দেশে নারী ও শিশুদের নিরাপত্তায় সরকারি নানামুখী উদ্যোগ, আইনগত সংশোধন ও সামাজিক সচেতনতামূলক কার্যক্রম দৃশ্যমান হলেও সহিংসতা ও নির্যাতনের সার্বিক চিত্রে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আসছে না। তথ্য বিশ্লেষণ করে জানা যায়, চলতি ২০২৬ সালের প্রথম সাত মাসে দেশজুড়ে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় পুলিশের খাতায় সাড়ে ১২ হাজারের কাছাকাছি মামলা নথিভুক্ত করা হয়েছে। তবে অপরাধ বিশ্লেষক ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের মতে, থানার খাতায় যে মামলার হিসাব উঠে আসে, তা বাস্তব পরিস্থিতির একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। সামাজিক লোকলজ্জা, পরিবারের তরফ থেকে আসা বাধা, অপরাধীদের ভয়ভীতি এবং আইনি প্রক্রিয়ার দীর্ঘ জটিলতার কারণে অনেক ভুক্তভোগীই শেষ পর্যন্ত পুলিশের কাছে গিয়ে অভিযোগ দায়ের করতে পারেন না। ফলে রাষ্ট্রীয় পরিসংখ্যানে অপরাধের যে চিত্র ফুটে ওঠে, তার অন্তরালে বহু নির্যাতন আড়ালেই রয়ে যাচ্ছে। পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সারা দেশের বিভিন্ন থানায় নারী ও শিশু নির্যাতনের অভিযোগে মোট ১২ হাজার ৪৪৬টি মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। হিসাব অনুযায়ী, প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ১ হাজার ৭৭৮টি করে অপরাধের ঘটনা থানায় আনুষ্ঠানিকভাবে রজু হয়েছে। এর মধ্যে কেবল রাজধানী ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) আওতাধীন থানাগুলোতেই ৮৮৬টি মামলা দায়ের করা হয়। মাসভিত্তিক তথ্যে দেখা যায়, জানুয়ারিতে সারা দেশে ১ হাজার ২৮১টি মামলা হওয়ার পর ফেব্রুয়ারি ও মার্চে এই সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ১ হাজার ১৮১ ও ১ হাজার ৪৮৫টি। এপ্রিল মাস থেকে এই হার দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে যথাক্রমে ২ হাজার ১১টি, ১ হাজার ৯৫২টি এবং জুনে ২ হাজার ২০০টিতে পৌঁছায়। জুলাই মাসে দেশজুড়ে রেকর্ড সর্বোচ্চ ২ হাজার ৩ ৩৬টি মামলা নথিভুক্ত করা হয়। আগের বছরের একই সময়ের সাথে তুলনা করলে দেখা যায়, ২০২৫ সালের প্রথম সাত মাসে দেশজুড়ে ১২ হাজার ৮৩৯টি এবং ডিএমপিতে ১ হাজার ৪৮টি মামলা হয়েছিল, যা নির্দেশ করে যে অপরাধের এই ঊর্ধ্বমুখী গতি প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে। আইনগত প্রতিকারের এই সংকটময় পরিস্থিতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক সংস্থা জাতিসংঘ শিশু তহবিল (ইউনিসেফ)। জানা গেছে, মে মাসে প্রকাশিত এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে সংস্থাটি উল্লেখ করে যে, পরিবার, বিদ্যালয় ও সামাজিক পরিবেশ- যেসব স্থান শিশুদের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ হওয়ার কথা ছিল, সেখানেই তারা চরম যৌন ও শারীরিক বর্বরতার শিকার হচ্ছে। বিচারব্যবস্থার ঘাটতি দূর করে শিশুবান্ধব আইনি কাঠামো নিশ্চিত করা, প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তা জোরদার এবং ভুক্তভোগীদের মানসিক সহায়তা প্রদানের তাগিদ দিয়েছে সংস্থাটি। সূত্র মতে, কেবল অপরাধের উচ্চ হারই একমাত্র উদ্বেগের বিষয় নয়, বরং বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা ও দুর্বল তদন্তের কারণে আসামীদের পার পেয়ে যাওয়ার হার চরম হতাশাজনক। উচ্চ আদালত ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার যৌথ উদ্যোগে ৪৬টি ট্রাইব্যুনালে নিষ্পত্তিকৃত চার হাজারের বেশি মামলার নথি বিশ্লেষণ করে প্রকাশিত গবেষণায় দেখা যায়, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলাগুলোতে আসামিদের সাজা পাওয়ার হার মাত্র ৩ শতাংশ। আইনে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে বিচার নিষ্পত্তির স্পষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও তথ্য বিশ্লেষণ করে জানা যায়, বাস্তবে একটি মামলার রায় হতে গড়ে প্রায় তিন বছর সাত মাস বা ১ হাজার ৩৭০ দিন সময় লেগে যাচ্ছে। এই দীর্ঘ সময়জুড়ে একটি মামলা নিষ্পত্তিতে গড়ে অন্তত ২২ বার আদালতের তারিখ পড়ছে, যা বিচার বিলম্বের এক স্পষ্ট চিত্র ফুটিয়ে তোলে। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, দুর্বল সাক্ষ্যপ্রমাণ, তদন্তের নিম্নমান ও আইনি ফাঁকফোকরের সুযোগে প্রায় ৭০ শতাংশ মামলার আসামিরা বেকসুর খালাস পেয়ে যাচ্ছে। এছাড়া সামাজিক ও প্রভাবশালী মহলের চাপের মুখে পড়ে প্রায় ১০ শতাংশ মামলা আপসের মাধ্যমে আদালতের বাইরে ইতি টানছে। তদন্তের সময় নিষিদ্ধ পদ্ধতির ব্যবহার, ফরেনসিক ও ডিএনএ প্রতিবেদন পেতে দেরি এবং সাক্ষী সুরক্ষার অভাবকে এই অচলাবস্থার জন্য দায়ী করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, বিচার প্রক্রিয়ার এই ধীরগতি ও অপরাধীদের শাস্তি না হওয়ার সংস্কৃতি দেশে সহিংসতার মাত্রা বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। যদিও গত এপ্রিলে পাস হওয়া নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) বিলে তদন্ত ও বিচারে সুনির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ, ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা এবং অপরাধীদের কঠোর শাস্তির বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্রেফ নতুন আইন পাস করে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব নয়। তাদের মতে, ভুক্তভোগী ব্যক্তির সামাজিক বা শ্রেণি পরিচয় বিবেচনা না করে প্রতিটি ঘটনাকে সমান গুরুত্ব দিয়ে দ্রুততম সময়ে বিচার সম্পন্ন করা জরুরি। বিচারপ্রক্রিয়া বিলম্বিত হলে মূল আলামত ও আলামতের গ্রহণযোগ্যতা নষ্ট হয়ে যায়, যা শেষ পর্যন্ত অপরাধীদের সুবিধা দেয়। এ বিষয়ে অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতামত বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, সামাজিক অস্থিরতা, পরকীয়া ও অপসংস্কৃতির প্রসার এবং সামাজিক অবক্ষয়ের কারণে নারী ও শিশুদের ওপর সহিংসতার প্রকোপ বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে ঘরের ভেতরেই নারীরা চরম শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের মুখোমুখি হচ্ছেন। এই সংকট মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরপেক্ষ, পেশাদার ও রাজনীতিমুক্ত দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন বিশ্লেষকরা। একই সঙ্গে প্রাথমিক পর্যায় থেকেই পাঠ্যপুস্তকে জেন্ডার সংবেদনশীলতার বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা এবং পাড়া-মহল্লায় সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। অপরাধীদের শাস্তি যদি সমাজে স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান করা না যায় এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত না হয়, তবে এই ভয়াল নির্যাতন বন্ধ করা অত্যন্ত কঠিন হবে।
নারী ও শিশু নির্যাতনে বিচারে দীর্ঘসূত্রতা: সাজার হার কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩ শতাংশে
নিজস্ব প্রতিবেদক:











