শ্রীমঙ্গলে ব্যারিকেড ভেঙে হবিগঞ্জের পথে এনসিপি, ফের পুলিশের বাধা

নিজস্ব প্রতিবেদক:

হবিগঞ্জে যাওয়ার পথে একের পর এক পুলিশের বাধার মুখে পড়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় নেতারা। বুধবার (২৯ জুলাই) বিকেলে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে পুলিশের ব্যারিকেডের সামনে প্রায় এক ঘণ্টা বাগ্‌বিতণ্ডার পর তা অতিক্রম করে হবিগঞ্জের উদ্দেশে রওনা হন তারা। পরে হবিগঞ্জের মিরপুর এলাকার কাছাকাছি পৌঁছালে আবারও পুলিশ তাদের গাড়িবহর আটকে দেয়। একপর্যায়ে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির মধ্যে সড়কে বসে প্রতিবাদ করেন এনসিপির নেতারা।

 

এর আগে শ্রীমঙ্গল উপজেলার সাতগাঁও এলাকায় চা-কন্যা ভাস্কর্যের সামনে ঢাকা-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়কে বিকেল ৪টার দিকে এনসিপির গাড়িবহর আটকে দেয় পুলিশ। বহরে ছিলেন দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, সদস্যসচিব আখতার হোসেন, মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম, দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ, জাতীয় নারী শক্তির সদস্যসচিব মাহমুদা মিতুসহ কেন্দ্রীয় নেতারা।

 

পুলিশের বাধার কারণ হিসেবে নিরাপত্তার বিষয়টি সামনে আনা হয়। শ্রীমঙ্গল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুর রাজ্জাক বলেন, হবিগঞ্জ পৌর এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি থাকার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এনসিপির নেতাদের সেখানে না যাওয়ার অনুরোধ করা হয়েছিল। তবে তারা সেই অনুরোধ না মেনে হবিগঞ্জের পথে রওনা হন।

 

পুলিশের ব্যারিকেডের সামনে এনসিপির নেতাদের সঙ্গে কর্মকর্তাদের দীর্ঘ সময় কথা কাটাকাটি হয়। এ সময় হাসনাত আবদুল্লাহ এক পুলিশ কর্মকর্তাকে উদ্দেশ করে জানতে চান, কোন আইনে তাদের শ্রীমঙ্গলে আটকে রাখা হচ্ছে। তিনি বলেন, নিরাপত্তার ঝুঁকি থাকলে পুলিশ তাদের নিরাপত্তা দিক, তা না হলে তারা নিজেদের দায়িত্বে হবিগঞ্জে যাবেন।

 

পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়, হবিগঞ্জের সীমানায় গেলে বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে। জবাবে হাসনাত বলেন, “আপনি যদি পারেন সিকিউরিটি দিবেন, যদি না পারেন তাহলে আমরা আমাদের দায়িত্ব নিয়ে চলে যাব।”

 

অন্যদিকে সারজিস আলম অভিযোগ করেন, ১৪৪ ধারা হবিগঞ্জে জারি হলেও শ্রীমঙ্গলে তাদের আটকে দেওয়া হচ্ছে। তিনি প্রশাসনকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের অভিযোগও তোলেন।

 

প্রায় এক ঘণ্টা পর বিকেল ৫টার দিকে ব্যারিকেড অতিক্রম করে হবিগঞ্জের উদ্দেশে রওনা হয় এনসিপির গাড়িবহর। তবে হবিগঞ্জের মিরপুর এলাকার কাছে পৌঁছানোর পর আবারও পুলিশের বাধার মুখে পড়ে তারা। সেখানে নেতারা গাড়ি থেকে নেমে সড়কে বসে প্রতিবাদ জানান।

 

এনসিপির হবিগঞ্জ যাওয়ার কর্মসূচিকে ঘিরে উত্তেজনার সূত্রপাত মঙ্গলবার (২৮ জুলাই)। ওই দিন হবিগঞ্জ শহরের সাইফুর রহমান টাউন হলের সামনে জুলাই পদযাত্রার সভা শেষে সার্কিট হাউসের দিকে যাওয়ার পথে দলটির নেতাকর্মীদের ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে। সবুজবাগ এলাকায় নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও সারজিস আলমের ওপর হামলা এবং তাদের গাড়ি ভাঙচুরের অভিযোগ করা হয়। পরে তারা সোনালী ব্যাংকের প্রধান শাখার ভেতরে আশ্রয় নেন। দুই পক্ষের মধ্যে ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনায় সারজিস আলমসহ অন্তত ২০ জন আহত হন বলে এনসিপির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়।

 

পুলিশ পরে তাদের উদ্ধার করে সার্কিট হাউসে নিয়ে যায়। ওই ঘটনার প্রতিবাদে পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি ঘোষণা করে বিএনপি, ছাত্রদল, যুবদল ও এনসিপি। পরিস্থিতির অবনতি ঠেকাতে বুধবার সকাল থেকে হবিগঞ্জ পৌর এলাকার নির্দিষ্ট স্থানে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৪ ধারা জারি করে জেলা প্রশাসন। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে তিন প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়।

 

এনসিপির উত্তরাঞ্চলের সংগঠক নাহিদ উদ্দিন তারেক বলেন, তাদের ওপর হামলার প্রতিবাদে বিক্ষোভ কর্মসূচি দেওয়া হয়েছিল। তবে ১৪৪ ধারা জারির পর তারা কর্মসূচি থেকে সরে এসে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বিষয়টি দেশবাসীর সামনে তুলে ধরার সিদ্ধান্ত নেন।

 

তবে হবিগঞ্জ জেলা যুবদলের সদস্যসচিব সফিকুর রহমান সিতু এনসিপির নেতাদের বক্তব্যের সমালোচনা করেছেন। তার দাবি, এনসিপির নেতাদের বক্তব্যে ক্ষুব্ধ হয়েই স্থানীয় মানুষের পক্ষ থেকে প্রতিবাদ এসেছে। একই সঙ্গে তিনি ভবিষ্যতে যেন এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হয়, সে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।

 

হবিগঞ্জ সদর মডেল থানার ওসি মো. জাহিদুল হক জানান, মঙ্গলবারের ঘটনায় তখন পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি এবং পরিস্থিতি শান্ত ছিল। অন্যদিকে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

 

এদিকে ১৪৪ ধারা জারি থাকার মধ্যেই এনসিপির শীর্ষ নেতাদের হবিগঞ্জে যাওয়ার সিদ্ধান্ত এবং পথে পুলিশের একাধিক বাধা নতুন করে উত্তেজনা তৈরি করেছে। শ্রীমঙ্গলে ব্যারিকেড অতিক্রমের পরও হবিগঞ্জের পথে ফের বাধার মুখে পড়ায় পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, সেটিই এখন নজরে রয়েছে।