় অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, “স্যার আমাদেরকে ছেড়ে চলে গেছেন। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় দীর্ঘদিন যাবৎ ভুগছিলেন।”
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলে তিনি গণপূর্ত ও নগর উন্নয়ন প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। তাঁর দায়িত্বকালেই বর্তমান জাতীয় সংসদ ভবনের অসমাপ্ত কাজ শেষ হয়। পরে রাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তারের মন্ত্রিসভায় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
এইচ এম এরশাদ সরকারের পতনের পর বিএনপি ক্ষমতায় এলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মন্ত্রিসভায় তিনি ভূমি প্রতিমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৬ সালের স্বল্পমেয়াদি বিএনপি সরকারের আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ওই সময়ই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিধান সংবিধানে যুক্ত হয়।
২০০১ সালে বিএনপি সরকার গঠন করলে অষ্টম জাতীয় সংসদের স্পিকার নির্বাচিত হন জমির উদ্দিন সরকার। ২০০২ সালে রাষ্ট্রপতি একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর পদত্যাগের পর ২১ জুন থেকে ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্বও পালন করেন। পরে ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে নবম জাতীয় সংসদের সদস্যদের শপথবাক্য পাঠ করানোর মাধ্যমে তাঁর স্পিকারের দায়িত্বের সমাপ্তি ঘটে।
১৯৩১ সালের ১ ডিসেম্বর পঞ্চগড় জেলার তেঁতুলিয়া উপজেলার নয়াবাড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন জমির উদ্দিন সরকার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর এবং আইন বিষয়ে ডিগ্রি অর্জনের পর যুক্তরাজ্যের লিংকনস ইন থেকে ব্যারিস্টার-অ্যাট-ল সনদ লাভ করেন। দেশে ফিরে ১৯৬০ সালে আইন পেশায় যোগ দিয়ে সুপ্রিম কোর্টে সংবিধান, দেওয়ানি ও ফৌজদারি আইনের একজন খ্যাতিমান বিশেষজ্ঞ হিসেবে পরিচিতি পান।
ছাত্রজীবনে ১৯৪৫ সালে ছাত্র ফেডারেশনের মাধ্যমে রাজনীতিতে তাঁর হাতেখড়ি। পরে ছাত্র ইউনিয়ন ও ন্যাপের রাজনীতিতে যুক্ত হন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সক্রিয় আইনজীবীদের অন্যতম ছিলেন তিনি। পরে জিয়াউর রহমানের জাগদলে যোগ দিয়ে বিএনপি প্রতিষ্ঠার পর দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য হন এবং আমৃত্যু সেই দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৭৯ সালে দিনাজপুর-১ আসন থেকে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। এরপর ঢাকা-৯, পঞ্চগড়-১ এবং বগুড়া-৬ আসন থেকেও বিভিন্ন সময়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সংসদীয় বিভিন্ন স্থায়ী কমিটিতেও দায়িত্ব পালন করেন এই প্রবীণ রাজনীতিক।
রাজনীতি ও আইনচর্চার পাশাপাশি লেখক হিসেবেও পরিচিত ছিলেন জমির উদ্দিন সরকার। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘গণতন্ত্রের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ’, ‘এক নজরে সংসদ সম্পর্কিত বিধিবিধান’, ‘লন্ডনে শিক্ষা জীবন’, ‘বাংলাদেশে গণতন্ত্রের উত্তরণ ও ডিগবাজি’ এবং ‘পল রাজ থেকে পলাশী এবং ব্রিটিশ রাজ থেকে বঙ্গভবন’।
তাঁর মৃত্যুতে জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। এক শোকবার্তায় তিনি মরহুমের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।
প্রধান বিচারপতি জোবায়ের রহমান চৌধুরীও শোক প্রকাশ করে মরহুমের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেছেন। একই সঙ্গে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ও নজরুল ইসলাম খানসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা শোক জানিয়েছেন।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম শোকবার্তায় বলেন, “দীর্ঘ রাজনৈতিক ও পেশাগত জীবনে তিনি বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্র, আইন অঙ্গন এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। দেশের রাজনীতি, সংসদীয় চর্চা এবং আইন অঙ্গনে তাঁর অবদান শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।”
ব্যক্তিগত জীবনে ২০২৩ সালে স্ত্রী নূর আখতারকে হারান জমির উদ্দিন সরকার। তিনি এক মেয়ে ও দুই ছেলে রেখে গেছেন। তাঁর বড় ছেলে নওশাদ জমির বর্তমানে পঞ্চগড়-১ আসনের সংসদ সদস্য।











