অনলাইন ডেস্ক:
হিমালয়ের নেপাল ও চীনের তিব্বত অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে অন্তত ৩৬২ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে নেপালে ৩৫৯ জন এবং তিব্বতে তিনজনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে। দুই অঞ্চলে ১,৪০০-এর বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজদের মধ্যে বিভিন্ন দেশের পর্যটক, তীর্থযাত্রী ও বিদেশি নাগরিক রয়েছেন।
বুধবার হিমালয়ের একটি নদীতে বরফ, কাদা ও শিলার বিশাল স্রোত নেমে আসার পর এই বিপর্যয় শুরু হয়। মুহূর্তের মধ্যে নদীর পানি ও ধ্বংসাবশেষ আশপাশের জনপদ ও উপত্যকায় ছড়িয়ে পড়ে। এতে বাড়িঘর, সড়ক, সেতু ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রয়টার্স জানিয়েছে, কাঠমান্ডু ও তিব্বতের লাসাকে যুক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ পথও দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বৃহস্পতিবার নেপাল পুলিশের সর্বশেষ হিসাবে, দেশটিতে ৩৫৯টি মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। এর আগে ১৫:১৭ BST-এর আপডেটে নিহতের সংখ্যা ছিল ৩৫৩। দ্য গার্ডিয়ান নেপাল পুলিশের তথ্য উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, উদ্ধার হওয়া মরদেহের মধ্যে রাসুয়ায় ১৭, নুওয়াকোটে ২৮, ধাদিংয়ে ৩৩, চিতওয়ানে ১৩২, গোরখায় ৩০, তানাহুনে ২২, নাওয়ালপরাসি ইস্টে ৮২ এবং নাওয়ালপরাসি ওয়েস্টে ১৫ জন রয়েছেন।
নেপালে ৯১০ জন নিখোঁজ রয়েছেন বলে দেশটির পুলিশ ও পর্যটন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৫০০-এর বেশি বিদেশি নাগরিক। দুই ডজনের বেশি দেশের নাগরিক নিখোঁজদের তালিকায় রয়েছেন।
নিখোঁজদের মধ্যে ভারতের ১৭৭, যুক্তরাষ্ট্রের ৬৩, অস্ট্রেলিয়ার ৩৪, যুক্তরাজ্যের ৩৩ এবং কানাডার ২৫ নাগরিক রয়েছেন। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নেপালে প্রায় ১০০ চীনা নাগরিকও নিখোঁজ রয়েছেন।
চীনের তিব্বত অঞ্চলের গিয়েরং কাউন্টিতে ৫৫৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন। চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভির তথ্য অনুযায়ী, তাঁদের মধ্যে ২৬০ জন বিদেশি নাগরিক। সেখানে তিনজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
তিব্বতের নিখোঁজদের মধ্যে কতজন কোন দেশের নাগরিক, তার বিস্তারিত সংখ্যা দেওয়া হয়নি। তাই নেপাল ও তিব্বতের তথ্য আলাদাভাবে রাখা হয়েছে।
দুর্যোগের শুরুতে নেপালের কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, এলাকায় ৪.৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্প হয়ে থাকতে পারে। তাঁদের প্রাথমিক ধারণা ছিল, এর কারণে হিমবাহের নিচের অংশ ধসে গিয়ে আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হতে পারে।
তবে পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানায়, সেটি প্রকৃত ভূমিকম্প ছিল না। হিমবাহের শিলা ও বরফ আকস্মিকভাবে ধসে পড়ার ফলে যে ভূকম্পনীয় শক্তি তৈরি হয়েছিল, সেটিই ভূমিকম্পের মতো সংকেত সৃষ্টি করে। এরপর বিশাল ধ্বংসাবশেষের স্রোত তৈরি হয়ে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
দ্য গার্ডিয়ানও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস)-এর এই ব্যাখ্যার কথা জানিয়েছে। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়, ঘটনাটি প্রথমে ৪.৪ মাত্রার ভূমিকম্প হিসেবে শনাক্ত হলেও পরবর্তী বিশ্লেষণে এর পেছনে হিমবাহ ধস ও ধ্বংসাবশেষের প্রবাহের বিষয়টি উঠে আসে।
স্যাটেলাইট চিত্রের প্রাথমিক বিশ্লেষণেও বরফ ও শিলার ধসের পর লহেন্দে নদী দিয়ে বিপুল ধ্বংসাবশেষের স্রোত নেমে যাওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। আল জাজিরা এ বিষয়ে স্যাটেলাইট বিশ্লেষণের তথ্য তুলে ধরেছে।
দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় উদ্ধারকাজ চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। বন্যার পানিতে সড়ক ও সেতুর বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অনেক এলাকায় স্থলপথে পৌঁছানো যাচ্ছে না।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুর্গত এলাকায় পৌঁছে জীবিতদের উদ্ধার করাই উদ্ধারকারীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি হেলিকপ্টার দুর্গত এলাকায় পাঠানো হচ্ছে। সেখান থেকে আহতদের হাসপাতালে নেওয়ার পাশাপাশি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া মানুষের কাছে জরুরি সরবরাহ পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
নেপালের সেনাবাহিনীর মুখপাত্র রাজা রাম বাসনেত জানিয়েছেন, পাঁচ হাজারের বেশি সেনা ও পুলিশ সদস্য উদ্ধারকাজে যুক্ত হয়েছেন। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় প্রতিবেশী ভারত সরবরাহ করা তাঁবু, খাবার ও ওষুধ হেলিকপ্টারে করে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
এদিকে নেপালের দুর্যোগ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বন্যার এলাকায় তৈরি হওয়া একটি হ্রদের পানি বাড়ছে এবং সেটি যেকোনো সময় ভেঙে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। এ কারণে বাসিন্দা ও উদ্ধারকারীদের নদীর তীর থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। রয়টার্সও কর্তৃপক্ষের বরাতে হ্রদটি নিয়ে নতুন বন্যার আশঙ্কার কথা জানিয়েছে।
তিব্বতের দুর্গত এলাকায় চীনের প্রধানমন্ত্রী
চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াং বৃহস্পতিবার বিকেলে তিব্বতের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পৌঁছেছেন। রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি জরুরি উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সেখানে গেছেন।
রয়টার্স জানিয়েছে, তিব্বতের গিয়েরং কাউন্টিতে ৫৫৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ২৬০ জন বিদেশি। চীনে তিনজনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। (Reuters)
নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহও সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোর একটি নুওয়াকোটের বিদুরের উদ্দেশে সড়কপথে রওনা হয়েছেন। তাঁর কার্যালয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ তথ্য জানিয়েছে।
তীর্থযাত্রী ও পর্যটকরাও নিখোঁজ
দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা কাঠমান্ডু থেকে তিব্বতের লাসার দিকে যাওয়া পর্যটক ও তীর্থযাত্রীদের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ। নিখোঁজদের মধ্যে কৈলাস পর্বত ও মানসসরোবরের উদ্দেশে যাওয়া তীর্থযাত্রীরাও রয়েছেন।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিব্বতের কৈলাস পর্বত ও মানসসরোবর হিন্দু, বৌদ্ধসহ বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীর কাছে গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থান।
রাসুয়ার স্বাস্থ্যকর্মী তুলা বাহাদুর বিকি জানিয়েছেন, নদীর পাশের বসতিগুলো পুরোপুরি ভেসে গেছে। তাঁর নিজের পাঁচ আত্মীয়ও নিখোঁজ রয়েছেন। দুর্গত উপত্যকাগুলোতে কাদায় ঘরবাড়ি, গাছ ও যানবাহন চাপা পড়েছে। আকাশ থেকে ধারণ করা ভিডিওতে ধসে পড়া বাড়ি, পানিতে ডুবে থাকা গাড়ি এবং স্রোতে ভেসে যাওয়া ধাতব সেতুর চিত্র দেখা গেছে।
বন্যার পানি গণ্ডক নদীর অববাহিকায় ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় ভারতের নেপাল সীমান্তবর্তী বিহার, উত্তর প্রদেশ ও উত্তরাখণ্ড রাজ্য থেকেও হাজারো মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
নেপালের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে হেলিকপ্টারে করে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। তবে দুর্গম পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি এবং যোগাযোগব্যবস্থার ক্ষতির কারণে উদ্ধারকারীদের কাজ কঠিন হয়ে রয়েছে।
দুর্যোগের পর আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকেও সহায়তার ঘোষণা এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর একজন দুর্যোগ মোকাবিলা-বিষয়ক উপদেষ্টা পাঠানোর পাশাপাশি জরুরি সহায়তা হিসেবে ৫ লাখ ডলার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয় দপ্তরের প্রধান টম ফ্লেচার জানিয়েছেন, নেপালের ত্রাণ কার্যক্রমে জাতিসংঘের গ্লোবাল ইমার্জেন্সি ফান্ড CERF থেকে ২ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করা হবে। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এর আগে নেপালের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় জরুরি সরঞ্জাম ও সহায়তাকর্মী পাঠানোর কথা জানিয়েছিলেন।
যুক্তরাজ্যও নেপাল সরকারকে ৫ মিলিয়ন পাউন্ড সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে পরিস্থিতিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও ধ্বংসাত্মক হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। ৩০ জনের বেশি ব্রিটিশ নাগরিক নিখোঁজদের মধ্যে রয়েছেন বলেও জানানো হয়েছে।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বন্যাকে ‘ধ্বংসাত্মক’ বলে বর্ণনা করেছেন। কানাডার কর্মকর্তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন।
অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ বলেছেন, দুর্গম এলাকা থেকে পরিষ্কার তথ্য সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এর পেছনে স্থানীয় অবকাঠামো ও সম্পদের সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
নেপালের জলবায়ু ও জননীতি বিশেষজ্ঞ সুনীল আচার্য আল জাজিরাকে বলেছেন, এই বন্যা দেশটির বাড়তে থাকা জলবায়ু ঝুঁকির একটি উদাহরণ।
তিনি বলেন, এটি শুধু একটি অনিশ্চিত প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়। জলবায়ু সংকটের সামনের সারিতে থাকা মানুষের বাস্তবতার একটি নির্মম উদাহরণ এটি।
নেপালের একার পক্ষে জলবায়ু সংকট মোকাবিলা করা কঠিন বলেও মন্তব্য করেন তিনি। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে ভবিষ্যতে এ ধরনের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
নেপাল ও তিব্বতের দুর্গম এলাকায় উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে নতুন করে বন্যার আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় দুর্গত এলাকার মানুষ ও উদ্ধারকারীদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।











