সালমান শাহ হত্যা মামলা: ডনের জামিন ফের নামঞ্জুর

নিজস্ব প্রতিবেদক:

চিত্রনায়ক সালমান শাহ হত্যা মামলায় অভিনেতা আশরাফুল হক ওরফে ডনের জামিন আবেদন আবারও নামঞ্জুর করেছেন আদালত। বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ তাওহীদা আক্তারের আদালত শুনানি শেষে এ আদেশ দেন। এর আগে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ও ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতেও তাঁর জামিন আবেদন নাকচ হয়েছিল।

 

আদালতে ডনের পক্ষে জামিনের আবেদন করেন আইনজীবী মফিজুল ইসলাম আশরাফ। শুনানি শেষে আদালত আবেদনটি খারিজ করেন বলে জানান এই আইনজীবী।

 

গত ৯ আগস্ট হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ডনকে গ্রেপ্তার করে ইমিগ্রেশন পুলিশ। তিনি ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে সৌদি আরব যাওয়ার জন্য বিমানবন্দরে গিয়েছিলেন। পরে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) তাঁকে নিজেদের হেফাজতে নেয়। এ মামলায় রিমান্ডে নেওয়ার পর থেকে তিনি কারাগারে রয়েছেন।

 

জামিন আবেদনে ডনের পক্ষ থেকে বলা হয়, তাঁর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ নেই এবং আগের তদন্তগুলোতে সালমান শাহর মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। আবেদনে তাঁর অসুস্থতা, পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হওয়া এবং স্থায়ী ঠিকানার বিষয়ও তুলে ধরা হয়। জামিন পেলে তিনি পালিয়ে যাবেন না বলেও দাবি করা হয়। তবে শুনানি শেষে আদালত জামিন দেননি।

 

চিত্রনায়ক সালমান শাহর মৃত্যুর প্রায় ২৯ বছর পর নতুন করে হত্যা মামলা হয়। ২০২৫ সালের ২০ অক্টোবর তাঁর মা নীলা চৌধুরীর পক্ষে মামা মোহাম্মদ আলমগীর কুমকুম রমনা থানায় মামলাটি করেন। এজাহারে ১১ জনের নাম উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা কয়েকজনকেও আসামি করা হয়।

 

মামলায় সালমান শাহর সাবেক স্ত্রী সামিরা হক, সামিরার মা লতিফা হক লুসি, ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মদ, আশরাফুল হক ওরফে ডন, ডেভিড, জাভেদ, ফারুক, রুবি, আব্দুস সাত্তার, সাজু ও রিজভী আহমেদ ওরফে ফারহাদের নাম রয়েছে।

 

এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে, আসামিরা পরস্পরের যোগসাজশে পূর্বপরিকল্পিতভাবে ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সালমান শাহকে হত্যা করেন। এটি মামলার অভিযোগ, আদালতে প্রমাণিত অপরাধ নয়।

 

সালমান শাহর প্রকৃত মৃত্যুর কারণ নিয়ে প্রায় তিন দশক ধরে তদন্ত ও আইনি লড়াই চলছে। ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ঢাকার ইস্কাটনে নিজের ফ্ল্যাটে মারা যান চিত্রনায়ক চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন, যিনি সালমান শাহ নামে পরিচিত ছিলেন। মৃত্যুর সময় চলচ্চিত্রে তাঁর জনপ্রিয়তা ছিল তুঙ্গে।

 

ছেলের মৃত্যুর পর তাঁর বাবা কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী প্রথমে অপমৃত্যুর মামলা করেন। পরে ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ তুলে ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই মামলাটিকে হত্যা মামলা হিসেবে নেওয়ার আবেদন জানান তিনি।

 

আদালতের নির্দেশে অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) তদন্ত করে। ১৯৯৭ সালের ৩ নভেম্বর দেওয়া চূড়ান্ত প্রতিবেদনে সংস্থাটি জানায়, সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছিলেন। ওই প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে তাঁর বাবা রিভিশন মামলা করেন। পরে ২০০৩ সালের ১৯ মে আদালত মামলাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তে পাঠান।

 

দীর্ঘ সময় পর ২০১৪ সালের ৩ আগস্ট মহানগর হাকিম ইমদাদুল হক বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। সেই প্রতিবেদনেও হত্যার অভিযোগ নাকচ করা হয়।

 

বাবার মৃত্যুর পর মামলাটি চালিয়ে যান সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী। ২০১৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি তিনি বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে নারাজি আবেদন করেন। এতে ১১ জনের নাম উল্লেখ করে তাঁদের ছেলের মৃত্যুর সঙ্গে জড়িত থাকার সন্দেহের কথা জানান।

 

এরপর মামলাটি র‌্যাব তদন্ত করে। তবে রাষ্ট্রপক্ষের আপত্তির পর ২০১৬ সালের ২১ আগস্ট ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৬-এর বিচারক ইমরুল কায়েশ র‌্যাবকে তদন্ত বন্ধের নির্দেশ দেন।

 

পরে তদন্তের দায়িত্ব পায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। প্রায় চার বছর তদন্তের পর ২০২০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি সংস্থাটি চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, ঘটনার সময় উপস্থিত ও সংশ্লিষ্ট ৫৪ জনের জবানবন্দি এবং জব্দ করা আলামত পর্যালোচনা করে হত্যার অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

 

পিবিআইয়ের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, চিত্রনায়িকা শাবনূরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা নিয়ে পারিবারিক কলহ এবং স্ত্রী সামিরা হকের কারণে মায়ের কাছ থেকে দূরে থাকার মানসিক যন্ত্রণা থেকে সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছিলেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে। তবে নীলা চৌধুরী ওই প্রতিবেদনেও সন্তুষ্ট হননি। ছেলের মৃত্যুর কারণ জানতে তিনি আরও তদন্তের আবেদন করেন।

 

ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মামুনুর রশীদ ২০২১ সালের ৩১ অক্টোবর পিবিআইয়ের প্রতিবেদন আমলে নিয়ে আসামিদের অব্যাহতির আদেশ দেন। এরপর সালমান শাহর পরিবারের পক্ষ থেকে কয়েকটি বিষয় তুলে ধরে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে রিভিশন আবেদন করা হয়। ২০২২ সালের ১২ জুন আবেদনটি গ্রহণ করা হলেও বিভিন্ন কারণে দীর্ঘদিন শুনানি হয়নি।