অনলাইন ডেস্ক:
চিত্রনায়ক সালমান শাহ হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার অভিনেতা আশরাফুল হক ওরফে ডনের পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে করা আবেদনের শুনানি শেষে বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানা এ আদেশ দেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির ঢাকা মেট্রো দক্ষিণের পরিদর্শক মো. মজিবুর রহমান ডনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেছিলেন। শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষে পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী রিমান্ড মঞ্জুরের পক্ষে বক্তব্য দেন। বাদীপক্ষের আইনজীবী মোরশেদ হোসেন শাহীনও সর্বোচ্চ রিমান্ডের আবেদন করেন। তবে আসামিপক্ষের আইনজীবী ঢাকা বারের সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম, ফরিদুল ইসলামসহ অন্যরা রিমান্ডের বিরোধিতা করে জামিনের আবেদন করেন। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আদালত পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
গত ২০ আগস্ট ঢাকার সিএমএম আদালতে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মো. মজিবুর রহমান ডনকে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ডের আবেদন করেন। ওই আবেদনের শুনানির জন্য ২৭ আগস্ট দিন ধার্য করা হয়েছিল।
রিমান্ড আবেদনে সিআইডি বলেছে, ডনকে পুলিশ হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলার প্রকৃত রহস্য উদঘাটনে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে ঘটনায় জড়িত অন্য সহযোগীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের বিষয়েও তথ্য পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
আবেদনে আরও বলা হয়, ডনের বিরুদ্ধে বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও তিনি কীভাবে, কেন এবং কার ইন্ধনে বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, সে বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন। এসব বিষয়ে তথ্য পাওয়ার পাশাপাশি মামলার তদন্তেও তা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে বলে জানিয়েছে তদন্ত সংস্থা।
এ দিন সকালে ডনকে আদালতের হাজতখানায় হাজির করা হয়। পরে শুনানির জন্য তাকে এজলাসে তোলা হয়। এদিকে সকাল থেকেই আদালতের সামনে সালমান শাহর ভক্তরা ব্যানার নিয়ে মানববন্ধন করেন। তারা ডনের সর্বোচ্চ রিমান্ড মঞ্জুরের দাবি জানান। তাদের বক্তব্য, ডনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে মামলার অন্য আসামিদের বিষয়ে তথ্য পাওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে সালমান শাহর স্ত্রী সামিরাসহ মামলার বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারের দাবিও জানান তারা।
এর আগে ৯ আগস্ট হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ডনকে গ্রেপ্তার করে ইমিগ্রেশন পুলিশ। পরে তাকে সিআইডির কাছে হস্তান্তর করা হয়। ওই দিনই তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন আদালত। ২ আগস্ট সিএমএম আদালতে তার জামিন আবেদন নামঞ্জুর হয়। পরে ২৫ আগস্ট দায়রা আদালতেও জামিন আবেদন নামঞ্জুর করা হয়।
যেভাবে হত্যা মামলা
১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর ইস্কাটনের বাসায় সালমান শাহর মৃত্যু হয়। তার মৃত্যুর ঘটনায় প্রথমে রমনা থানায় অপমৃত্যুর মামলা করেন তার বাবা প্রয়াত কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী।
১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে অভিযোগ করে মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তরের আবেদন করেন সালমান শাহর বাবা। অপমৃত্যুর মামলার সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ একসঙ্গে তদন্তের জন্য সিআইডিকে নির্দেশ দেন আদালত।
১৯৯৭ সালের ৩ নভেম্বর সিআইডি আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়। সেখানে সালমান শাহর মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। ওই বছরের ২৫ নভেম্বর ঢাকার সিএমএম আদালত সেই প্রতিবেদন গ্রহণ করেন। সিআইডির ওই প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে সালমান শাহর বাবা রিভিশন মামলা করেন।
এর দীর্ঘ সময় পর ২০২৫ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত রিভিশন মঞ্জুর করে ঘটনাটি হত্যা মামলা হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেন। এর পরদিন ২১ অক্টোবর সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরীর পক্ষে তার ভাই ও সালমান শাহর মামা মোহাম্মদ আলমগীর কুমকুম বাদী হয়ে রমনা থানায় হত্যা মামলা করেন।
মামলায় সালমান শাহর সাবেক স্ত্রী সামিরা হক, তার মা লতিফা হক লুসি, ব্যবসায়ী ও সাবেক চলচ্চিত্র প্রযোজক আজিজ মোহাম্মদ ভাই, আশরাফুল হক ডন, ডেভিড, জাভেদ, ফারুক, মে-ফেয়ার বিউটি সেন্টারের রুবী, আব্দুস ছাত্তার, সাজু এবং রেজভি আহমেদ ওরফে ফরহাদকে আসামি করা হয়েছে। এ ছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও অনেককে আসামি করা হয়েছে। আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০২ ও ৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।
মামলার অভিযোগে বলা হয়, ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী, বাবা কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী এবং ছোট ছেলে শাহরান শাহ নিউ ইস্কাটনের বাসায় সালমানের সঙ্গে দেখা করতে যান। সেখানে গিয়ে তারা জানতে পারেন, সালমান ঘুমাচ্ছেন।
কিছুক্ষণ পর প্রডাকশন ম্যানেজার সেলিম ফোন করে জানান, সালমানের কিছু হয়েছে। এরপর তারা দ্রুত বাসায় ফিরে তাকে শয়নকক্ষে নিথর অবস্থায় দেখতে পান। অভিযোগ অনুযায়ী, সেখানে কয়েকজন বহিরাগত নারী তার হাত-পায়ে তেল মালিশ করছিলেন। পাশের কক্ষে সামিরার আত্মীয় রুবী বসে ছিলেন।
সালমানের মা তখন তাকে হাসপাতালে নেওয়ার অনুরোধ করেন। হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার গলায় দড়ির দাগ এবং মুখমণ্ডল ও পায়ে নীলচে দাগ দেখা যায় বলে মামলার অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে হলি ফ্যামিলি হাসপাতাল হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
মামলার বাদী মোহাম্মদ আলমগীর তার অভিযোগে আরও উল্লেখ করেন, সালমানের বাবা মৃত্যুর আগে ছেলের মৃত্যুকে হত্যা বলে সন্দেহ করেছিলেন। ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই তিনি চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আবেদন করে রমনা থানার অপমৃত্যু মামলাটি দণ্ডবিধির ৩০২ ও ৩৪ ধারায় হত্যা মামলা হিসেবে গ্রহণ এবং সিআইডির মাধ্যমে তদন্তের আবেদন জানান। বাবার মৃত্যুর পর নীলা চৌধুরীর পক্ষে মোহাম্মদ আলমগীর মামলাটি পরিচালনা করছেন।
মামলায় অভিযুক্তদের মধ্যে কেউ মারা গিয়ে থাকলে প্রমাণ সাপেক্ষে তাদের মামলার দায় থেকে অব্যাহতি দেওয়ার কথাও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
লাশ উত্তোলনের উদ্যোগ
মামলার তদন্তে সালমান শাহর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটনের জন্য ২০২৬ সালের ২০ মে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে তার মৃতদেহ কবর থেকে উত্তোলনের অনুমতি চেয়ে আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা। পরে ২৪ মে লাশ উত্তোলন করে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি ও ময়নাতদন্তের অনুমতি দেওয়া হয়।
লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল চেয়ে বাদীপক্ষ আবেদন করলে আদালত তা নথিভুক্ত করেন। এরপর ২২ জুন দেহাবশেষ উত্তোলনের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সিলেটের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পিংকি সাহাকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এ-সংক্রান্ত আদেশের অনুলিপিও আদালতে দাখিলের পর নথিভুক্ত করা হয়।
মামলায় তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ৩০ আগস্ট তারিখ নির্ধারিত রয়েছে।











