নিজস্ব প্রতিবেদক:
দেশে বজ্রপাতের তীব্রতায় বাড়ছে প্রাণহানির ঘটনা। বজ্রপাতে প্রতি বছর প্রায় ৩০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু এবং বিপুলসংখ্যক মানুষ আহত হচ্ছে। বিশেষ করে হাওরাঞ্চলে, উন্মুক্ত মাঠে, নদীতীরবর্তী এলাকায় কৃষিকাজে নিয়োজিত মানুষরাই বজ্রপাতের শিকার হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। অথচ বিগত শতকের নয়ের দশকে দেশে বজ্রপাতে বছরে গড়ে ৩০ জনের মৃত্যু হতো। এখন তা বেড়ে পৌঁছেছে ৩০০-৩৫০ জনে। বিগত ২০২০ সালে ৪২৭ জন বজ্রপাতে মারা যান। আর চলতি বছরের প্রথম চার মাসে মৃত্যু হয়েছে ১০০ জনের বেশি মানুষের। বিগত দুই দশকে বাংলাদেশে বজ্রপাতের ঘটনা এবং এর তীব্রতা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে জলবায়ুর পরিবর্তন, বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা বৃদ্ধি, আর্দ্রতার পরিমাণ বেড়ে যাওয়া, অনিয়মিত আবহাওয়া এবং ভূমি ব্যবহারের পরিবর্তন। বর্তমানে এক নীরব ঘাটতে পরিণত হয়েছে বজ্রপাত। আবহাওয়া অধিদপ্তর এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, দেশে বিগত ১১ জুন বহ্রপাদে একদিনে ১১ জেলায় ১৮ জনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। তার আগে ২৭ এপ্রিল একদিনে মৃত্যু হয়েছিল ১৪ জনের। বর্তমানে প্রতি বছর বজ্রপাতে ৩০০ জনের বেশি মানুষ মারা যায়। দেশে বিগত ২০১৬ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বজ্রপাতে ৩ হাজার ২৭১ জন মারা গেছে। আর চলতি বছর মারা গেছে ১২৭ জন। সব মিলিয়ে ৩ হাজার ৩৯৮ জন মারা গেছে। আর ২০১৮ সাল পর্যন্ত বজ্রপাতে আহতের হিসাব পাওয়া যায়নি। বজ্রপাতে ২০১৬ সালে ৩৯১ জন, ২০১৭ সালে ৩৮৮ জন, ২০১৮ সালে ৩৫৯ জন, ২০১৯ সালে ৪০১ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ওই বছর আহত হয়েছে ১০৮ জন। তাছাড়া ২০২০ সালে বজ্রপাতে ৪২৭ জনের মৃত্যু ও ৮৮ জন আহত, ২০২১ সালে ৩৬৩ জনের মৃত্যু ও ১২৪ জন আহত, ২০২২ সালে ৩৩৭ জনের মৃত্যু ও ৮৭ জন আহত, ২০২৩ সালে ৩২২ জনের মৃত্যু ও ৬১ জন আহত ২০২৪ সালে ২৬৬ জনের মৃত্যু ও ৫৩ জন আহত, ২০২৫ সালে ২৪৩ জনের মৃত্যু ও ৫৪ জন আহত এবং চলতি বছরে এখন পর্যন্ত ১২৭ জনের মৃত্যু ও ৫৫ জন আহত হয়েছে।
সূত্র জানায়, পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ার ফলে বায়ুমণ্ডলে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বাড়ছে। আর উষ্ণ ও আর্দ্র বায়ু দ্রুত উপরে উঠে শক্তিশালী বজ্রমেঘ তৈরি করে। ওই মেঘে ধনাত্মক ও ঋণাত্মক চার্জের পার্থক্য বাড়লেই বজ্রপাতের সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশে বজ্রপাতের সম্ভাবনা বেশি থাকে মার্চ থেকে মে মাসে প্রাক-বর্ষা মৌসুমে। বাংলাদেশে বজ্রপাত বাড়ার ক্ষেত্রে রয়েছে একাধিক কারণ। তার অন্যতম হচ্ছে জলবায়ুর পরিবর্তন, আর্দ্রতা বাড়ায় দীর্ঘ তাপপ্রবাহ এবং বড় গাছ কমে যাওয়ায় ভূপৃষ্ঠের গরম বাতাস দ্রুত উপরে উঠে যায় এবং শক্তিশালী বজ্রমেঘ তৈরি করে। আর ওই মেঘ থেকেই বজ্রপাতের সৃষ্টি হয়। তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে বজ্রপাতের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহে অতিরিক্ত গরমে নদী-খাল ও জলাশয় থেকে বেশি জলীয়বাষ্প সৃষ্টি হয়, যা বজ্রমেঘকে আরো শক্তিশালী করে এবং বজ্রপাত ঘটায়। কিন্তু দেশের গ্রামাঞ্চলে উঁচু গাছপালা কেটে ফেলায় বজ্রপাতের স্বাভাবিক টার্গেট কমে গেছে। ফলে খোলা মাঠে কাজ করা কৃষক বা জেলেরা বজ্রপাতের শিকার হচ্ছে। তাছাড়া জলাভূমি ও ভূমি ব্যবহারের পরিবর্তন, বন উজাড় এবং বায়ুদূষণও বজ্রপাত বাড়ার জন্য অনেকাংশে দায়ী।
সূত্র আরো জানায়, বৈশ্বিক তাপমাত্রা আরো ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে গেলে বজ্রপাতের ঘটনা ১০ থেকে ১২ শতাংশ বাড়তে পারে। আর গ্রিন হাউজ গ্যাসের নির্গমন ও তাপমাত্রা বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে আরো বাড়তে পারে প্রাক-বর্ষা মৌসুমে বজ্রঝড়ের তীব্রতা ও ঘনত্ব। তখন অসময়ে কালবৈশাখী এবং তীব্র ঝোড়ো হাওয়ার প্রবণতাও বাড়বে। আর বজ্রপাতের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়বে। বিশেষ করে উত্তর-পূর্বাঞ্চল, হাওর এলাকা, নদীবিধৌত অঞ্চল এবং বিস্তীর্ণ কৃষিজমি ভবিষ্যতেও উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা বিবেচিত হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে বজ্রপাতকে শুধু একটি প্রাকৃতিক ঘটনা হিসেবে দেখলে চলবে না। এটিকে বিবেচনা করতে হবে জননিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে।
এদিকে আবহাওয়াবিদ ও পরিবেশবিদদের মতে, আগাম সতর্কতা এবং সঠিক আচরণ বজ্রপাত থেকে বাঁচার সবচেয়ে কার্যকর উপায়। আকাশে কালো মেঘ, বিদ্যুৎ চমকানো বা বজ্রধ্বনি শুনলেই দ্রুত নিরাপদ ভবনের ভেতরে আশ্রয় নিতে হবে। খোলা মাঠে, ধান ক্ষেতে, হাওরে, নদী-বিল-জলাশয়ে অবস্থান করা যাবে না। বড় গাছের নিচে আশ্রয় নেয়া থেকেও বিরত থাকতে হবে। মাছ ধরা, নৌকা চালানো এবং কৃষিকাজ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হবে। আর আশ্রয় না পেলে দুই পা একসঙ্গে রেখে নিচু হয়ে বসতে হবে, তবে মাটিতে শুয়ে পড়া যাবে না। বাইসাইকেল, মোটরসাইকেল বা খোলা ট্রাক্টরে থাকলে দ্রুত নিরাপদ স্থানে যেতে হবে। তাছাড়া ঘরের ভেতরে থাকলেও সতর্ক থাকতে হবে। আর বজ্রঝড়ের সময় টেলিভিশন, ফ্রিজ, কম্পিউটার, রাউটারসহ বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির প্লাগ খুলে রাখা উচিত। তখন তারযুক্ত টেলিফোন ব্যবহার না করাই ভালো। আর ধাতব পাইপের মাধ্যমে বিদ্যুৎ পরিবাহিত হতে পারে বলে ওই সময় গোসল করা, বাসন মাজা বা ট্যাপের পানি ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে হবে। যদিও সরকার বজ্রপাত মোকাবিলায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় তালগাছসহ অন্যান্য উঁচু গাছ রোপণের উদ্যোগ নিয়েছে। তাছাড়া ব্রজপাতের বিষয়ে শুধু সতর্কতা প্রচার নয়, বজ্রনিরোধক অবকাঠামোর সমপ্রসারণ এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। মূলত সচেতনতার অভাব, ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ এবং পর্যাপ্ত সুরক্ষা ব্যবস্থার অভাবে বজ্রপাত ভয়াবহ প্রাণঘাতী দুর্যোগে পরিণত হয়েছে। ওই ঝুঁকি আরো বাড়তে পারে।
অন্যদিকে এ প্রসঙ্গে আবহাওয়া অধিদপ্তরের জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ ড. বজলুর রশীদ জানান, কালবৈশাখীর সময় মেঘে বিদ্যুতের প্রবাহ তৈরি হয় এবং তা বজ্রপাতের মাধ্যমে ভূমিতে নেমে আসে। কয়েক সেকেন্ডের এ প্রাকৃতিক ঘটনা মানুষের প্রাণ কেড়ে নিতে পারে। মূলত নগরায়ণ, বন উজাড় হওয়া এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার কারণে বজ্রপাতের প্রকৃতি ও তীব্রতায় পরিবর্তন এসেছে। বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা বৃদ্ধি, আর্দ্রতার পরিবর্তন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বজ্রপাতের সময়কালও দীর্ঘ হচ্ছে। আগে মার্চ-এপ্রিলকে বজ্রপাতের মৌসুম ধরা হতো। এখন সময়সীমা বেড়ে আগস্ট মাস পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। বৃষ্টিপাত বেশি হলে বজ্রপাতের ঝুঁকিও বাড়ে। হাওরাঞ্চলে বজ্রপাতে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়। বজ্রপাতের নির্ভুল পূর্বাভাস দেয়া কঠিন। সচেতনতাই কার্যকরী প্রতিরোধ।
এ বিষয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের পরিচালক নিতাই চন্দ্র দেবনাথ জানান, দেশে চলতি বছরের ১৪ জুন পর্যন্ত বজ্রপাতে ১২৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। ৫৫ জন আহত হয়েছে। বজ্রপাতে গত ১০ বছরে ৩ হাজার ৩৯৮ জন মারা গেছে।











