নৌপথে বেপরোয়া অপরাধীরা

নিজস্ব প্রতিবেদক:

দেশের নৌপথে বেপরোয়া অপরাধীরা। আশঙ্কাজনক হারে অপরাধ বাড়ছে। নৌপথে এখন অহরহ ঘটছে নৌযানে হামলা, ডাকাতি, মাদক পাচার, অপহরণ, চাঁদাবাজির মতো ঘটনা। মূলত হাজার হাজার কিলোমিটার নৌপথে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি স্থলপথের চেয়ে কম থাকার সুযোগ নিচ্ছে অপরাধীরা। পাশাপাশি নদীতে লাশ গুম করা সহজ। সেজন্যই খুনীরা অপরাধের প্রমাণ মুছে ফেলতে ও নিজেদের আড়াল করতে নদীতে ফেলছে লাশ। তাতে স্রোতে লাশ ভেসে চলে যাওয়া কিংবা পচে-গলে বিকৃত হয়ে যাওয়ায় কঠিন হয়ে পড়ে লাশের পরিচয় শনাক্ত। বিগত এক বছরের ব্যবধানে নৌপথে নানা অপরাধে এক হাজার ৩১৪টি মামলা বে[েড়ছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী ও নৌপথ সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

 

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, দেশের প্রায় সাড়ে তিন হাজার কিলোমিটার নৌপথে নিয়মিত নৌযান চলাচল করে। যদিও দেশে বর্ষা মৌসুমে ৬ থেকে ৮ হাজার এবং শুষ্ক মৌসুমে ৩ থেকে ৪ হাজার কিলোমিটার নৌপথ থাকে। নৌ পুলিশের জন্য বিশাল এই জলপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা খুবই কঠিন। দেশের জলপথকে ১১টি অঞ্চলে ভাগ করে নৌ পুলিশ আইনশৃঙ্খলা কার্যক্রম চালাচ্ছে। ওসব অঞ্চলে বিগত ২০২৪ সালে খুন, অপমৃত্যু, ডাকাতি, ছিনতাই, অস্ত্র, চোরাই পণ্য বহন, অবৈধভাবে বালু উত্তোলন, অপহরণ, চাঁদাবাজি, মাদকসহ নানা অপরাধে মামলা হয় দুই হাজার ৮৫টি মামলা। আর ২০২৫ সালে তিন হাজার ৩৯৯টি মামলা হয়। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ৬৩ শতাংশ মামলা বেড়েছে।

 

সূত্র জানায়, ঢাকা অঞ্চলে বিগত ২০২৪ সালে ১২০টি, নারায়ণগঞ্জে ১০৬টি, চট্টগ্রামে ১৮২টি, চাঁদপুরে ৮৫০টি, বরিশালে ৪৪৮টি, ফরিদপুরে ১১৩টি, কিশোরগঞ্জে ৪৯টি, রাজশাহী ৯০টি, টাঙ্গাইলে ৩৫টি, খুলনায় ৩৪টি এবং সিলেটে ৫৮টি মামলা হয়। আর ২০২৫ সালে ঢাকা অঞ্চলে ১২৮টি, নারায়ণগঞ্জে ৯১টি, চট্টগ্রামে ১১৮টি, চাঁদপুরে দুই হাজার ১৭টি, বরিশালে ৬১১টি, ফরিদপুরে ১৪৭টি, কিশোরগঞ্জে ৩০টি, রাজশাহী ১২১টি, টাঙ্গাইলে ৬৬টি, খুলনায় ২৫টি এবং সিলেটে ৪৫টি মামলা হয়েছে। তার মধ্যে চাঁদপুর অঞ্চলে বেশি অপরাধ বেড়েছে। আগের বছরে যেখানে মামলা ছিল ৮৫০টি, পরের বছর তা বেড়ে দুই হাজার ১৭টি হয়েছে। বিগত ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে নৌ পুলিশের বিভিন্ন থানায় মোট ৯ হাজার ৯৩৭টি মামলা হয়েছে। তার মধ্যে ৮ হাজার ৯৯৯টি মামলার তদন্ত শেষে আদালতে প্রতিবেদন জমা দেয়া হয়েছে। আর বিচারিক প্রক্রিয়ায় গত দুই বছরে এক হাজার ৭৫১টি মামলার রায় হয়েছে। তার মধ্যে আদালত এক হাজার ৬৭১ মামলার আসামিদের সাজা দেয়।

 

সূত্র আরো জানায়, অপরাধীরা লাশ গুমে জন্য নদীতে বেছে নিচ্ছে। হত্যার পর লাশ নদীতে ফেলে দিলে তাতে দ্রুত পচন ধরে ও চেহারা বিকৃত হয়ে যায়। আর যেখানে লাশ ফেলা হয় তা থেকে অনেক দূরে চলে যায়। তাছাড়া গলিত অবস্থায় লাশ পাওয়া গেলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কঠিন হয়ে পড়ে পরিচয় শনাক্ত। তাতে অপরাধীরা হত্যাকাণ্ডের আলামত নষ্ট করা ও আইনের ফাঁকে রক্ষা পাওয়ার সুযোগ পায়। নদী থেকে বিগত ২০২১ সাল থেকে পাঁচ বছরে নদী থেকে উদ্ধার হয়েছে দুই হাজার ৬৪টি লাশ। তার মধ্যে এক হাজার ৪২৫টির পরিচয় শনাক্ত হয়েছে আর পচে-গলে যাওয়ায় শনাক্ত করা যায়নি ৬৩৯টি লাশের পরিচয়। তবে নৌপুলিশ বিগত পাঁচ বছরে জলপথে ১৮টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করে। তাছাড়া জব্দ করা হয় গুলি, রামদা, চায়নিজ কুড়ালসহ দেশি বিভিন্ন অস্ত্র। বিগত ২০২৩ সালে ১০ হাজার ৪৭ জন, ২০২৪ সালে ১১ হাজার ৫২৭ জন এবং গত বছর সাত হাজার ৮১৬ জনকে গ্রেপ্তার করে নৌপুলিশ।

 

এদিকে নৌপথ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ মৎস্যজীবী ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক শাহ আলম মল্লিক জানান, অহরহ চাঁদাবাজ ওডাকাত দলের কবলে পড়ে দেশের গুরুত্বপূর্ণ পদ্মা, মেঘনা, যমুনাসহ বিভিন্ন নদীপথের নৌযান। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর থেকে নদীপথে ওই ধরনের অপরাধ সংঘটিত হয়। পদ্মা নদীর মাওয়া থেকে শুরু করে জাজিরার মাঝিকান্দী, ভেদরগঞ্জের কাচিকাটা, চাঁদপুরের লক্ষ্ণীচরের প্রত্যন— চরাঞ্চল এলাকায় কয়েকটি চাঁদাবাজ গ্রুপ ও আন্তঃজেলা ডাকাত দলের তৎপরতা রয়েছে। তাছাড়া মেঘনা নদীর হাইমচরের চরভৈরবী, শরীয়তপুরের ইসানবালা, বরিশালের হিজলা, মেহেন্দীগঞ্জের মেঘনা নদীতে চাঁদাবাজ ও আন্তঃজেলা ডাকাত দলের আনাগোনা আছে। ওসব এলাকায় চলাচল করা নৌযানের চালক ও যাত্রীরা সন্ধ্যার পর থেকে আতঙ্কে থাকে।

 

অন্যদিকে এ প্রসঙ্গে নৗ পুলিশ সদরদপ্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি (অপারেশনস) প্রবীর কুমার রায় জানানন, নৌপথে নৌপুলিশের জোরদার নজরদারি রয়েছে। টহল ডিউটি ও চেকপোস্ট বসিয়ে অব্যাহত আছে সন্দেহজনক নৌযান ও ব্যক্তি তল্লাশি কার্যক্রম। নৌপথে যাতে কোনো ধরনের অপরাধ সংঘটিত না হয় সে ব্যাপারে নৌপুলিশ তৎপর রয়েছে।