নিজস্ব প্রতিবেদক:
দেশকে অস্থিতিশীল করতে কেউ কেউ গুজব ছড়ানোর পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে মানুষকে উসকে দেওয়ার চেষ্টা করছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্টের যেকোনো অপচেষ্টা ঠেকাতে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেছেন, প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ। তাঁর ভাষায়, ‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার।’
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) সকাল ১০টায় রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে শুভ জন্মাষ্টমী উপলক্ষে সনাতন ধর্মাবলম্বী বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় এবং পুরোহিত ও সেবাইতদের মধ্যে সম্মানী বিতরণ অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে দল, মত, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে মানুষ পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি বজায় রেখে নিজ নিজ ধর্ম ও সংস্কৃতি পালন করে আসছে। তবে সময়ে সময়ে ‘কংস’ চরিত্রের মানুষেরা রাষ্ট্র ও সমাজে বিভেদ ও বিরোধ জিইয়ে রাখার চেষ্টা করেছে।
তিনি বলেন, সমাজবিরোধী অপশক্তি যেন আর মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে এবং কেউ যেন বিরাজমান সম্প্রীতির পরিবেশ নষ্ট করতে না পারে, সে জন্য সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির বন্ধন অটুট রাখা নাগরিক হিসেবে সবার দায়িত্ব।
জন্মাষ্টমীর তাৎপর্য তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, হিন্দু ধর্মীয় শাস্ত্রমতে কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব ঘটে। দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন ছিল তাঁর অন্যতম ব্রত। শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাবের পর মথুরার অত্যাচারী শাসক কংসের পতন ঘটে।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রসঙ্গ টেনে তারেক রহমান বলেন, দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় ধরে গণতন্ত্রকামী জনগণের অধিকার কেড়ে নিয়ে ‘কংসের’ মতো এক নিষ্ঠুর শাসক জনগণের ওপর চেপে বসেছিল। দল, মত, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে গণতন্ত্রকামী জনগণ হাজারো প্রাণের বিনিময়ে সেই ‘কংসরূপী ফ্যাসিস্টদের’ পতন ঘটিয়েছে। বাংলাদেশে আবারও গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভঙ্গুর অর্থনীতি, বিভাজিত প্রশাসন ও অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলার উন্নতি ঘটিয়ে এখন দেশ পুনর্গঠনের পালা।
ধর্মীয় পরিচয়ের বিভাজনের পরিবর্তে সবাইকে বাংলাদেশি পরিচয়ে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, একটি রাষ্ট্র ও সমাজে বিভিন্ন ধর্ম ও মতের মানুষের সম্মিলনই বৈচিত্র্যময় সমাজের সৌন্দর্য।
তিনি বলেন, বৈশ্বিক পরিসরে সংখ্যালঘু কিংবা সংখ্যাগুরু পরিচয় মুখ্য নয়। ইউরোপ বা আমেরিকায় গেলে আজকের অনুষ্ঠানে যারা সংখ্যালঘু কিংবা সংখ্যাগুরু হিসেবে বিবেচিত, তারাও কথিত সংখ্যালঘু হয়ে যান। তাই বর্তমান ‘গ্লোবাল ভিলেজে’ সংখ্যালঘু বা সংখ্যাগুরু পরিচয়কে মুখ্য বিষয় না করে সবাইকে নিজেদের বাংলাদেশি ভাবতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘রাষ্ট্র ও সমাজে দল-মত, ধর্ম-বর্ণ ও পরিচয় যেন মানুষের মধ্যে বিভেদ-বৈষম্য সৃষ্টির কারণ না হয়।’ দেশের সব নাগরিককে ঐক্যবদ্ধ রাখতে ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’-এর রাজনৈতিক দর্শনের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, সব নাগরিকের গর্বিত পরিচয়, ‘আমরা বাংলাদেশি।’
জন্মাষ্টমী উপলক্ষে ধর্মীয় সম্প্রীতি, সহনশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সৌহার্দ্যের বন্ধন আরও সুদৃঢ় করার আহ্বানও জানান তিনি।
দেশকে অস্থিতিশীল করতে কেউ কেউ নানা ধরনের গুজব ছড়াচ্ছে বলে সতর্ক করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আশ্রয় নিয়ে মানুষকে উসকে দেওয়ার অপচেষ্টাও চলছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, কোনো ধরনের সাম্প্রদায়িক উসকানি কিংবা বিদ্বেষ যেন সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে না পারে, সে বিষয়ে সবাইকে সজাগ থাকতে হবে। অপশক্তি যাতে আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে, সে জন্য সম্মিলিতভাবে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ‘প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তা বিধানে বর্তমান সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ।’
সমৃদ্ধ ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়তে নাগরিকদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের ওপর গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। সার্বভৌমত্ব সুসংহত রাখার পাশাপাশি এ লক্ষ্য পূরণে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে বলে জানান তিনি।
তারেক রহমান বলেন, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, স্পোর্টস কার্ড এবং সব ধর্মের ধর্মীয় গুরুদের জন্য সম্মানী ভাতাসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া ও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, সরকার এমন একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়, যেখানে রাষ্ট্র তার সাধ্য ও সামর্থ্য অনুযায়ী দল, মত, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে নাগরিকদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেবে। একই সঙ্গে নাগরিকেরাও রাষ্ট্রের প্রতি তাদের দায়িত্ব পালন করবেন।
রাষ্ট্র, সরকার ও নাগরিকদের পারস্পরিক দায়িত্ব, আস্থা ও আলাপের মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত কল্যাণরাষ্ট্র গড়ে উঠবে বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। রাষ্ট্র ও সমাজে কেউ যাতে পিছিয়ে না থাকে, তা নিশ্চিত করতে সরকার বদ্ধপরিকর বলেও জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এই দেশ আপনার, আমার, আমাদের সকলের। নাগরিক হিসেবে এই দেশে আপনার-আমার-আমাদের সকলের অধিকার সমান।’
নিজ নিজ ধর্মীয় বিশ্বাস ও সংস্কৃতি অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা প্রতিটি নাগরিকের সাংবিধানিক মৌলিক অধিকার বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
এ সময় তিনি বলেন, ‘বর্তমান সরকার বিশ্বাস করে, বিএনপি বিশ্বাস করে, ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার। ধর্ম যার যার হলেও নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার সবার।’
জন্মাষ্টমীর পর আসন্ন শারদীয় দুর্গাপূজার কথাও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। সব ধর্মীয় উৎসব শান্তি, স্বস্তি ও নিরাপত্তার সঙ্গে পালনের আহ্বান জানিয়ে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের দুর্গোৎসবের আগাম শুভেচ্ছা জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী ৯ জন সেবায়েত ও পুরোহিতের হাতে চেক তুলে দেন। বক্তব্যের শেষে সনাতন ধর্মাবলম্বীসহ সবাইকে জন্মাষ্টমীর শুভেচ্ছা জানান তিনি।











