জেলা প্রতিনিধি :
বিশ্বের বৃহত্তম শরণার্থী শিবিরসংলগ্ন কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়া সীমান্ত অঞ্চলের মানুষের জীবন চলছে প্রতিনিয়ত ভয় ও অনিশ্চয়তার মধ্যে। নিরাপত্তার বেড়াজালে আটকে আছে তাদের স্বাভাবিক জীবনযাপন ও ভবিষ্যতের স্বপ্ন। সীমান্ত জুড়ে চলমান সহিংসতা, সংঘর্ষ, মাদক ও মানবপাচার—সব মিলিয়ে দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে সাধারণ মানুষের জীবন।
মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মাঝে চলমান সংঘর্ষের প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশ সীমান্তেও। মাঝে মধ্যেই মর্টারশেল ছোড়া হচ্ছে সীমান্ত এলাকায়, যাতে বাংলাদেশি নাগরিক ও রোহিঙ্গা নিহত হচ্ছেন, আহত হচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারাও। সীমান্তে বিস্ফোরিত হচ্ছে মাইন, বন্ধ হয়ে যাচ্ছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে উপকূলের জেলে সম্প্রদায়। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে নাফ নদীতে মাছ ধরা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে একটি সরকারি পরিপত্র জারি হয়, যার প্রেক্ষিতে প্রায় ৫ হাজার জেলে পরিবার দীর্ঘ ৮ বছর ধরে উপার্জনহীন অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে।
টেকনাফের হ্নীলা জলদাস পাড়ার ৭০ বছর বয়সী জেলে সমপ্তি দাস জানান, তার ৯৬ বছর বয়সী মাকে নিয়ে আগে জাল বুনে কোনোভাবে জীবন চলত। কিন্তু মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকায় এখন আর জালের চাহিদা নেই, বন্ধ হয়ে গেছে সেই কাজটিও। তিনি বলেন, “এই জেলেপল্লি একসময় ছিল ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্র। নাফ নদীর মাছ যেত দেশের নানা প্রান্তে। এখন চুলায় আগুন জ্বলে না।”
জেলেপল্লির আরেক বাসিন্দা, অসুস্থ নবী হোসেন মেঝেতে কাতরাচ্ছেন। তার স্ত্রী মোস্তফা খাতুন বলেন, “মাছ ধরা বন্ধ মানেই আয় বন্ধ। ওষুধ কেনারও সামর্থ্য নেই।”
জালিয়াপাড়া ক্ষুদ্র মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সভাপতি আবদুল গনি জানান, “দীর্ঘদিন মাছ ধরা বন্ধ থাকায় দুই শতাধিক নৌযান ও জাল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে।”
স্থানীয় প্রশাসন আংশিকভাবে মাছ ধরার অনুমতি দিলেও তা যথেষ্ট নয় বলে মত দিয়েছেন হ্নীলা ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আলী আহমদ। তিনি বলেন, “নিরাপত্তার নামে সামরিকীকরণ সীমান্তে অপরাধ থামাতে পারেনি, বরং বেড়েছে। অথচ জেলেরা আট বছর ধরে নদীতে নামতে পারছেন না।”
কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী বলেন, “সীমান্তবাসীর জীবিকা বন্ধ করে দিয়ে শুধু নিরাপত্তা দেওয়া সম্ভব নয়। তাদের পুনর্বাসন ও বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা জরুরি।”
তবে টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ এহসান উদ্দিন জানিয়েছেন, জেলে পরিবারগুলোর মানবিক অবস্থা বিবেচনায় গত ৫ আগস্ট থেকে সীমিতভাবে শাহপরীর দ্বীপ এলাকায় দিনের বেলায় মাছ ধরার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে নাফ নদীর অন্যান্য অংশে এখনো নিষেধাজ্ঞা বহাল রয়েছে।











